শিশুদের শিশুকাল ফিরিয়ে দিন

সালমা তালুকদার

অনেকদিন থেকেই ভাবছিলাম কোমল মতি শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কিছু লিখবো।সাহস পাচ্ছিলাম না। শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে অনেক গুনি মানুষ অনেক কথা বলেন।আমি অতি  ক্ষুদ্র একজন নারী। এত বিশাল পরিসর নিয়ে কথা বলা আমার কতটুকু যৌক্তিক আমি জানি না। তবু কিছু কথা না বলেও পারছি না। কারন আমিও একজন মা।
বিদ্যালয় গুলোর শিক্ষা ব্যবস্থায় কেন যেন কখনোই সন্তুষ্ট ছিলাম না আমি। সব সময় মনে হতো যে শিক্ষকদের  উপর এতো বড় গুরু দায় ভার চাপানো আছে তারা কিভাবে দিন শেষে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। আমি নিজে একটা বিদ্যালয়ে কিছুদিন কর্মরত ছিলাম। এটা আমার সৌভাগ্য বলতে হবে।কারন এই অভিজ্ঞতা ছিল বলেই আজ আমি কিছু লিখতে পারছি। সারাক্ষন বাচ্চাগুলাকে নতুন কিছু শেখানোর তাগিদ অনুভব করতাম। যার কারনে বাসায় আসার পর ও চিন্তা করতাম কিভাবে ভাল কিছু শেখানো যায়,যা আজীবন মনে থাকবে। তাই আমার কাছে মনে হয় শিশুদের নৈতিকতা শেখানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বিকার্য। কিন্তু আজকাল শিক্ষক ছাত্রের সম্পর্ক মধুর হওয়ার চাইতে তিক্ত হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। কারন আর কিছুই না।আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা।
তথাকথিত কিছু অভিভাবক আছেন যারা শুধু তার সন্তানের ভাল ফলাফল চান আর কিছু না। তার সন্তানের আদর্শিক উন্নয়ন কতটুকু হলো সে বিষয়ে কোন খবর নেই।যাই হোক আমি বলতে চাইছি এজন্যই বোধ করি বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সাথে ছাত্রছাত্রীর সম্পর্কটা মধুর দেখি না। শুধু পড়া দাও আর পড়া নাওয়ের মধ্যেই সম্পর্ক আটকে থাকে।
যার কিছুটা অবসান হয়তো হয় কোচিং এ পড়ার মাধ্যমে। বিদ্যালয় থেকে এসে গোসল করে নাকে মুখে কোনরকমে খাবার গুজে এই ছোট ছোট শিশুদের ছুটতে হয় কোচিং এ। যেখানে লেখাপড়ার একটা মোটামুটি গাইডলাইন থাকে। নিয়মিত পরীক্ষা হয়।কোচিং এর শিক্ষকদের সাথে ভয় ডর ছাড়া কথা বলে শিশুরা। যা বিদ্যালয়ে হয় না।
শিক্ষকদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলতে চাই,তারাও এত প্রেশারের কারনে শিশুদের সাথে যেমন ব্যবহার করার কথা তা করেন না। করতে পারেন না। ব্যবহারটা হয়তো একটু খারাপই হয়ে যায় কখনো কখনো।আবার দেখা যায় ক্লাশের মধ্যে যেসব শিশুরা লেখাপড়ায় একটু ভালো,তাদের দিকে শিক্ষকদের মনোযোগ একটু বেশি থাকে।কারন ঐ
ছাত্রদের ভালো ফলাফলের উপর শিক্ষদের সুনাম আর বিদ্যালয়ের সুনাম নির্ভর করে।তাহলে বাকীরা! বাকীরা কি ছাএ না? ওরা কি টাকা দিয়ে বিদ্যালয়ে পড়তে আসেনি?
অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন আমি কোচিং ব্যবসাকে উৎসাহিত করছি। আমি বলবো মোটেই না। আমার ছেলে ক্লাশ ফাইভ থেকে পরীক্ষা দিবে। আমি এই পিইসি নিয়ে কখনোই এত সিরিয়াস ছিলাম না। তবে পারিপার্শিকতা আমাকে বাধ্য করছে সিরিয়াস হতে। এবং অনেকটা বাধ্য হয়েই আমি আমার বাচ্চাকে কোচিং এ দিয়েছি।আমার দেয়াটা অনেক দেরি হয়ে গেছে।আসলে এ ব্যপারে চিন্তা করি নাই যে কোচিং দিতেই হবে। অনেকটা অন্ধের মতো ভেবে বসে ছিলাম স্কুল তো আছেই আর কিছু লাগবে না।
যাই হোক কোচিং এ তো দিলাম। ঐ খানে দেখি আর এক কান্ড। কোচিং পরিচালনার জন্য যাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাকে দেখি প্রায়ই ফোনে টাকার জন্য কাদের সাথে যেন উচ্চ ভাষায় উৎতপ্ত বাক্য বিনিময় করেন।ঘটনা কি জিজ্ঞেস করতে গিয়ে শুনি,কোচিং প্রায় ১ লাখ টাকা অভিভাবকদের কাছ থেকে পায়। যার জন্য কোচিং এর শিক্ষকরা বেতন ও পান না ঠিক মতো। অনেকে তো কয়েক মাস পড়িয়ে টাকা না দিয়েই বাচ্চা নিয়ে চলে যান।
তাহলে কার ক্ষতি হলো এখানে? শিশুটির নাকি কোচিং এর? অবশ্যই কোমলমতি শিশুটির।
আমি বলতে চাই কেনই বা প্রতিটি শিশুর সাইকোলজি বুঝে বিদ্যালয় গুলাতে কাজ করে না? কেনই বা একটা ক্লাশে শিক্ষার্থী এত বেশি নেয়া হয় যে একজন শিক্ষক বা শিক্ষিকার সামলাতে কষ্ট হয়? আর সামলাতে যদি নাই পারেন তাহলে শিক্ষকের একজন সাহায্যকারী কেন দেওয়া হয় না?কোচিং এ কিভাবে সাপোর্ট দেওয়া হয় যা একটা বিদ্যালয় দিতে পারে না? কেন অভিভাবকরা কোচিং এর পেছনে ছুটবেন!
আর যদি ছুটেই থাকেন আর মনে করেন কোচিং তাদের সন্তানদের ভবিষ্যত উজ্জল করে দিবে তাহলে কেন তারা কোচিং এর টাকা আটকে রাখেন যার জন্য বাচ্চাগুলো মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়!
অনেক প্রশ্ন। আমার মনে হয় উওর ও প্রায় সবারই জানা। কিন্তু কেন যেন সবাই চুপ করে থাকেন। যেখানে বাইরের দেশে একটা নির্দিষ্ট বয়সের আগে পাঠ্য বইয়ের প্রতি জোর দেয়া হয় না সেখানে আমাদের দেশে জন্মের পর যখন বুঝ আসা শুরু করে তখনই বাবা মা কোন নামী দামী বিদ্যালয়ে এডমিশন নেওয়ার ব্রত নিয়ে মিশনে নামেন।আমার প্রশ্ন এইসব কোমল মতি শিশুদের শিশুকাল ছিনিয়ে নেয়ার অধিকার আমাদের কে দিয়েছে। এডমিশন টেস্ট হতে শুরু করে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া,খেয়ে না খেয়ে জিপিএ ফাইভ পাওয়ার জন্য কোচিং এ দৌড়াদৌড়ি,এই পুরো প্রক্রিয়াটি কি শিশুদের জন্য ক্ষতিকারক না? শিশু অধিকার বলে আমরা যারা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করি,আশা করি তারা এ ব্যাপারটি নিয়ে ভাববেন।
আমি ডাইরী লিখতে পছন্দ করি। মনের কথা গুলো হয়তো ডাইরীতেই বন্ধী হয়ে থাকতো,যদি ফেইসবুক না থাকতো। সেজন্য ফেইসবুককে ধন্যবাদ।  মনের কিছু  কথা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে পেরে ভালো লাগছে। আমার মতের সাথে হয়তো অনেকের মতের মিল নাও হতে পারে। আমি শুধু আমার মনের কথাগুলো বললাম।

সালমা তালুকদার – সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন