শিশুর ডায়েরী লেখার মাধ্যমে যেভাবে জানবেন তাকে

আফরোজা হাসান

শিশুদেরকে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করা উচিত ওদের পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে। যেসব শিশুরা মুখে কিছু বলতে চায় না তাদেরকে লিখতে বলা যেতে পারে।

আর সবচেয়ে ভালো হচ্ছে শিশুদেরকে একটি করে ডায়েরী কিনে দেয়া। তারপর কি কি লিখতে হবে ডায়েরীতে তা সুন্দর করে বুঝিয়ে বলা এবং প্রতিদিন যাতে নিয়মিত ডায়েরী লেখে সেটা খেয়াল রাখা। এতে করে শিশুদের মনের না বলা কথাগুলো জেনে নেয়া যায় এবং ওদের মনে যদি কোন রাগ-ক্ষোভ-কষ্ট থেকে থাকে সেসবের ব্যাপারেও পদক্ষেপ নেয়ে যায়।

আমি আমার ছেলেকে একটা করে ডায়েরী কিনে দিয়েছি। তারপর সুন্দর করে বুঝিয়ে বলেছি ওর পছন্দ-অপছন্দ, কি করতে ভালো লাগে, কি করতে খুব খারাপ লাগে, কিসে আনন্দ পায়, মনকে খুব কষ্ট দেয় কোন জিনিসটা, স্কুলের সবচেয়ে মজা লাগে কোন ব্যাপারটা, টিচারদের কোন কোন কথা বা আচরণ একদম ভালো লাগে না ইত্যাদি সব কিছু লিখার কথা। প্রতিদিন ঘুমোতে যাবার আগে ডায়েরী লিখতে যাতে ভুলে না যায় সেদিকে আমি সবসময় খেয়াল রাখি। কয়েকদিন আগে ওকে একটু বকা দিয়েছিলাম। সেদিন ডায়েরীতে লিখেছিল-

“আজ আমার দিনটা খুবই খারাপ গিয়েছে। আম্মু দুপুরে আমাকে জোর করে সবজি আর মাছ খাইয়েছে। আমি একটা মাত্র আইসক্রিম খেতে চেয়েছি আম্মু আমাকে দেয়নি। বিকেলে কার্টুন দেখার সময় চকলেট খেতে গিয়ে গেঞ্জি আর প্যান্টে লেগে গিয়েছিলো আমার। আমি তো কার্টুন দেখছিলাম তাই খেয়াল করিনি। অথচ আম্মু শুধু শুধু আমাকে বকা দিলো। নোংরা ছেলে বললো আমাকে। আর কার্টুন দেখতে দেবে না বলেছে। কতোই না ভালো হতো যদি আমারো পাখীদের মতো একটা লেজ থাকতো। তাহলে আমি নিজেই নিজেকে পরিষ্কার করতে পারতাম। আম্মুর সাহায্য নিতে হতো না আর আম্মুও আমাকে বকা দিতে পারতো না।(অনেক পাখীদের লেজের গোড়ায় একধরণের তেলগ্রন্থি থাকে। সেখান থেকে তেল মেখে তৈলাক্ত ঠোঁট পালকে বুলিয়ে নিজেদের পালক পরিষ্কার করে পাখীরা।) আম্মু একটুতেই শুধু রাগ করে। আল্লাহ তুমি আম্মুকে এতো রাগ দিলে কেন? বাবা অনেক বেশি ভালো। বাবা কখনো রাগ করে না।”

জন্ম থেকেই ঠাণ্ডার সমস্যা আমার ছেলেটার তাই শীত এলে খুব কষ্ট পায়। নাক বন্ধ থাকার কারণে ঠিকমতো ঘুমোতে পারেনা। আরো নানারকম সমস্যা। একদিন আমাকে খুব মন খারাপ করে বলছিল, আমি এতো অসুস্থ কেন থাকি আম্মু? আমাকে প্রতিদিন ওষুধ খেতে হয়, আমার অনেক কষ্ট ইত্যাদি ইত্যাদি। ওর মন খারাপ ভাব কাটানোর জন্য আমি সাহস দিয়ে অনেক কিছু বললাম। সেদিন ডায়েরীতে লিখেছিল-

“আম্মু বলেছে আল্লাহ কাউকে সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেননা কখনো। দুঃখ-কষ্ট, আঘাত-বেদনা সহ্য করতে যোগ্যতা লাগে। যার যোগ্যতা বেশি তার পরীক্ষাও বেশি। তাই যখনই কোন কষ্ট পাবে হোক শারীরিক হোক মানসিক বিশ্বাস রাখবে যে আল্লাহ এগুলো দিয়েই তোমাকে আরো ধৈর্য্যশীল, কষ্টসহিষ্ণু, শক্তিশালী হৃদয়ের মানুষ হবার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। যা তোমাকে আত্মবিশ্বাসী, জ্ঞানী আর বিচক্ষণ হতে সহায়তা করবে। আমার অনেক যোগ্যতা তো তাই আল্লাহ আমাকে বেশি বেশি অসুখ দিয়েছেন। আমি আর মন খারাপ করবো না। তাহলে আমি জ্ঞানী হতে পারবো না। আল্লাহ তো আমাকে জ্ঞানী হবার জন্যই কষ্ট দিচ্ছেন।”

আমরা বেশির ভাগ সময়েই সন্তানদেরকে কোনকিছু বুঝিয়ে বলতে পারলেই নিশ্চিন্ত হয়ে বসে যাই। কিন্তু বোঝানোর সাথে সাথে ওরা কিভাবে এবং কতটুকু বুঝেছে সেটা জানাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের সাথে কথা বলার সময় বা কোন কিছু বোঝানোর সময় মনে রাখতে হবে, শব্দের মধ্যে প্রাণ আছে তাই শব্দের ভুল প্রয়োগ বা গ্রহণ বদলে দিতে পারে চিন্তাধারাকে।

ডায়েরীতে লেখার কারণেই আমি আমার ছেলের চিন্তা-ভাবনাগুলো জানতে পারছি এবং আমার কথা বা আচরণ কিভাবে ওকে প্রভাবিত করছে তা আরো পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছি। নিজেকে সংশোধন করতে পারছি এবং ওকেও সংশোধন করে দিতে পারছি।

লেখকঃ প্রবাসী  লেখক ও শিক্ষক, মাদ্রিদ, স্পেন

আরও পড়ুন