শিশুর নৈতিক আচরণের সূচনা

ফারজানা পারভীন

আমরা প্রায় শুনে থাকি শিশুরা কথা শুনে না,ঠিক মত বড়দের সম্মান প্রদর্শন করছে না,পড়া শুনায় অমনোযোগী, আচার-আচরণ পরিবর্তন,হিংস্র স্বভাব চরিত্র ইত্যাদি।

কেন এমন হচ্ছে ? শিশু খুব কোমল হৃদয়ের হয়ে থাকে। ঠিক ফুলের মত।খুব নাজুক তাদের মনের জগৎ।তারা জন্মগত অনুকরণীয় হয়ে থাকে।

শিশুর নৈতিক শিক্ষা শুরু হয় তার পরিবার থেকে, মা তার প্রথম শিক্ষক। শিশু তার মাকে অনুকরণ করে বেশি। মা আচার আচরণ দেখে নিজেও সে রকম করতে চায়।ধীরে ধীরে বড় হয়ে পরিবারে সদস্যদের অনুকরণ করতে থাকে। আর পরিবার থেকে পাওয়া আচরণ অনুযায়ী শিশু নিজেকে তৈরি করে। এখন বলবেন, আমরা কি শিশুদের খারাপ আচরণ শিক্ষা দেই।না,তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে করা খারাপ ব্যবহার শিশুদের উপর প্রভাব ফেলে।

মনে রাখতে হবে,আজ যে শিশু কাল সে দেশের সম্পদ। তাই আমাদের শিশুদের নিরাপদ শৈশব উপহার দিতে হবে। শিশুদেরনৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। তাদের ঝগড়া বিবাদ, বকাবকি করা যাবে না। বড়দের সম্মান করা,সত্য বলা, মিলেমিশে থাকা।সব কিছুশিশু তার পরিবার থেকে শিক্ষে।

শিশু নৈতিকতা শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকে, পরিপূর্ণ শিক্ষা পায় সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে। একজন সু-নাগরিক হিসেবে শিশুকেগড়ে তোলে সামাজিক প্রতিষঠান।একজন সুনাগরিক দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। এখানে নিজ অভিজ্ঞতায় একটি উদাহরণ টানতে চাই আমি।

আমার প্রতিবেশী মনিজা।পেশায় গৃহিনী। তবে ঘরে বসে টুকটাক সেলাই কাজ করেন। স্বামী মোটামোটি একটা চাকরী করেন। কর্মক্ষেত্রেই বেশী ব্যস্ত থাকেন তিনি। মনিজার একটা মাত্র কন্যা সন্তান। নাম রাইমা। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। স্কুল শেষে রাইমা মায়ের সময়ের সবটুকুই পায়।প্রায়ই রাইমা সেলাই করার সময় মায়ের পাশে বসে থাকে। মায়ের এটা সেটা লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করে। সুই সুতো, কেচি, কাপরনিয়ে নানান প্রশ্ন করে।সেলাই মেশিনটা প্রায় অচল।কাজ করতে খুব কষ্ট হয় মনিজার।মার কষ্ট অনুভব করে রাইমার কোমলমন। মা কেন নতুন একটা মেশিন কিনছেনা, তা নিয়ে প্রশ্ন করে। মেয়ের এই খুনসুটিতে খুব খুশী মনে মনিজা নড়বড়ে মেশিনেসেলাই করেন।

একদিন রাইমার ক্লাসের আর্ট টিচার তাকে একটা চিত্র আঁকতে দিলেন ক্লাসে। অপরিপক্ক হাতে রাইমা দারুণ এক চিত্র এঁকেবসলো ক্রেয়োন মার্কারে। আর্ট টিচার তো বেশ খুশী।খুব প্রসংশা করলো রাইমার। স্কুল শেষে রাইমা নিজে আঁকা চিত্রটি হাতেনিয়ে খুশী মনে বাড়ি ফিরলো।মা’কে দেখালো। মেয়ের কাঁচা হাতের চিত্র দেখে মনিজা তো হতবাক। কি বলবে ভেবে পাচ্ছিলনা। মনিজার চোখ দুটো জলে ভরে এল। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরলো সে।দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া মেয়ে রাইমার আঁকা চিত্রটি ছিল- একটা লাল সেলাই মেশিন। ক্যাপশনে লিখা-আমার আম্মুকে আমি একটা লাল সেলাই মেসিন কিনে দিব।

আমরা এই ছোট ঘটনাটা থেকেও বুঝতে পারি যে, একটা শিশুর মনে এমন একটা ভাবনা এলো কেমন করে? এই যে মা’কে ভাঙ্গামেশিনে কষ্ট করে সেলাতে দেখে ছোট রাইমার কোমল মনে নতুন মেশিন কিনে দেবার ইচ্ছা, এই ইচ্ছা জাগ্রত হয়েছে তার মায়ের গাঘেষে থেকেই। মায়ের পাশে বসে বাস্তবতাকে অবলোকন করেই।পরিশেষে বলতে চাই, নিরাপদ শৈশব প্রতিটি শিশু অধিকার। শিশুকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। দিতে হবে নৈতিক শিক্ষাআমাদের। তবেই আজকের শিশু গড়ে উঠবে আগামী দিনের সুনাগরিক হয়ে।

লেখকঃ কলামিস্ট

আরও পড়ুন