শিশুর পটি ট্রেইনিং যেভাবে দিবেন

তৃপ্তি পোদ্দার

নেপি/ডাইপার থেকে শিশুকে সরিয়ে এনে পটিতে বা কমোডে বসানো রীতিমতো একটি যুদ্ধ জয়ের অনুভূতি। ১৮ মাসের পর থেকে ২৪ মাসের মধ্যে পটিতে বা কমোডে বসিয়ে টয়লেট করা শেখানোর উপযুক্ত সময় কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে গ্রীষ্ম এলাকায় পটি ট্রেনিং টি ৬ মাসের পরবর্তী সময়ে করা যেতে পারে, শিশু যখন বসতে শুরু করবে। আবার অনেক ক্ষেত্রে ৩/৪ বছরও লেগে যেতে পারে এই অভ্যাসে অভ্যস্ত করতে। শিশুর মস্তিষ্ক, মুত্রথলি ও খাদ্যনালী, মলদ্বারের মাংশপেশী যথেষ্ট পরিপক্ক বা প্রস্তুত থাকে না যে সে পটিতে বা কমোডে বসে মলমূত্র সেড়ে চলে আসবে তাই শীত প্রধান অঞ্চলে ১৮ মাসে পটি ট্রেনিং শুরু করা হয়ে থাকে।

সময়সীমাঃ

এটি সম্পূর্ণ শিশুর ও পরিচর্যাকারীর উপর নির্ভর করে, অনেক শিশু ৫ দিনের মধ্যে নেপি/ডাইপার ব্যবহার করা ছেড়ে দেয় আবার অনেক শিশুর ৬/৭ সপ্তাহও লেগে যেতে পারে।

শিশু একদম কাপড় নষ্ট করবে না এমনটি হতে ৪-৬ মাস লেগে যায় যে দিনরাত ২৪ ঘন্টায় একবারও কাপড় নষ্ট করবে না।

পটি ট্রেইনিং শুরু করার দিকনির্দেশনাঃ

শিশু যখন শারীরিক ও মানসিক ভাবে তৈরী যেমন:
• নেপি/ডাইপার ভিজে গেলে অস্বস্তিবোধ করছে ও পাল্টে দিতে বলছে,অনেক ক্ষেত্রে নিজে নিজে টেনে খুলে ফেলবে ।
• খুব বেশী সাহায্য ছাড়াই কমোডে বসতে বা নামতে পারছে, বড়োদের সাথে সাথে টয়লেটে যেতে আগ্রহী ।
• পরিচর্যাকারীকে ইশারা ভাষায় বোঝতে পারবে বা ২-৩ শব্দ বলতে পারে যে সে পটি বা কমোডে বসব।
• নিজের কাপড় নিজে খুলতে ও পরতে পারে।
• স্কুলে যাওয়ার আগেই পটি ট্রেইনিং সম্পন্ন করতে হবে।

পটি ট্রেনিংয়ের নিয়মাবলী:

*পটি ট্রেনিংয়ের প্রস্তুতিতে নতুন কোনো চেঞ্জ গ্রহণযোগ্য নয় যেমন, বাসা, অফিস বা স্কুল পরিবর্তন, নতুন বাচ্চার জন্ম, দীর্ঘ ছুটিতে বেড়াতে যাওয়া যা কিনা শিশুকে শেখাতে বাধাগ্রস্ত করে।
*শেখা সম্পন্ন হবার পূর্বে একবার শুরু করে কোন ধরনের বড় বিরতি/ থামা যাবে না

পটি ট্রেনিং প্রস্তুতিঃ

# পটি ট্রেনিং শুরুর ২ সপ্তাহ আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে, শিশুকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করার জন্য, এই বিষয়ক বই পড়তে হবে, গল্প বলতে হবে। পুতুল, ছবি বা গল্প দিয়ে পটির গুরুত্ব বোঝাতে হবে ।

# একটি রুটিন তৈরী করতে হবে ও সময় ঠিক করতে হবে শিশু কখন কখন মালমূত্র ত্যাগ করছে ।

# শিশুকে নিয়ে তার পছন্দ অনুযায়ী পটি কিনে আনতে হবে, পটি কেনার পার সেটি খেলার জন্য দেওয়া যাবে না।
# পরিবারের সবাইকে জানাতে হবে এবং নিয়োজিত করতে হবে শিশুর সাথে পটিতে বসার সময়টুকুতে সঙ্গ দেয়ার জন্য বা অন্যন্যা সদ্যসরা যেন শিশুকে বাধাগ্রস্ত না করে ।
# চাকুরীজীবি মায়েরা কোন দীর্ঘ ছুটিতে প্রস্তুতি নিতে পারেন বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনসহ আরো কিছুদিন ছুটি নিতে পারেন যাতে করে এই কার্যক্রমটি সঠিক ভাবে সম্পন্ন হয়
# শিশুর জন্য তার পছন্দের প্রচুর আন্ডারওয়ার/প্যান্টি রাখতে হবে যেন প্রয়োজনে কম না পড়ে। শিশুর জামাকাপড় সহজে পরতে পারে এবং ঢিলেঢালা জামা কিনতে হবে যেন সহজে খোলা যায়।
# শিশুকে পুরোটা সময় নেপি/ডাইপার মুক্ত রাখতে হবে।

রাতে নেপি/ডাইপার পরাতে পারেন কিন্তু তাড়াতাড়ি ভালোভাবে কাজটি সম্পন্ন করতে হলে রাতেও না পরানোর জন্য অনুরোধ করা হলো । কারণ অনেক ক্ষেত্রে শিশুর ডাইপার পরিবর্তন করতে দেরি হলে শিশু সকালের পায়খানা রাতের নেপির মধ্যে করে ফেলে, সে ক্ষেত্রে বিছানার নিচে পানি শোষণ করে এমন কাপড় ব্যবহার এবং আলাদা করে কিছু কাথা রাখতে পারেন। এবং শিশুকে মধ্যরাতে একবার টয়লেটে নিয়ে টয়লেট করিয়ে আনতে পারেন।

পটি ট্রেইনিং এর ধাপগুলোঃ
১. শিশু কমোড ফ্লাশ করতে শেখবে, শিশু পটিতে বা কমোডে বসার আগে থেকেই এই প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। শুরুর দিকে সকালে ঘুম থেকে উঠিয়েই পটিতে বা কমোডে বসাতে হবে
২. পটিতে বা কমোডে বসে থাকাকালীন সময়ে পরিচর্যাকারী শিশুর সাথে থাকবেন যাতে সে পটি বা কমোড থেকে উঠে ছোটাছোটি না করে
৩. প্রথম ২ দিন ৩০ মিনিট পর পর ৩-৫ মিনিট পটিতে বা কমোডে বসিয়ে রাখতে হবে এবং একটি নোট রাখতে হবে শিশু কখন পটিতে বা কমোডে বসলে সে টয়লেট করছে, এসময় বসে থাকার জন্য প্রশংসা করার মাধ্যমে যাতে পটি বা টয়লেট শেষ করে উঠতে পারে সেই দিকটিতে লক্ষ্য রাখতে হবে।
৪. তৃতীয় দিনে পটি বা কমোডে করেছে এই সময়ের ৫ মিনিট আগে পটিতে বা কমোডে বসাতে হবে. মলমূত্র করলে তাকে ধন্যবাদ দেয়া ও পরে পুরস্কৃত করতে হবে।
৫. নিজেকে কিভাবে পরিস্কার করবে শিখিয়ে দেয়া কিন্তু প্রথম দিকে পরিচর্যাকারী শিশুকে পরিষ্কার করতে সাহায্য করবেন এবং শিশুকে আস্বস্ত করবেন কোনো ভয় নেই আপনি আপনার শিশুকে সাহায্য করার জন্য এখানেই আছেন, আপনি শিশুকে রেখে দূরে কোথাও যাবেন না যদি একান্ত যেতে হয় তাহলে শিশুকে বলে যাবেন কেন যাচ্ছেন এবং কিছু ক্ষনের মধ্যে ফিরে আসবেন।

৬. আপনি অস্থিরতা দেখাবেন না বরং বলবেন সবাই টয়লেট ব্যবহার করে এবং এটি করলে সে ভালো স্বাস্থ্য এর অধিকারী হবে, শিশু যাতে ভয় না পায় এমন কোনো কথা বলা যাবে না। নিজের প্রসাব বা পায়খনাকে নিজের শরীরের একটা অংশ মনে করে ও বের হতে দেখে শিশু ভয় পায় কারণ শিশু নিজের কোন কিছু নিজের কাছ থেকে চলে যাবে অনেকক্ষেত্রে মেনে নিতে পারে না।

৭. শিশুকে পানি পান করতে দিতে হবে এবং পায়খানা শক্ত না হয় সেই দিক তা লক্ষ্য রাখতে হবে বা প্রসাবে ইনফেকশন না থাকে সেই দিকটিও লক্ষ্য রাখতে হবে ।
৮. সব নেপি বা ডাইপার সরিয়ে ফেলা, প্রচুর আন্ডারওয়ার জড়ো করা এবং শিশুকে নেপি বা ডাইপার ছাড়া আন্ডারওয়ার পরানো
৯. আপনি এবং পরিবারের সবার মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে বাসা ওলোটপালট হওয়ার, যতবার কাপড় বা মেঝে নোংরা করবে, রাগ না করে হাসিমুখে পরিস্কার করবেন ও পটিতে নিদিষ্ট সময় পর পর বসানো।
১০. প্রচুর পানি, জুস, পছন্দ মতো পানীয় খেতে দিন যেন প্রসাবের বেগ তাড়াতাড়িপায় ।

১১. পটিতে বসতে না চাইলে তাকে উৎসাহী করবেন, বসলে তার পছন্দের খেলনা তাকে কিনে দেবেন এবং খেলনা হাতে দিতে পারেন বেশি সময় বসে থাকার জন্য কিন্তু মোবাইল দেওয়া যাবে না কারণ একটি ভালো অভ্যাস করতে গিয়ে মোবাইল আসক্তি বাড়ানো যাবে না। গল্প বলতে পারেন, মজার কোনো অভিজ্ঞতা বলতে পারেন।

১২. পটি বা কমোডে ১ম বার টয়লেট করার পর তাকে তার পছন্দের কিছু উপহার কিনে দিন এবং বুঝিয়ে বলবেন যে এটি খুব ভালো কাজ
১৩. আপনি ধৈর্য্য হারাবেন না, শিশুকে রাগ দেখাবেন না কারণ শিশুটি ও একটি পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে আপনাকে ছাড়া টয়লেট ব্যবহার করতে শেখান

সতর্কতা:
# সন্ধ্যার পর থেকে পানি, তরল খাবার, মিষ্টি জাতীয় খাবার দেওয়া বন্ধ করতে হবে
# ঘন ঘন টয়লেটে না পাঠিয়ে, সময় মতো সময়ের ২/১ মিনিট আগে পটি বা কমোডে বসাবেন এবং প্রয়োজনে ঘুমের আগে ও মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে টয়লেট করাতে হবে।
# রাতে বিছানায় প্রসাব না করলে, ঐদিন তাকে স্পেশাল কিছু গিফট দিতে হবে।

আপনি যদি উপরোক্ত সব বিষয় মেনে চলার পর ও শিশুর পটি/কমোডে অভ্যস্ত করতে পারছেন না তবে আর্লি ইয়ার্স এক্সপার্টদের অথবা ডাক্তারের শরণাপন্ন হন, পরামর্শ করুন শিশুর কোনো শারীরিক সমস্যা আছে কিনা। কোনো ভাবেই শিশুর সাথে খারাপ আচরন বা মারধোর করা যাবে না এতে করে শিশুর মনের উপর চাপ পরবে। আপনার শিশু আপনার যত্ন পেয়ে তার এই স্বাভাবিক জীবনকে সুন্দরভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

লেখকঃ আর্লি ইয়ার্স এক্সপার্ট, ইউকে

আরও পড়ুন