শিশু বয়সে একটু অবহেলা সারা জীবনের কষ্ট

জয়নাল আবেদীন

আমাদের সাইকিয়াট্রিতে মা সহ এক আপু এসেছে। কিছু কিছু মানুষের চেহারা ভুল বয়স বলে। তার ক্ষেত্রেও সেরকম হলো। যাকে ইন্টারের জুনিয়র ভেবে ভুল করছিলাম সে এবারের বিসিএস রিটেন পরীক্ষার্থী।

একটা প্রাইভেট ভার্সিটি থেকে এমবিএ করার দুই বছর হয়ে গেছে।

সাইকিয়াট্রিস্ট সিলেটের। ব্যক্তিগত পরিচয় থেকে স্যারের রুমে বসে আছি। আমি খুব সচেতন ভাবে আপুর দিকে তাকালাম। গায়ের রং শ্যামলা, চেহারা সাদাসিধে। প্রথম দর্শনে কেউ তেমন কোন বিশেষত্ব খুঁজে পাবে না। বাচ্চা বাচ্চা দৃষ্টির শান্ত চোখ। দেখে মনে হয় শান্ত সৌম্য একটা মানুষ। কিন্তু একটু পরেই অবাক হয়ে জানতে পারলাম এই সাধারণ শান্ত চেহারার ভেতরে লুকিয়ে রেখেছে ভয়ংকর একটা অসুখ।

অসুখের কারণ যতটা না সাধারণ, অসুখ ততটা অদ্ভূত আর প্রতিক্রিয়া তারচেয়েও ভয়ংকর!

স্যার রোগের লক্ষণ জিজ্ঞেস করলেন।

আপু ভাঙা ভাঙা গলায় বলল, আমি কোন রাতে ঘুমাতে পারি না। কোন রাতেই না।

স্যার বললেন, আই সি। না ঘুমিয়ে কি করো?

– কিছু করি না। সারা রাত বসে বসে কাটিয়ে দেই। কোন বই পড়াতে ভালো লাগে না। টিভি দেখাও আমার স্বভাব না। এমনকি কারো সাথে গল্প ও করিনা….স্ট্রেইট এক বসায় পুরো রাত পার হয়।

স্যার বললেন, সমস্যা কত দিন ধরে?

– কয়েক বছর।

– কয় বছর?

– পাঁচ সাত বছর ধরে ঘুমাই না। সমস্যা আরো পুরাতন।

স্যারের কাছে এ রকম সমস্যা হয়তো কিছুই না। কিন্তু একটা মেয়ে পাঁচ সাত বছর ধরে রাতে ঘুমায় না এটা আমার কাছে অনেক কিছু। আমি মনে মনে বললাম, ইন্নালিল্লাহ!

এই বিশেষ রোগী সরাসরি সাইকোলজিস্টের কাছে আসে নি।

এদেশের মানুষজন পাগলের ডাক্তারদের এখনো পাগলের মতো ভয় পায়। জেলে যাওয়া পাগলের ডাক্তারের কাছে যাওয়া দুইটার চেয়ে সম্মানের সাথে মরাটা এখনো মানুষের কাছে প্রেফারেবল।

ইনি শেষ একমাসে চার বার অজ্ঞান হয়েছেন। পরপর এতবার অজ্ঞান হওয়ার কারণে মেডিসিন ডাক্তারের কাছে আসে।মেডিসিনের ডাক্তার দয়াবশত সাইকিয়াট্রিতে রেফার্ড করেছেন।

দয়াবশত বললাম কারণ এদেশের ডাক্তারদের মধ্যে অন্য ডিপার্টমেন্টে রেফার্ড করার টেন্ডেন্সি নাই বললেই চলে। ডাক্তাররা অনেকেই সর্বরোগীভুক।

ম্যাক্সিলোফেশিয়ালের রোগী ইএনটি খেয়ে ফেলে, কিডনীর রোগে যুতমতো পেলে মেডিসিন খেয়ে নেয়।

স্যার বললেন, আচ্ছা এবার তোমার সমস্যা বলো। কেন এ রকম হচ্ছে?

বেচারি বহুক্ষণ মাথা নিচু করে চুপ করে বসে রইল।

তারপর আমার দিকে খানিকটা সন্দেহের দৃষ্টি দিয়ে বেশ গুছিয়ে কথা বলা শুরু করল।

সমস্যার শুরুটা বেশ অদ্ভূত।

দুই বোনের মধ্যে সে ছোট।

পরিবারের সবাই বেড়ে উঠার বয়সে বলাবলি করত তাকে রাজশাহী মেডিকেল থেকে কুড়িয়ে পাওয়া গেছে।

খুব অদ্ভূতভাবে এই কথাটা তার মাথায় চিরস্থায়ী হয়ে গেল। সে প্রতিটা মুহুর্তে আবিষ্কার করল তাকে অবহেলা করা হয়। কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে বলে আদর কম পাচ্ছে।

বড় হয়ে যখন সবকিছু বুঝতে পারল তখনও ব্যাপাটা মাথা থেকে বের হয়নি। কুড়িয়ে না পাওয়া ব্যাপারে নিশ্চিত হলেও অনাদরের ব্যাপারটা চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলে দিল।

শেষ পর্যন্ত এই সাধারণ একটা ব্যাপার কাল হয়ে গেল তার এবং তার পরিবারের জন্য।

ধীরে ধীরে তার নিজের ভেতর চরম মাত্রায় এগ্রেসিভ স্বভাব গড়ে উঠল। তারপর আস্তে আস্তে ঘুম চলে গেল। সে চলে গেল রাতের ঘুমহীন জগতে।

সবচেয়ে বড় কথা এর সব কিছুই ঘটল পরিবারের সদস্যদের অজান্তে। কেউ জানত না, কিছুই জানত না।

কিছুক্ষণ পর আপু বলল, জানেন স্যার! ওরা সবসময় আমার দুর্বল পয়েন্ট মানুষের কাছে তুলে ধরত। আমি স্বভাবে গাধা, কোন কাজ পারি না ইত্যাদি…ইত্যাদি..ইত্যাদি। অথচ আমি মোটেই গাধা না। আপনি জানেন আমি এবার বিসিএস রিটেন দিচ্ছি?

স্যার বললেন, হাঁ জানি। তুমি শুরুতেই বলেছো। বিসিএস এক্সামিন গাধা হবে কেন?

– আরো ভয়ানক কথা শুনেন স্যার। তারা আমার লেট মেন্সট্রেশন নিয়ে আত্মীয় স্বজনের সাথে টিটকারী করত। আমি তখন ইন্টারে পড়ি। আত্মীয় স্বজন আমার দিকে চেয়ে টিটকারী দিয়ে হাসত। আমি লজ্জায় মরে যেতাম। আমার লজ্জার ব্যাপারটা তারা কখনোই বুঝতে চাইত না।

কথা বলার এক পর্যায়ে আপু চিৎকার করে কান্নাকাটি শুরু করে দিল।

– আমার মা আমাকে কোনদিন ভালোবাসেনি। তার সব ভালোবাসা তার বড় মেয়ের জন্য! বড় মেয়ে ট্যালেন্ট, বড় মেয়ে সুন্দরী, বুদ্ধিমতী। তার জন্য টিউটর, আমার জন্য না। অথচ প্রতিটা পরীক্ষায় তারচেয়ে আমি ভালো করেছি।

এতক্ষণ চুপ থাকার পর পাশে বসা মা চিৎকার করে পাল্টা কান্না জুড়লেন।

-তুই এসব কি বলিস রে মা!

তোরে আমি পেটে ধরছি না!!

ভদ্রমহিলা স্যারকে বললেন, স্যার বিশ্বাস করেন ও সব ভুল বলছে। ওরে আমি অসম্ভব ভালোবাসি। ও বিশ্বাস করে না কেন?

স্যার চুপ করে শুনছেন। আমি বেশ অস্বস্তি নিয়ে বসে আছি। এ রকম অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে সর্বশেষ কবে পড়েছি মনে পড়ে না।

স্যার কাউন্সিলিং শুরু করলেন।

মা মেয়ে দুজনকেই বুঝালেন। দুজনেই ঘন ঘন চোখ মুছল।

ফ্যাচ ফোচ শব্দে কান্না ঘন্টাখানেক ধরে চলতে থাকল।

:

:

আপনার কাছে পুরো ব্যাপারটাকে ন্যাকামী মনে হতে পারে।সামান্য একটা ইয়ার্কির জন্য একটা মেয়ে এরকম কেন করবে সেটা ভেবে বিরক্তিবোধ করতে পারেন। কিংবা খুব সহজেই এই পুরো জিনিসটাকে বানানোও ভাবে স্বস্তি পেতে পারেন।

কিন্তু বাস্তবতা একটু অন্যরকম। এত সহজে স্বস্তি পাওয়া যায় না। কিছু জিনিস আপনার বিশ্বাস অবিশ্বাসের বাইরে।

জগতের সব মানসিক সমস্যার মূলে প্রেম না, চাকরি না, পারিবারিক ঝগড়া না।

জগৎ বৃহৎ, জগতে সমস্যাও অফুরন্ত।

চাইল্ড সাইকোলজি একটা জটিল বিষয়। শিশমন খুব সেন্সেটিভ জায়গা। ঐ সময় সামান্য আনন্দ মানে সারা জীবনের আনন্দ, সামান্য কষ্ট মানে সারা জীবনের কষ্ট….ঐ সময়কার কোন ঘটনার ছাপ সারা জীবনেও তোলা সম্ভব হয় না।

একটা শিশু শিশুকালে যাকে ঘৃণা করতে শিখবে পরের জীবনে সে সুফী হলেও তাকে আর পছন্দ করবে না।

শিশু বয়সের অবহেলা পরবর্তী জীবনে অনেক মানুষকে ভয়ানক এগ্রেসিভ করে তুলে।

পৃথিবীর ভয়ংকর সব মানুষদের শিশু বয়স নিয়ে স্ট্যাডী করলেই এই ব্যাপারটা বের হয়ে আসবে।

শিশুদের মানসিক অবস্থা নিয়ে আমরা কেউ ভাবিনা।

খাওয়া দাওয়া করিয়ে নাদুস নুদুস করাতেই আমাদের সব শ্রম, সব তৃপ্তি। তার মানসিকতা, তার ভাবনা নিয়ে কে কবে ভেবেছে?

এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবুন।

আপনার কোন অযাচিত আচরণের দাগ সারা জীবনেও কাটবেনা।

আপনার সামান্য একটা ভুলের কারণে সারা জীবন সে আপনাকে ঘৃণা করবে।

ভুলেও একটা শিশুর দুর্বলতা বা কোন লজ্জার বিষয় তার সামনে অন্য কারো কাছে বলে মজা নিতে যাবেন না। একটা শিশু ঐ সময় আপনাকে হয়তো কিছু বলবে না, কিন্তু সারা জীবন সে আপনাকে অপছন্দ করবে।

অবহেলা ভয়ানক জিনিষ।

মানুষ সব সইতে পারে, অবহেলা সইতে পারেনা।

পৃথিবীর সব আঘাত সহ্য করা যায়, কিন্তু একটু অবহেলাতে অনেক শক্তিমান মানুষও ভেঙে পড়ে।

অবহেলা মানুষকে নষ্ট করে, অবহেলা মানুষকে এগ্রেসিভ করে, অবহেলা কখনো কখনো নিজের প্রতি বা অন্যের প্রতি চরম নিষ্ঠুর করে তোলে।

শুরুতে করা একটু অবহেলা বাকি সারা জীবনের ভালোবাসাকে তুচ্ছ করে দেয়।

আবার কখনো কখনো সারা জীবনের ভালোবাসা তুচ্ছ হয়ে যায় শেষ সময়ের অবহেলায়।

যতবড় আপনই হোক, যত যাই হোক, সবকিছুর দাগ মুছে দেয়া যায়, কিন্তু অবহেলার রং চিরন্তন। সব অপরাধ ক্ষমা করা যায়, অবহেলা সব সময়ই ক্ষমার অযোগ্য!

বুঝতে চেষ্টা করেছি কখনো?

 

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন