সন্তানদের বন্ধু বানাবেন যেভাবে (পর্ব-২)

নুরে আলম মুকতা

বাঙ্গালী সমাজের একটি বড় সমস্যা হলো আমরা আমাদের অধীনস্থদের আর আমাদের চেয়ে কম বয়সী এমনকি শিশুদের বন্ধু বানাতে পারি না। আমরা মনে করি বন্ধু বানালে আমাদের ব্যক্তিত্ব খর্ব হবে। সম্মানহানি হতে পারে। এটি একদম ভ্রান্ত ধারণা। এখানে সম্মানহানির তো কিছু নেই। বরং বন্ধু না হলে হারানোর অনেক বিষয় আছে। যেমন ধরুন, আপনার ভাইবোন,ছেলেমেয়ে,নাতি-নতিনী আপনার কাছ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে পারে। আপনি একসময় নিঃসঙ্গ হবেন। আপনার মনের ভাব প্রকাশ করার কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। আর আপনার অধীনস্থগন আপনার চমৎকার চিন্তা চেতনা থেকে বঞ্চিত হবে। আপনি অনেক লেখাপড়া করে যে ভবিষ্যৎ বংশ সৃষ্টি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন তা কেমন করে বিস্তৃত করবেন ? আলাদা সময় পাবেন না।

বন্ধুর মতো মিশলে আপনাকে ওদের নিয়ে আলাদা আনুষ্ঠানিকতা করে পাঠ দিতে হবে না। জীবনযাপনের মধ্যেই আপনার চেতনা ওদের ভেতর প্রবিষ্ট হবে। আপনি ঠিক জায়গায় থাকলে ওরা আপনার মানসিকতা ধারণ করে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করবে। এখানে দুটো বিষয় আলোচনায় এসেছে। কিন্তু একটি শব্দ। দৃষ্টি আর ভঙ্গি। আপনি যা দেখেন আর ভঙ্গির অর্থ এখানে সার্বিক আচরণ বা প্রয়োগ। বিষয়টি কিন্তু বিশাল। একজন ব্যক্তি, সমাজের সার্বিক আচরণ আর দর্শন হলো দৃষ্টিভঙ্গি। আপনি সবসময় তো আর শিশু কিশোরদের মতো আচরণ করতে পারবেন না। এজন্য মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন, ওদের আচরণের বিষয়ে মোটিভেট করুন আর নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ওদের পাশে থাকুন। কিন্তু আপনার ধৈর্যের লেবেলটি উঁচু মাত্রায় রাখতে হবে। একটি বিষয় আপনাকে বার বার বিব্রত করতে পারে, তাহলো শিশু কিশোর কিংবা এডোলসেন্ট বা বয়ঃসন্ধি কালের ছেলে মেয়েদের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্ন। দয়া করে এগুলোর অবাস্তব উত্তর দিবেন না। মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ হলো আপনি প্রশ্নগুলোর উত্তর নাও জানতে পারেন, আবার অনেক প্রশ্নের উত্তর সরাসরি দেয়া যাবে না। এজন্য সময় চেয়ে নিন। এ সময় আপনার গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষা হবে। ওরা আপনাকে কতটুকু ভালোবাসে তার প্রমাণ পাবেন হাতেনাতে। উত্তরগুলো একদম সহজ ও সরল ভাষায় দিন। পারলে ধর্মীয় বা নিজের মা বাবার রেফারেন্স ব্যবহার করুন। যেমন ধরুন,

একটি জটিল বিষয়ের অবতারণাঃ

প্রথমে বলি আপনি কিন্তু এ প্রশ্নটির সম্মুখীন কখনো না কখনো হয়েছেন। প্রশ্নটি হলো, আব্বু বা আম্মু তুমি কেমন করে তোমার মায়ের পেট থেকে হলে? আমরা প্রায়ই উত্তর দিই আমার মায়ের পেট কেটে আমাকে বের করা হয়েছে। হয়তো কারো কারো জন্য উত্তরটি সঠিক। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা নয়। আমরা আসলে শালীন উত্তর দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করি। কিন্তু মিথ্যা বলছি না তো?

নিজেকে প্রশ্ন করি। আত্মজাকে মিথ্যা বললাম। নয়তো মনে করতে পারি এটি অশালীন কোন প্রশ্ন নয়তো অশালীন কোন উত্তর হবে। না ভাই। সৃষ্টিকে পড়তে বলা হয়েছে। এটি আপনার শিশুটির মস্তিস্ক খুলে যাওয়ার প্রথম পাঠ হতে পারে। ও হয়ে উঠতে পারে একজন সফল চিকিৎসক, প্রকৌশলি,গবেষক, শিক্ষক বা আরো সফল মানুষ । উত্তরটি আমার জন্য অপেক্ষাকৃত সহজ কিন্তু আপনার জন্য সহজ কোন ক্রমেই নয়। কারণ সবাই তো আর প্রাণীবিজ্ঞানের ছাত্র নয়। এটি আশা করাও ঠিক না। তবে জবাবটি কেমন হবে? আমার ক্ষেত্রে আগে বলি, আমি আমার বাবার শুক্রানু আর মায়ের ডিম্বানুর ছবি আঁকবো। তারপর এটির মিউটেশন দেখাবো। আমার মায়ের জরায়ু দেখাবো। ভ্রুণ ফার্টিলিটি দেখাবো। আপনার সন্তান মন্ত্রমুগ্ধের মতো সৃষ্টিকর্তার অসীম সৃষ্টি অবলোকন করবে। আপনার আঁকার দরকার নেই। দয়া করে নেটের সাহায্য নিন। একটির পর একটি এখনি দেখান। মনে রাখবেন ভ্রুণ সুস্থ ও সুন্দর থাকার জন্য যে সুন্দর মানসিকতা, জীবন-যাপন,খাদ্য-পুষ্টি দরকার এগুলো বলবেন। চেষ্টা করে দেখুন। আপনার প্রিয় সন্তানটি মানুষ হয়ে উঠবে। ওর সামনে খুলে যাবে এক বিস্ময়কর পৃথিবীর বন্ধ কপাট !

(চলবে)

লেখকঃ লেখকঃ সাহিত্যিক, শিক্ষক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী

আগের পর্ব-

সন্তানদের বন্ধু বানাবেন যেভাবে (পর্ব-১)

আরও পড়ুন