সন্তানদের বন্ধু বানাবেন যেভাবে (পর্ব-৪)

নুরে আলম মুকতা

আপনারাও কি একাজটি করেন ? অনেকেই করেন। আমিও করি মনে হয়। গোচরে অগোচরে হয়েই যায়। মানুষ তো। আমরা অনুকরণ করি আবার মিমিক্রিও করি। একটি বিষয় সন্তানদের মনোজগতে বিস্তৃত প্রভাব ফেলে। যা ওর মনোজগতে থেকে যায় অনন্তকাল। আপনি যদি না করেন। অন্য কেউ করলেও এটি প্রভাবিত হয়। কেমন আচরন এটি?

একটু আলোচনা করা যাক, ধরুন পরিবারের সবাই একত্রে বসেছি। সিরিয়াস পারিবারিক আলোচনা চলছে। এরমধ্যে আপনার সন্তানটি আসতে চাইছে বা ও এসে ইতিমধ্যে আসন নিয়েছে। আলোচনা ভালোই চলছিলো। এর মধ্যে কেউ একজন খেঁকিয়ে উঠলেন, এমন করে ধমকালেন যে, বাচ্চাটির হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে গিয়েছে। এমনও হতে পারে বাচ্চাটি কেঁদে ফেলেছে। আপনি বিষয়টি কল্পনা করে দেখুনতো দয়া করে , ওর প্রতি আচরণটি কেমন হলো ? ওকি আসলে আমাদের আলোচনায় বাগড়া দিয়েছিলো ? কোন সমস্যা তৈরি করেছিলো কিংবা অহেতুক কোন কথা বলে ফেলেছিলো ? কোনটিই করেনি। তাহলে ও ধমক খেলো কেন? এখানে বিচার্য বিষয়টি এরকম হতে পারে, আলোচনার বিষয়বস্তু ওর বয়সের সাথে যায় না। আচ্ছা ঠিক আছে। মেনে নিলাম যায় না। কিন্তু আলোচনাটি কি ওর শোনা একদমই অমঙ্গলের কারন ছিলো ? ভাই আসলে গোপন বিষয়গুলো কি? আগে আমাদের নির্দিষ্ট করতে হবে।

সাংসারিক জীবনে কতটুকু গোপনীয় বিষয় থাকতে পারে? একান্ত যা গোপন তাতো আপনার আছেই। ওটা খোলা গোপন। সবাই জানে আব্বা-আম্মার নিজের, একান্ত কিছু থাকতে পারে। আসুন একটু কল্পনা করিঃ বাচ্চাটির মা-বাবা একান্তে কিছু আলাপ করছেন। এমন সময় আপনার প্রিয় সন্তান ওর নিজের বিষয় নিয়ে হাজির। দয়া করে আগে বাচ্চাটিকে গুরুত্ব দিন। ধরে নিলাম আপনারা সমস্যায় আক্রান্ত। আর সমস্যাগুলো তো ওদের ভবিষ্যতের জন্যই। তবে আর অযথা ওদের দয়া করে বকাবকি বা বিরক্ত হবেন না। আগে ওর কথাটি শুনুন।
দয়া করে খুবই মমতাময় সুরে সন্তানদের সাথে কথা বলি,

হা বাবা বলো কি বলছিলে ? ও আচ্ছা, ঠিক আছে আমরা দেখছি তোমার বিষয়, এখন তুমি কি করছো বাবা ? তোমার কাজ কি হয়ে গিয়েছে ? বড় মানুষের মতো ওকে ট্রিট করুন। ওর পার্সোনাল বিষয়গুলো একমিনিট শুনে তারপর ওর কাঁধে হাত বুলিয়ে বলুন, আমরা কথা বলছি বাবা। তুমি দয়া করে একটু ফিরে এসো। এখানে আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে পৃথিবীর কন্টকময় মানসিক সমস্ত চাপ আমাদের নিয়ে চলতে হয়। শিশুরা কেন নেবে এর দায়ভার ? ওরা বাধ্য নয় এটি নিতে। তবুও ওদের নিতে হয় । তীব্র মানসিক যন্ত্রনা ওর মস্তিস্কের বিস্ময়কর CPU,RAM,ROM,MOTHER BOARD মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আমরা কেউ এটি চাই না। একজন মনিষী বলেছেন, “শিশুরা পৃথিবীর কোন দুঃসংবাদ স্বীকার করে না ”

আমার আপনার সামান্য সহনশীল আচরণ বিশাল ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে পারে শিশুকে। আপনি হয়ে উঠতে পারেন পরম বিশ্বস্ত অনুচর। এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে আমাদের যে, আমরা বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে থেকেও সন্তানদের মানুষ বানাতে চাই। তবে অযথা আমার কাঠিন্যের ক্ষোভ সন্তানদের ওপর ঝেড়ে লাভ হবে কি ? মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে ! মস্তিস্কের কোষে কোষে এর প্রভাব থেকে যেতে পারে। যা কিনা এক্টিভেট হতে পারে যেকোন সময় বিভিন্ন ভাবে। সমস্যা দেখা দিতে পারে সন্তানটির আচরনে। ও মারাত্মক রকম আক্রমনাত্বক হয়ে উঠতে পারে । এমনও হতে পারে এটি কোন রোগের মারাত্মক কারণ । আমাদের সচেতন বা অনিচ্ছাকৃত আচরনে প্রিয় সন্তানের ক্ষতি হোক আমরা কখনই চাই না । আমরা চাই না এরকম কিছু ঘটুক। মস্তিস্কের বিকাশ সুন্দর জীবন যাপনের সাথে সম্পৃক্ত। শিশুদের মনোবৈকল্য তৈরি করতে পারে বাবা-মার এলোমেলো, যথেচ্ছাচার ও স্বৈরাচারী আচরন। আমাদের সহনশীলতা ও বন্ধু সুলভ আচরন সন্তানের চমৎকার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।

(চলমান)

আগের পর্ব-সন্তানদের বন্ধু বানাবেন যেভাবে (পর্ব-৩)

লেখকঃ সাহিত্যিক, শিক্ষক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী

আরও পড়ুন