সন্তান লালন পালনে যে ভুলগুলো করবেন না (পর্ব ২)

জিনাত জিনু

ফেব্রুয়ারী মাসের রৌদ্র স্নাত একটি সকাল। মাদরাসা চত্বর গমগম করছে খুদে শিক্ষার্থীদের কোলাহলে।রুটিন মাফিক কেজির ক্লাসে গেলাম।বাচ্চারা আনন্দময়ী গলায় সালাম দিলো, সুপ্রভাত জানালো।আমিও হাসি হাসি মুখে ওদের সাথে কুশল বিনিময় করছি। হঠাৎ চোখে পড়লো তৃতীয় বেঞ্চের কোনায় ফুটফুটে সালমান । এতো কোলাহলের মাঝে সালমান চুপচাপ মাথা এলিয়ে বসে আছে।বন্ধুদের সাথে কথা বলছে না,খেলছে না, দুষ্টুমিও করছে না।ভাবলাম শরীর ভালো না হয়ত।সেদিন আর ওকে কিছু বলিনি।পরের দুটো দিনও একই অবস্থা। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম।চতুর্থ দিন মাদরাসার অফিস রুমে ওকে বসে থাকতে দেখলাম।কাছে গিয়ে ওর পাশে বসলাম। ওর ছোটো হাতটি নিজের হাতে নিয়ে বললাম-

-সালমান কেমন আছো?

সালমান বলল-

-ভালো।

তারপর চুপচাপ। আমি বললাম –

ক্লাসে যাই চলো?

সালমান  তখন বলে উঠলো-

-আমার ভালো লাগে না,আম্মুকে ফোন করো,বাসায় যাবো।

আমি বললাম-

-কেন?তোমার ক্লাস ভালো লাগে না?বন্ধুদের ভালো লাগে না?মিসদের ভালো লাগে না?

সালমান তখন বলল-

-না আমার কিছু ভালো লাগে না।

আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম-

-কেন বাবা?তুমি তো ভালো ছেলে?তোমার পড়াশুনা শিখতে হবে, অনেক বড়ো হতে হবে,তাহলে মিস খুশি হবে,আম্মু আব্বু খুশি হবে,তাই না?

সালমান আমার হাতটি শক্ত করে ধরলো,তারপর বললো-

-ওরা আমাকে সারাদিন মারে,ঘুম থেকে উঠতে না চাইলে আজও ঝাড়ু দিয়ে মারছে,পড়ার সময় মারে,দুষ্টুমি করলে মারে,খাওয়ার সময়ও মারে।আমি কি খুব পঁচা?

আমি চুপ হয়ে ওর দিকে তাকালাম।অনেকক্ষণ পর বললাম,

-আমি মা বাবার সাথে কথা বলবো।

তারপর সালমান আর ক্লাসে আসেনি ।অভিভাবকদের যুক্তি ও অনেক দুষ্টু, তাই শাসন করেন।

আমরা শাসন অবশ্যই করবো।কিন্তু তার একটা সীমানা থাকা দরকার। অতিরিক্ত শাসন আপনার সন্তানের জন্য ভালো ফল নাও আনতে পারে।
১.অতিরিক্ত শাসনের ফলে বাচ্চাদের আপনার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা, আস্থা নষ্ট করে দেয়।
২.বাচ্চার মধ্যে বিষন্নতা ও কাজের প্রতি অনীহা তৈরি করে।
৩.পড়াশোনা বা অন্যান্য কাজে সে অমনোযোগী হয় এবং হীনমন্যতায় ভোগে।
৪.অতিরিক্ত চঞ্চলতা ও খিটখিটে মেজাজের প্রকাশ পায়।
আমরা আমাদের নাড়ীছেড়া সন্তানকে খুব ভালোবাসি।তাদের জন্যই দিনরাত কষ্ট করি,উপার্জন করি।কিন্তু আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন আমাদের আচরণ ও মানসিকতার পরিবর্তন করে, যার প্রভাব পড়ে অবুঝ সন্তানের উপর।যেটা আমরা কেউই চাই না। তাই সন্তানের ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের জন্য সচেতনতা প্রয়োজন।

(চলবে)

আগের পর্বের লিংক-সন্তান লালন পালনে যে ভুলগুলো করবেন না (১ম পর্ব)

লেখকঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন