সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত শিশুর মনোবিকাশে আমাদের করণীয়

সালমা তালুকদার

আম্মু তুমি কেমন আছো? ভালো আছি। নামটাও সুন্দর করে বললো। ধীরে ধীরে কথা এগুচ্ছিল। হঠাৎ করেই হুইল চেয়ারের পা দানীতে রাখা পা দুটো আর হাত দুটো কাঁপা শুরু করলো। ওর মা এগিয়ে আসলেন। বার বারই বলছিলেন ভয় পাচ্ছে। একটু যেন রুঢ় ভাষায় বললেন, ‘তার উপর আবার আপনি কালো শাড়ি পরে আসছেন।’ আমি ওনাকে কিছু বললাম না। মেয়েটির একদম কাছে গিয়ে আমার হাত দুটো বাড়িয়ে দিলাম ধরার জন্য। ও ধরলো। পা তখনো কাঁপছে। বললাম, আমি তো বন্ধু হই তোমার। ভালো লাগেনি আমায়? কালো শাড়ির কথা বললাম। এটা কি মাস জানো তুমি। দুপাশে মাথা নেড়ে না বললো। বললাম ফেব্রুয়ারি মাস। এই মাসে সাদাকালো শাড়ি পরে সবাই। আমি তোমাকে বলবো। তার আগে তুমি দেখবে এই মাসে কেন কালো শাড়ি পরে। আর আন্টি তো শিল্পকলায় একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম তাই পরেছি। জানতাম না তো যে এখানে আসবো।

এমন আরো কথায় মেয়েটি নির্ভরতা পেল। সহজ হয়ে গেল। একদম স্বাভাবিক। আমার বুঝতে সময় লাগলো যে মেয়েটির মস্তিষ্ক সুপার এক্টিভ। খুব দ্রুত কথা ধরে ফেলে। cp শিশুদের সাধারনত cognitive এরিয়াতে সমস্যা কম থাকে। অনেকের আবার বেশি থাকে। কারো কারো খুব ভালো থাকে। মেয়েটির জ্ঞানীয় দক্ষতা অনেক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এত ভালো মস্তিষ্কের cp শিশুদের আশেপাশের সাপোর্ট গুলো ভালো হওয়া জরুরি। যা মেয়েটি পায়নি।

আমাদের কথোপকথনের এক পর্যায়ে মেয়েটি কান্না করতে থাকলো। বার বারই বলছিল, আমার অনেক কান্না পায়। তারপর খিচুনি হয়। খিচুনি হলে আরো কান্না পায়। আমি অনেক চেষ্টা করি যেন কান্না না পায়। কিন্তু পারি না। আমি কিছু পারি না। আমাকে দিয়ে কিছু হবে না। আমি মেয়েটির এই কথাগুলোর ধাক্কাই সামলাতে সময় নিচ্ছিলাম। এই ফাঁকে মেয়েটির মা দৌড়ে এলেন। বলতে থাকলেন, কত কাউন্সিলিং করালাম। কত বড় বড় জায়গায় গেলাম। কিছু হলো না। আর এখন এসে হবে। কিছুই হবে না।

আমি বার বারই মেয়েটির মায়ের আচরনে ধাক্কা খাচ্ছিলাম। যদিও জানি স্পেশাল শিশুর অভিভাবকেরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন। তাদের কথায় কাজে রুঢ়তা থাকবেই। যা থেকে বেশিরভাগ অভিভাবক মুক্ত হতে পারেন না। আমি তাই বেশি কথায় না গিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলেছি, ভাবী আপনি আমাকে একটু সময় দিন প্লিজ। তারপর ভেতরে নিয়ে যান। আমার পাশে ছিল মেয়েটির বাবা আর চাচা। মেয়েটির চাচাই আমাকে ঐ বাসায় নিয়ে যায়। আমার বন্ধু হয় সে। ওরা ইশারায় হয়তো মেয়েটির মাকে কিছু বলেছিল। উনি অপ্রস্তুত হয়ে কেবল একটি কথা জিজ্ঞেস করেছেন আমাকে, আপনি কি এ ব্যাপারে লেখাপড়া করেছেন? আমি শুধু বলেছি, ভাবী আমি আপনার সাথে পরে কথা বলি।

তারপর দীর্ঘ সময় মেয়েটির সাথে কাটালাম। আমি যখন বললাম, আমি একদম তোমার কথা বিশ্বাস করছি না যে তুমি চেষ্টা করো। যখন বুঝলাম মেয়েটি বেশ ভালো বোঝে। স্বাভাবিক কথাবার্তায় আমি ওকে বোঝাতে পারবো। তখন আমি স্বাভাবিক কথাই ওর সাথে বলতে থাকলাম। এক পর্যায়ে বললো, আন্টি আমি আপনার সাথে কি কথা বলবো? আপনি তো আমাকে  বিশ্বাসই করলেন না। এই বলে আবার ঝরঝর করে কেঁদে দিয়ে বললো, আপনি আর আসবেন না আন্টি। আমার আপনাকে লাগবে না।

আমি বললাম, যে কথাটি সত্য নয় আমি তো সেটা বিশ্বাস করবো না মা। তবে তুমি যদি বলো, তুমি এখন থেকে বিশ্বাস করবে যে তুমি চাইলেই সবকিছু পারো। তাহলে আমার ভালো লাগবে। এখন তোমার ইচ্ছে তুমি আমার ভালো লাগাকে প্রাধান্য দিবে কিনা। বললো, আমি চেষ্টা করি আন্টি। বললাম, ঠিক আছে এতদিন তুমি যেভাবে চেষ্টা করেছো সেটা সঠিক না। এখন থেকে সঠিক ভাবে চেষ্টা করো তাহলে তুমি পারবে। তারপর বললাম, চলে যাব? মেয়েটি আমার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে আদর করলো। আমাকে ধরে থাকলো। যাই হোক,পরে যখন চলে আসবো তখন আমাকে কাছে ডেকে বললো, আন্টি আমার ভেতর থেকে কান্নাটা আসে।

আমার জন্য দোয়া করবেন যেন আল্লাহ আমাকে সুস্থ করে দেন। বললাম, আল্লাহর কাছে বিশাল ভান্ডার। আল্লাহ মানুষকে দেয়ার জন্য বসেই আছেন। শুধু চাইতে হবে। তুমি নিজের জন্য চাও আর তোমার ভেতরের ইচ্ছে শক্তিকে কাজে লাগাও। তোমার দুটো সমস্যা। একটি হচ্ছে, তোমার সাহস নেই। আরেকটি হচ্ছে, তোমার ইচ্ছেশক্তিকে তুমি কাজে লাগাও না। নয়তো হুইল চেয়ার কোন বিষয় নয়।

পরবর্তীতে ওর বাবা, মায়ের সাথে আলাদাভাবে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। দুজনের কথাতেই স্পষ্ট এই মেয়েটির সমস্যার পেছনে পরিবারের অনেক বড় একটা ভূমিকা আছে। এবং তার কিছুটা তারা এখন বুঝতে পারেন। বাকিটা আমি ধরিয়ে দিয়েছি। যেহেতু মেয়েটির ধারণ ক্ষমতা অনেক তাই সেটাকে কাজে লাগিয়ে একটা জায়গায় পৌছনো যেত। যা তারা করেননি। এই না করাটা যে ইচ্ছাকৃত তা কিন্তু নয়। হয়তো বোঝেননি কি করতে হবে।

আমার জায়গা থেকে তিন ঘন্টায় যতটুকু বলা যায়, বোঝানো যায় বলে এসেছি। এখন থেকেও যদি তারা কাজ করেন, তাহলেও মেয়েটির কিছু প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব। কিন্তু আমার মনে হয়েছে এই কাজটুকুও তারা করবেন না। মেয়েটির পেছনে অনেক টাকা ঢেলেছেন। এত বছরে যেহেতু কিছু হয়নি এখন আর হবে না। এই ভেবেই হয়তো আর করবেন না। আমি সবচেয়ে অবাক হয়েছি যখন মেয়েটি তার চাচাকে বললো, তুমি কেন আসো না? বেশি বেশি আসবা। তোমাকে আমি টাকা দিব।

দেখেন অনেকগুলো বিষয় এখানে উঠে এসেছে। মেয়েটির বোঝার জায়গাটা পুরোটাই ভুলে ভরা। মেয়েটি আমাকে বলছিল, আমার মা আমার জন্য চাকরী ছেড়ে ঘরে বসে আছে। আমি বললাম, তোমার মা সংসার ভালোবাসে। তাই চাকরী ছেড়েছে। মেয়েটি জেনেছে বাবা মা মারা গেলে ওকে দেখার কেউ থাকবে না। তারপর থেকে অসহায়ত্ব ওকে ঘিরে ধরেছে। বার বারই বলছিল আমার অনেক মৃত্যু ভয়। আরো অনেক বিষয় আছে যা সে আশেপাশের মানুষ, বাবা মায়ের মুখে শুনে শুনে তার ভিন্ন অর্থ নিজের মত করে বানিয়ে নিয়েছে। যেটাকে সে ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিয়েছে। কারন তার বোঝার জায়গাটা সম্পর্কে কেউ চিন্তা করেনি। তার ভুলগুলো কেউ ধরিয়ে দেয়নি। আর না ধরিয়ে দেয়ার পেছনে তারা নিজেরাই দায়ী। তারা নিজেরাই জানে একটি প্রতিভাবান মানব সন্তানকে কি করে একটু একটু করে পঙ্গু করে দিয়েছে। হুইল চেয়ার থেকে উঠে দাড়ানোর শক্তিটুকুও এখন তার নেই। যা সে ছোটবেলায় পেরেছে এখন আর পারে না। কারন তার ভেতরের ইচ্ছে শক্তিটাই মরে গেছে।

সমাজ, পরিবার থেকে পাওয়া এমন দোষে দুষ্ট স্বভাবে মেয়েটির বিন্দুমাত্র কোন দোষ নেই। এখন কি করতে পারি। বা কি করলে বাকিটা পথ ভালোভাবে চলা সম্ভব সেই জায়গাটা নিয়ে বলতে গিয়ে আমি কিছু সাপোর্টের কথা বলেছি। একটা টিমের কথা বলেছি। মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন কিন্তু facial expression এ আমি পজিটিভ কিছু দেখিনি। তাই আমার মনে হয়েছে তারা হতাশ। আর এরকম হতাশ হওয়ার পেছনে নিজেদের মধ্যে understanding এর অনেক অভাব। নিজেদের পারিবারিক জীবনেই তো এরা সুখী নয়। তাহলে নিজের সন্তানের Happiness কি করে আনবেন। যাই হোক এখানে আরো অনেক কিছু বলার ছিল। যা লিখতে গেলে লেখাটা আরো বড় হয়ে যাবে। তাই এখানেই এই ঘটনার বর্ননা শেষ করে মূল কথাটা বলতে চাই।

শুধু এই ঘটনা নয়। এমন আরো ঘটনায় নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই এসব স্পেশাল শিশুদের বাবা মায়েরা যখন দেখেন তাদের একটা স্পেশাল শিশু হয়েছে। তখন তারা অর্ধেক ভেঙ্গে পরেন। পরবর্তীতে যদিও বা শিশুর বিকাশের জন্যে দৌড়াদৌড়ি করেন তাও আবার না বুঝে। যে যেখানে যেতে বলে সেখানেই তারা তাদের আদরের সন্তান নিয়ে যান। কিন্তু যতটা উৎসাহ নিয়ে যান ঠিক ততোটাই নিরুৎসাহিত হয়ে ফিরে আসেন। এটা হয় কেবলমাত্র সঠিক দিকনির্দেশনা না পাওয়ার কারনে। আর ধৈর্যের অভাবে। এখন যদি বলি এসব স্পেশাল শিশুদের বাবা মায়ের ধৈর্য্য থাকতেই হবে। তাহলে বলতে হবে তারা যে ধৈর্য্য ধরবে কিসের আশায় ধরবে।

গাইডলাইন না পেলে তারা কি করে বিশ্বাস করবে বা জানবে তার শিশুটাকে নিয়ে কি করলে শিশু কতটা দূর যেতে পারবে। অথবা কি কি দক্ষতা তার আছে এবং কি কি সাপোর্ট পেলে সে আরো কিছু দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। যা তাকে পরবর্তীতে স্বাবলম্বী করতে সাহায্য করবে। আর এই ব্যাপারটাই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। এজন্য চাই অভিভাবকদের সচেতনতা। পজিটিভ মানসিকতা। আর এই ব্যাপারে সরকারি ভাবে হোক আর ব্যক্তি উদ্যোগে হোক এমন কিছু করা উচিৎ যাতে করে জনগনের মধ্যে সচেতনতা বাড়ে। আর কয়েকটা পরিবার দেখে আমার এখন এমনও মনে হচ্ছে, এইসব উঠতি বয়সের স্পেশাল শিশু গুলো তাদের নিজেদের পরিবারের কাছে নিরাপদ নয়।

মানসিক বিপর্যয়ের মাঝে দিন কাটাচ্ছে এরা। কারন তাদের অভিভাবকরা সময় মত সঠিক ভাবে তাদের সাথে কাজ না করেই চান এরা সুস্থ জীবনযাপন করুক। সময় যখন গড়িয়ে যায়। অভিভাবকদের বয়স বাড়ে। মৃত্যু চিন্তা ঘিরে ধরে। তখন সেই চিন্তার প্রভাব গিয়ে পরে স্পেশাল শিশুদের উপর। সেই শিশু যে ক্যাটাগরিতেই পরুক না কেন। সে হতে পারে অটিজন, ডাউন্স অথবা শারীরিক ভাবে অক্ষম শিশু। তাই আমাদের দেশে এমন কোন ব্যবস্থা থাকলে ভালো হোত (যদিও আমি জানি না যে এমন কিছু আছে কিনা। থাকতেও পারে) যেখানে এই সব শিশুরা স্থায়ীভাবে থাকবে এবং এডুকেশন সহ সব সাপোর্ট পাবে। অর্থাৎ দক্ষ মানুষের মাঝে থাকবে। তাহলে বাকি জীবনটা এরা ভালোভাবে কাটাতে পারবে।

লেখক : স্পেশাল এডুকেটর ও কলাম লেখক

 

আরও পড়ুন