ভালো ছেলে গড়ার প্রজেক্ট

সিহিন্তা শরীফা

বাচ্চারা ক’দিন ধরে বায়না ধরেছে — “এটা কিনে দাও, ওটা কিনে দাও…”। বললাম, আল্লাহর কাছে চাও। তিনজন লিস্ট বানালো, ওরা আল্লাহর কাছে যা যা চায় সব পয়েন্ট দিয়ে লেখা লিস্ট।
সাধারণত টুকটাক খেলনা জাতীয় জিনিসগুলো ওদের জমানো টাকা দিয়েই কেনা হয়। এবারের চাহিদার লিস্টে আছে স্কুটার সাইকেল, সুইং কার, ছবিওয়ালা বই, বিজ্ঞানবাক্স চুম্বকের চমক, ওয়াকিটকি, বিভিন্ন বইয়ের নাম ইত্যাদি।
লিস্ট থেকে এখন কিনে দেয়ার মতো তিনজনের জন্য তিনটা জিনিস বেছে নিলাম। গত ঈদে পাওয়া ওদের টাকাগুলো সব একসাথে করে ওদের বাবার হাতে দিলাম। বললাম বাকি যা লাগে দিয়ে দিও। তিনি জানালেন, এখন দিবেন না। এক সপ্তাহ “ভালো ছেলে” হয়ে থাকতে হবে। এক সপ্তাহ পর আমার কাছ থেকে রিপোর্ট পেয়ে তারপর যা যা চায় কিনে দেয়া হবে।

কাগজ কলম নিয়ে তিনজনের নামে তিনটা করে ছক এঁকে ফেললাম। সেখানে ওদের দৈনন্দিন কাজের তালিকা করলাম। প্রত্যেককে একেকটা কাজের জন্য অগ্রীম দশ পয়েন্ট করে দেয়া হলো। কাজগুলো ঠিকমতো না করলে এক এক করে পয়েন্ট কাটা যাবে। শুধু সলাতের জন্য প্রত্যেক ওয়াক্তে দুই পয়েন্ট করে দেয়া হয়েছে। একেক ওয়াক্ত কাযা হয়ে গেলে দুই করে কাটা যাবে। এভাবে খাবার নিয়ে কমপ্লেইন করলে এক পয়েন্ট, ঝগড়া করলে এক, মায়ের অবাধ্য হলে এক, দিনের পড়া না করলে এক, খেলনা না গোছালে এক পয়েন্ট করে কাটা যেতে থাকবে। এছাড়া বোনাস পয়েন্টের ব্যবস্থা আছে। নিজের হাতে সব ভাত খেলে, আউয়াল ওয়াক্তে সলাত পড়লে, মাকে কাজে সাহায্য করলে বোনাস পয়েন্ট পাবে।
পুরোটা বানানোর পর এক পৃষ্ঠায় নিয়মাবলী লিখলাম। ওদের পড়ে শোনালাম। পুরোটা বুঝিয়ে দিলাম। সাথে সাথে ম্যাজিক শুরু হলো। বড় ছেলেটা মাগরিবের আগে আজকের ফজরের সলাতটা পড়ে নিল। মেজোটা গলা ছেড়ে নামতা মুখস্ত করতে বসে গেল আর ছোটটা খাতা-পেনসিল নিয়ে হাতের লেখা শুরু করে দিল।
এবার যে “ভালো ছেলে” হতেই হবে। সপ্তাহান্তে ৮০% এর উপর না পেলে যে কাঙ্ক্ষিত জিনিস মিলবে না!
দেখা যাক কী হয়…

আপডেট
অবশেষে অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো।গত রাতে ঘুমানোর আগে হিসেব করতে বসলাম কে কত পেয়েছে। কথা ছিল ৮০% এর উপরে পেলে গিফট দেয়া হবে। দেখা গেল বড় ছেলে পেয়েছে ৯৫%, মেজো ৯৪% আর ছোটজন ৮১%। অর্থাৎ প্রত্যেকেই যার যা পাওয়ার কথা পাবে ইনশাআল্লাহ্‌।

পরদিন যুহরের সলাত আদায় করে আবু আনাস চলে গেলেন কেনাকাটা করতে। ফিরলেন আসরের পর। বাচ্চারা সেইরকম খুশি আলহামদুলিল্লাহ্‌। প্যাকেট খুলতে খুলতে কোন একজনের মনে হলো বাবাকে থ্যাংকস দেয়া হয়নি। দৌড়ে চলে গেল ওরা বাবার কাছে। সমস্বরে চিৎকার শোনা গেল – “জাযাকাল্লাহ খাইর বাবা!”
বাচ্চাদের কাঙ্ক্ষিত জিনিস চাইতেই বা না চাইতেই পেয়ে গেলে সেসবের আর মূল্য থাকে না। অল্পতেই তারা বোর হয়ে যায়, নিত্যনতুন খেলনার আবদার চলতেই থাকে।

আলহামদুলিল্লাহ্‌ “প্রোজেক্ট ভালো ছেলে” বেশ ভালোই কাজে লেগেছে। বড় দুইজন খুব চেষ্টা করেছে ভালো পয়েন্ট পাওয়ার জন্য। ছোটটা শুরুর দিকে অতটা সিরিয়াসলি নেয়নি, শেষের দিকে ভাইয়াদের দেখে বুঝে ফেলেছে যে পয়েন্ট কম পেলে ওকে কিছুই দেয়া হবে না। খেলনাগুলো ওরা earn করেছে, নিজেদের ভালো কাজগুলোর মাধ্যমে। ওরা শিখেছে এভাবেই আমরা আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করি, নিজেদের ‘আমল আর ইবাদাতের মাধ্যমে। দুই কাঁধের মালাইকারা প্রত্যেকটা কাজের হিসেব লিখে রাখছেন। পয়েন্ট বেশি পেলে গন্তব্য জান্নাত, কম পেলে জাহান্নাম।

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.