আপনার ছানাকে উড়তে দিন

ফাইজা তাবাসসুম

যে অবিভাবক ভাবছেন আজকালকার ছেলে মেয়েরা অনেক আনাড়ি, নিজেরা নিজের দ্বায়িত্ব নিতে পারছে না, এই স্টেটমেন্ট দেয়ার আগে কথাটা আরেকবার ভেবে দেখা খুব জরুরি। বাচ্চারা কেউ নিজের দ্বায়িত্ব নিজে নিতে পারছে কিনা তার ঠিক ঠিকানা না থাকলেও ‘বফ/গফ’ এর দ্বায়িত্ব নিচ্ছে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে।
আপনার সন্তানেরা ওই পাখির ছানার মতোই, যার বাবা-মায়ের দ্বায়িত্ব থাকে তাকে উড়তে শেখানোটুকুই শুধু। জীবনের পথে তাকে একা কিছু পথ হাঁটতে দিন। তাকে ভুল করতে দিন, ভুলগুলো বুঝতে সাহায্য করুন। পারফেক্ট সন্তান বানাতে গিয়ে আপনার চক্ষুর অগোচরে তাকে অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা হতে বাধ্য করবেন না দয়া করে। কন্ট্রোল ফ্রিক হয়ে টাইট দিয়ে সন্তানকে লাইনে রাখারা চেষ্টা করা শুধুমাত্র বৃথাই নয় বরং সবচেয়ে ক্ষতিকর।
সন্তানকে নিজের কাজ নিজে করে ফেলতে উদ্বুদ্ধ করুন। নিজের বিছানাটা/পড়ার টেবিলটা গুছিয়ে রাখতে দিন নিজেকেই। গোসলের পর কাপড়টা ধুয়ে রাখতে দিন। খাওয়ার পর প্লেটটা পরিস্কার করতে দিন। ছেলে,মেয়ে নির্বিশেষে ঘরের কাজে সাহায্য করার রুটিন রাখুন। ছোটো ভাই বোনের যত্ন নিতে দিন,পড়া শেখানোর দ্বায়িত্ব দিন। প্রোডাক্টিভ কিছু করতে শিখান বাচ্চাকে। সাইকেল চালানো শেখান, সাঁতার কাটা শেখান, স্কাউটে দেন, গার্লস গাইডে দেন।
শহরে থাকেন কিংবা গ্রামে বা মফস্বলে সন্তানকে শুধু ভালো স্কুলে পাঠিয়ে আর দুই চারটা টিচার ধরিয়ে দিয়ে ক্ষান্ত হয়েন না। তার জন্য একটা মাঠ খুঁজে দেন। একা ছাড়তে সাহস না করলে সাথে করে নিয়ে যান খেলতে। তাকে খেলা নিয়ে ঝগড়া করতে দিন, পরদিন মাঠে গিয়ে ঝগড়া মিটিয়ে নিতে দিন। বন্ধুত্ব সৃষ্টি করতে দিন, বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে দিন, বন্ধুত্ব ঝরে যেতে দিন। আপনার বাচ্চা মার খেলে রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে যাওয়ার কিছু নাই। যে বাচ্চার জন্য অভিভাবক লেভেলে ঝগড়া করলেন এই বাচ্চাই কিছুক্ষণ পর যে মারলো তার সাথে আবার খেলতে যাবে।
সন্তানকে স্পেস দিন। এই স্পেস দেয়া মানে তিন বছর বয়সে মোবাইল কিনে দেয়া না। এই স্পেস দেয়া মানে তাকে অবাধে ইন্টারনেটে সার্ফিং করতে দেয়া না। এই স্পেস দেয়া মানে টিভির রিমোর্ট তার হাতে দিয়ে দেয়া না। এই স্পেস দেয়া মানে তার অশালীনতা, অবাধ্যতাকে মেনে নেয়া না। তাকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকে নিতে দিন। সে যে বড় হয়েছে এটা তাকে বুঝতে দিন। মানসিকভাবে সাবলম্বি হতে দিন।
সন্তানকে সামাজিক হতে শেখান। ফ্যামিলি গেটটুগেদারে তাকে এক কোনে মোবাইল নিয়ে গেমসের প্রতিযোগিতায় মেতে থাকতে না দিয়ে দিয়ে সবার সাথে কথা বলতে দিন,ভাব বিনিময় হোক,নেহায়েত কেমন আছেন/ভালো আছি বলা হোক।
ঘাড় গুঁজে বই পড়ে যে বাচ্চাটা,তাকে শেখান যে তার বইয়ের দুনিয়ার বাইরেও একটা দুনিয়া রয়েছে। সন্তান পড়ুয়া বলেই সে ওয়াশরুমে ঢুকলে ওয়াশরুমের সামনে তার বইটি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন না। তিনবেলার খাবারটা মুখে তুলে খাইয়ে দিবেন না। ভালো ছাত্র হবার চেয়ে ভালো মানুষ হওয়াটাও যে কম কিছু নয় সেই শিক্ষা দিতে ভুলে যাবেন না।
খেয়াল করে দেখবেন, বাচ্চা ছোটোগুলার শুক্রবার আলাদা করে খেলার/টিভি দেখার ব্যক্তিগত শিডিউল থাকে। বড়গুলার থাকে হ্যাংআউটের শিডিউল। তার শিডিউলে আপনি পিতামাতাও কিছু কাজ যোগ করুন।
নিজে নৈতিক থাকুন, সন্তানকে নৈতিকতায়, সততায় উদ্বুদ্ধ করুন। সত্য কথা বলুন। আত্মীয় পরিজনের সাথে সদয় আচরণ করুন। স্বামী-স্ত্রী দুজন দুজনকে সম্মান করুন। বাচ্চাদের দাদা/দাদী,নানা/নানীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন।
“আমার বাচ্চা তো চিকেন ছাড়া মুখেই তুলে না” বলছেন যে মা মুখ কালো করে,কালো মুখের আড়ালে তার অহমিকার সূর্য হাসে। কিছুটা বড়লোকি চালা তো দেখানো গেলো এই কথা দিয়ে! সন্তান কি খাবে,কি পরবে,কি করবে সেটা আপনি মা/বাবা/বড় বোন/বড় ভাই হয়ে ঠিক করে দিতে পারবেন না। তাই বলে প্রচেষ্টা বন্ধ করে দেয়া যাবে না। ছোটবেলার অপছন্দের তিতা করলা বড়বেলায় প্রিয় সবজি এমনিতেই হয়ে যায় না। তার পেছনে প্রচেষ্টা লাগে, জোর প্রচেষ্টা।
“আমার ছেলেকে/মেয়েকে তো এখনো মুখে তুলে খাইয়ে দিতে হয়” বলনেওয়ালা মায়ের দিকে তাকিয়ে আফসোস হয়। তার সন্তানের জন্য করুণা হয়। সন্তানকে এরকম লুজ,আতুর বানায়ে রেখে মায়ের মুখে পরিতৃপ্তির হাসি দেখে বিষম লাগে। এই মা ভাবছেনা যে  জীবনের তাগিদে কখনো না কখনো সন্তানেরা উড়াল দিবে নিজ গন্তব্যের খোঁজে। তখন তাকে একা বাঁচতে হবে। অথবা নিয়তির খেলায় আপনি চলে যাবেন, তখনও তাকে একা বাঁচতে হবে।
সন্তানকে আত্মনির্ভরশীল করুন। এতে কোনো লজ্জা নেই। বরং এটাই আত্মতুষ্টির ব্যাপার যে তাকে এই ভীষণ কঠিন দুনিয়ায় তাকে আপনি একা চলতে শেখালেন। যেসব অবিভাবকরা সন্তানের কাঁধে চেপে বসা অসহ্য জোয়ালের কারন, উনাদের আত্মতৃপ্ত চাহনির বিপরীতে মন থেকে শুধু দোয়া আসে,আপনার সন্তান যেনো থাকে দুধেভাতে।

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.