মায়েরা যেভাবে সন্তানের শিক্ষক হবেন

সাকিবা আহম্মদ

মা হওয়াটা যেমন জটিল একটি বিষয়। সেই সাথে সন্তানের ভাল শিক্ষক হওয়াও কিছুটা জটিল। মায়েদের সাংসারিক এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনের পর সন্তানের কল্যানের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাটা অনেক বড় একটি ব্যাপার। বলা যায়, বড় একটি চ্যালেঞ্জ।

জটিলতাগুলোকে সহজ করতেই আমাদের এই প্রয়াস। মা হওয়ার পাশাপাশি কীভাবে আপনি সন্তানের ভাল শিক্ষকও হতে পারেন সে জন্য কিছু উপকারী টিপস দেওয়া হলো।

১. নিয়ত ঠিক করতে হবে
‘প্রতিটি কাজের ফলাফল নির্ভর করে তার নিয়তের উপরে’। (সহীহ বুখারী) শুরুতেই আপনাকে নিয়ত ঠিক করতে হবে, আপনি আপনার এবং সন্তানের ভবিষ্যত কীভাবে দেখতে চান? একজন দ্বীনদার সফল কর্মজীবী হিসেবে নাকি দুনিয়াবি জীবনে ধনী ও খ্যাতির দাবিদার হিসেবে! প্রথমটায় আপনি দ্বীন এবং দুনিয়া উভয়েই পাচ্ছেন কিন্তু দ্বিতীয়টাতে আপনার এবং সন্তানের আখিরাত অন্ধকার!

২. প্রতিনিয়ত দুয়া করে যেতে হবে
আমরা হাদিস থেকে ৩ ধরনের ব্যক্তির দুয়া কবুলের কথা জানতে পারি- ক. অত্যাচারিতের। খ. মুসাফিরের। গ. সন্তানের জন্য বাবা মায়ের। আপনাকে প্রতি নিয়ত আল্লাহর দরবারে হাত তুলতে হবে, সন্তানের সঠিক লালন পালনের জন্য। আল্লাহ চাইলে আপনার পথ চলা অনেক সহজ হয়ে যেতে পারে। এবং সন্তানও যখন দেখবে আপনি প্রতিনিয়ত তার জন্য দুয়া করে যাচ্ছেন, তার মনে আপনার প্রতি ভালবাসা অনেক বেড়ে যাবে। সে আপনাকে কষ্ট দিতেও আড়ষ্টবোধ করবে।

৩. সময়কে মূল্য দিতে হবে
আপনার প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। সাংসারিক, পারিপার্শ্বিক এবং সন্তানের দায়িত্ব পালনের পর যদি কোন সময় পান (যদিও সেটা প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি) সেই সময় আপনাকে আত্মশুদ্ধির কাজে লাগাতে হবে। কেননা আপনি যা শিখবেন তাই কিন্তু সন্তানকে শেখাতে পারছেন!

৪. আল্লাহ সর্বদা সব কিছু দেখছেন
আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ লিপিবদ্ধ হচ্ছে। নানা ধরনের দায়িত্ব পালনের ধকল কাটিয়ে উঠতে আমরা অনেকেই হারাম পথে পা বাড়িয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চাই। হতে পারে সেটা গান শোনা, মুভি দেখা, ফ্রি মিক্সিং ইত্যাদি। আচ্ছা, কখনো ভেবেছেন কী? এতে করে আমার রব যদি আমার উপর অসন্তুষ্ট হয়ে যান, আমার কাজে বারাকাহ তাহলে কোথা থেকে আসবে? সন্তান কেন মানুষ হচ্ছে না? কেন কথা শুনে না? এসব বলে মাতম করে তখন কোন লাভ আছে কী? বিবেকের দ্বারে প্রশ্ন রইলো!

৫. সবর করতে হবে
সন্তান পালনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে সবর। শিশু জন্মের কিছু কাল খুবই আনন্দে কাটে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মায়েদের জীবনে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। সময়ের সাথে সাথে আপনাকে ধৈর্যের মাত্রা বাড়াতে হবে। মায়েদেরই মনে হয় সবচেয়ে বেশি সাবরশীল হতে হয়!

৬. ভাল সঙ্গী নির্বাচন
সামাজিকতা শিশু বিকাশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। আপনি যার সাথে মিশছেন এবং আপনার সন্তান যার সাথে মিশছে তাদের প্রভাব আপনাদের জীবনেও প্রভাব ফেলে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে আপনার মেলামেশার সঙ্গী বেছে নেওয়া উচিৎ। এবং আপনার সন্তান কাদের সাথে মিশছে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখাটা খুবই প্রয়োজন। ছোট থেকে দ্বীনদার পরিবারের বাচ্চাদের সাথে নিজের সন্তানদের মিশতে দিলে একে অন্যের থেকে অনেক কিছু শিখতে পারবে।

৭. সন্তানের সামনে সালাহ আদায় এবং কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে
সন্তান যদি শিশুকাল থেকে দেখে তার ঘরে নিয়মিত ভাবে সালাহ আদায় করা হয় এবং কুরআন তিলাওয়াত করা হয় তবে ধীরে ধীরে তার এগুলোর প্রতি আগ্রহ জন্মাবে । তবে পরবর্তীতে অনেক উৎসাহ দিয়ে তার এই আগ্রহ ধরে রাখতে হবে।

৮. সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে
সব সময় কড়া শাসনে রাখার ফলাফল কখনোই ভাল হয় না। আপনার সন্তান যদি আপনার কাছে তার মনের কথাটি বলতেই না পারলো তাহলে আপনি কিভাবে তার আপনজন হলেন? বয়স বাড়ার সাথে সাথে সন্তান অনেক ভুল করে বসতে পারে সে জন্য ঠান্ডা মাথায় বিচক্ষণতার সাথে তার ভুলগুলো শুধরে দিতে হবে। সে যেন আপনার কাছ থেকে কোন কিছু না লুকায় সেরকম সম্পর্ক তার সাথে গড়ে তুলতে হবে।

৯. দায়িত্ব দেওয়া
বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাচ্চাকে নিজের এবং ঘরের কিছু কাজের দায়িত্ব দিতে হবে। নিজের কাপড় নিজে ধোওয়া, নিজের কাপড় গুছিয়ে রাখা, বই খাতা গোছানো, ঘর গুছিয়ে রাখা, থালা বাসন ধোওয়া, ঘর ঝাড়ু দেওয়া ইত্যাদি। ছেলে হোক বা মেয়ে উভয় সন্তানকেই ঘরের কাজগুলো করার জন্য ট্রেনিং দিতে হবে।

১০. নিয়মিতভাবে পড়াশোনা নিয়ে বসা
স্কুলে কী শিখাচ্ছে তার উপর সন্তানের লেখাপড়া ছেড়ে দিলেই হবে না। আপনাকেও নিয়মিতভাবে সন্তানের লেখাপড়ার ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। বছর শেষে রেজাল্ট কার্ড হাতে নিয়ে বসার চেয়ে নিয়মিতভাবে তার সাথে তার বই খাতা নিয়ে বসা উচিৎ।

১১. আদাব আখলাখ
বাচ্চাদের যেই ব্যাপারটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হল তারা যা দেখে তাই শেখে। মানুষের উত্তম চরিত্রের বীজ বপন করার আসল সময় শিশুকাল। এ সময় তার বাবা মায়ের আচার আচরন দেখেই সে অনেক কিছু শিখে। তাই সন্তানের ভেতর উত্তম আদাব আখলাখ দেখলে চাইলে তা আগে নি্জে প্র্যাক্টিস করতে হবে।

১২. মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে
অনেক বাবা মা সন্তানের মতামত কে কখনোই গুরুত্ব দিয়ে থাকেন না। ভুল হলেও তাদের মতামত নিন। কোন খানে ভুল আছে পরবর্তীতে সেটা বুঝিয়ে বলতে হবে। এতে করে সন্তান নিজেকে পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ কেউ ভাবতে শিখবে।

১৩. সিদ্ধান্ত গ্রহণ
কিছু কিছু সময় সন্তানকে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে দিন (খুব কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দিয়ে শুরু করতে হবে)। নিজের কনফিডেন্স লেভেল বাড়ানোর জন্য এটা খুবই দরকার।

এছাড়াও পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনার সন্তানের সঠিক লালন পালন এবং শিক্ষাদানের জন্য আপনার কী কী করা উচিৎ।

অনেকেই হয়তো ভাবছেন, বর্তমান যুগে এও কী সম্ভব? যখন ছেলে মেয়েরা বাবা মায়ের কোন কথাই শুনতে চায় না! জি, খুব সম্ভব। যেখানে আল্লাহ তা’আলার সাহায্য থাকবে সেখানে কোন কিছু অসম্ভব মনে হওয়াটাই বোকামি। আমাদেরকে এ জন্যই তার কাছে দু হাত তুলে দুয়া চাইতে হবে।

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.