আমরা কি জানি আমাদের সন্তানরা কি দেখছে?

হাবিবা মুবাশ্বেরা

বর্তমান যুগে আমাদের শিশুদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হলো টিভি এবং স্মার্ট ফোন। যেহেতু তাদের খেলাধূলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ নেই এবং থাকলেও সেখানে একা খেলতে যাওয়ার মতো  নিরাপত্তা নেই, তাই আমরা সন্তানদের টিভি কিংবা স্মার্ট ফোন দিয়ে তাদের বিনোদনের চাহিদা মেটাতে চাই । ওরা তো কার্টুন চ্যানেলই দেখছে কিংবা বাচ্চাদের গেমস খেলছে -এটা ভেবে নিজেরা নিশ্চিন্ত থাকি। কিন্তু আমরা কতজন অভিভাবক ওদের সাথে বসে বর্তমান যুগের কার্টুন, গেমস ,ভিডিও দেখি? আমরা কি আদৌ জানি, এসব তথাকথিত শিশুদের অনুষ্ঠানের কনটেন্ট শিশুদের জন্য কতটা উপযোগী বা এগুলো দেখার সূদূরপ্রসারী ফল কি হতে পারে?

এবার কিছু উদাহরণ দেই। এদেশের শিশুদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি কার্টুন চ্যানেল হলো Nick এবং Hangama । এই চ্যানেলগুলোর অন্যতম  জনপ্রিয় অনুষ্ঠান হলো Motu-Patlu, Rudra, Shiva। এই কার্টুনগুলোর দর্শকপ্রিয়তা এতই বিস্তৃত যে, নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত অধিকাংশ শিশুই মাতৃভাষা বাংলা ঠিকমতো বলতে পারুক বা না পারুক “মোটু অর পাতলু কি জোড়ি” কিংবা “খালি পেট মে মেরি দেমাগকি বাত্তি নেহি জ্বলতি” —এই জাতীয় সংলাপগুলো মুখস্থ বলতে পারে। এভাবে অন্য একটি দেশের মাতৃভাষা শিশুরা মুখে বুলি ফোটার পর থেকেই আত্মস্থ করছে অথচ এটার কোনো দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা  পরবর্তী জীবনে নেই। এছাড়া ড: ঝাটকা নামক বিজ্ঞানী এবং চিনগাম নামক পুলিশ চরিত্রকে মোটু-পাতলু কার্টুনে এমন হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে, শিশুরা এরকম দুটি মর্যাদাসম্পন্ন পেশা সম্পর্কে ভুল ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠছে।

 Rudra বা Shiva দেখতে অভ্যস্ত আমাদের ছেলে শিশুরা যখন আচমকা “বুম চিকি চিকি বুম “ বলে চিৎকার দিয়ে ওঠে বা সাইকেল নিয়ে  আকাশে উড়াল দিতে চায় তখন আমরা হয়তো এগুলোকে শিশুসুলভ দুষ্টামি ভেবে পাত্তা দেই না কিন্তু এই শিশুরা যখন আরও একটু বড় হয়ে ‘কিশোর গ্যাং ‘ তৈরি করে এলাকায় মাস্তানি করে কিংবা বেপরোয়া গতিতে  মোটরসাইকেল চালিয়ে অহরহ অ্যাক্সিডেন্ট ঘটায় তখন অবাক হয়ে যাই। কিশোর বয়সের এই অস্থিরতা আর ফ্যান্টাসির বীজ যে বপন হয়েছে তাদের শিশু বয়সেই তা উপলব্ধি করার মতো সচেতনতা আমাদের নেই।

পার্শ্ববর্তী দেশের কার্টুন চ্যানেলের প্রতি এত নির্ভরতার অন্যতম কারণ হলো আমাদের দেশে সংবাদ, বিনোদন, খেলাধূলা এমনকি মিউজিক বিষয়ক প্রয়োজনের অতিরিক্ত চ্যানেল থাকলেও শিশুদের জন্য টিভি চ্যানেল মাত্র একটি , তাহলো দুরন্ত টিভি। এই টিভির মৌলিক অনুষ্ঠানের সংখ্যা খুবই কম। স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা মিনা কিংবা সিসিমপুর ছাড়া আমাদের ভাষা, সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিজস্ব  কার্টুন সিরিজ তৈরি করতে পারিনি, যথেষ্ঠ পরিমাণ শিশুতোষ সিনেমাও বানাতে পারিনি। তাই বৈচিত্র্য আনার জন্য এই চ্যানেলে অধিকাংশ সময় বিদেশী কার্টুন, সিনেমা ডাবিং করে দেখানো হয়।

 এসব ডাবিংকৃত চলচ্চিত্র, কার্টুনের কাহিনী, পোশাকসহ অনেক কিছুই এদেশের শিশুদের  দর্শনউপযোগী নয়। যেমন গার্টফিল্ড, লুক হু ইজ টকিং নাও,গার্টফিল্ড প্রভৃতি। এগুলোতে দেখানো  দুটি কুকুরের মধ্যে প্রেম, বাবার সাথে অন্য নারীর পরকীয়া প্রভৃতি—যে শিশুদের অপরিপক্ক মনে অবাস্তব, অনৈতিক relationship সম্পর্কে  ধারণা তৈরি করছে তা বোঝার জন্য শিশু বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

এ যুগের শিশুদের হাতে স্মার্ট ফোন কিংবা ট্যাব এখন সাধারণ ঘটনা। সন্তানরা এই বয়সে নিজেরা এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে বলে আমরা অনেক সময় গর্ববোধও করি। কিন্তু  নিজেরা যাচাই করে দেখি না, তারা এসবে কি দেখছে? শিশুদের কাছে ইউটিউবে দুটি অতি জনপ্রিয় ভিডিও সিরিজ হলো Fairy tale ( বাংলায় ডাবিংকৃত) এবং ধাঁধাঁর ভিডিও। অনেক শিশুদের দেখেছি এই চ্যাানেলগুলো subscribe করে রাখতে এবং Notification আসলেই নতুন এপিসোড দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়তে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, Fairy tale থেকে বাচ্চারা বোধহয় মজার মজার গল্প জানছে আর ধাঁধা দেখে তাদের বুদ্ধির বিকাশ হচ্ছে। 

তবে Fairy tale সিরিজের গল্পের নাম যদি হয় ‘ ডাইনি হত্যার প্রতিশোধ, ডাইনির মেয়ের প্রেম, ১২ জন নর্তকী রাজকুমারী…..তবে এই্ গল্পগুলোর বিষয়বস্তু কি  হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। ধাঁধাঁর ভিডিওর প্রশ্নের নমুনা যদি হয় এমন, “একটি ছেলের দুইজন প্রেমিকার মধ্যে কে তাকে খুন করেছে”? কিংবা “তুমি কাকে বাঁচাবে মাকে নাকি প্রেমিকাকে?” কিংবা ‘জামাই বাড়ি ফেরার পর স্ত্রী দেখলো শার্টে লিপস্টিকের দাগ আর জামাই দেখলো খাটের নিচে একজোড়া ছেলেদের জুতা, তবে কে  কাকে প্রতারণা করছে? ’— তবে এসব প্রশ্ন থেকে শিশুদের বুদ্ধির বিকাশ ঘটছে নাকি তারা এই বয়সেই প্রেম, ভালোবাসা সম্পর্কে বিকৃত ধারণা পাচ্ছে তা চিন্তা করা দরকার। আজকাল ক্লাস থ্রি-ফোরের বাচ্চারাও যখন সহপাঠীদের খাতায় বুঝে বা না বুঝে sexy শব্দটা লিখে রাখে কিংবা মা-বাবার ফেসবুক আইডি থেকে টিচারদের friend request পাঠায়,ভিডিও কল দেয় তখন শিশুরা স্মার্ট ফোনের বদৌলতে কি শেখে এবং এর ফলাফল কি হয় সে সম্পর্কে একটা  ধারণা পাওয়া যায়।

এতক্ষণ দেখলাম, বাচ্চাদের কার্টুন চ্যানেল এবং ভিডিওর ভয়াবহ অবস্থা। আর ওদের সামনে আমরা অভিভাবকরাও যখন পার্শ্ববর্তী দেশের সিনেমা, সিরিয়াল দেখি তখন তার কতটা নেতিবাচক প্রভাব শিশুদের উপর পরে তা হয়তো আমরা  ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করে যাই । মনের অজান্তেই ভাবি , ওদের দেখতে নিষেধ করলে তো নিজেদেরও দেখা বন্ধ করতে হবে। তাই “ওরা ছোট ,এখনও এত কিছু বোঝে না”-এটা ভেবে নিজেদের দায় এড়িয়ে যাই। আজকালকার শিশুরা যখন গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে বা ক্লাস পার্টিতে “সাকি সাকি”,“ নাগিন, নাগিন” কিংবা দিলবার গানের সাথে আবেদনময়ী ভঙ্গিতে নাচে তখন আমরাও হাততালি দিয়ে উৎসাহ দেই, ভিডিও করে ফেসবুকে শেয়ার করি।  একবারও ভেবে দেখি না ,বড় হয়ে এরা যখন লেটনাইট ডিস্কো পার্টিতে গিয়ে নাচতে চাইবে তখন আমরা বাধা দিতে চাইলেও তারা তখন সেটা মানবে কিনা !!

আসলে বিনোদনের নামে আমাদের শিশুরা যা দেখছে  তার কতটা সূদূরপ্রসারী প্রভাব তাদের উপর পড়ছে  তা নিয়ে আমরা আদৌ সচেতন নই। সচেতন অভিভাবক হিসেবে আমাদের যা যা করণীয় তাহলো-

প্রথমত:  শিশুদের যে কোন অনুষ্ঠান বা ভিডিও দেখার অনুমতি দেয়ার আগে নিজে  তা দেখে নেয়া উচিত। শিশুদের হাতে যথেচ্ছ টিভির রিমোট বা মোবাইল, ট্যাব দেয়া উচিত না। বন্ধু বা কাজিনরা এসব অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করে বলে অনেক শিশুই তাদের সাথে তাল মেলানোর জন্য এসব অনুষ্ঠান দেখে। সেক্ষেত্রে নিজের সন্তানকে এসব অনুষ্ঠানের নেগেটিভ দিকগুলো হাইলাইট করে বোঝানো দরকার। শুধু “দেখা যাবে না” —এই কথা বলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে। কারণ স্বভাবজাত কারণেই মানুষের নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি কৌতূহল বেশি থাকে। তাই শিশুকে কেন দেখা উচিত নয় তা বুঝিয়ে বলতে হবে।

দ্বিতীয়ত: শিশুদের জন্য অলটারনেটিভ বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। বাইরে খেলতে যাওয়া সম্ভব নাহলে বাসায় ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা করতে হবে। ইউটিউবে ইকরা কার্টুন এর নবী-রাসূলদের জীবনের গল্প ,আব্দুল বারী বা ওমর-হানার কার্টুন ,বিজ্ঞান প্রজেক্ট বা ক্রাফট বিষয়ক ভিডিও দেখতে উৎসাহী করতে হবে। দেখার পর ওরা কি জানলো বা বুঝলো তা জানতে চাইতে হবে। তাহলে বিনোদনের মাধ্যমেও ওরা শিক্ষামূলক বিষয় জানতে ও শিখতে পারবে।

সবশেষে বলতে চাই, সন্তান প্রতিপালন  চারা গাছ বড় করার মতোই একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া।  যথাযথ যত্ন নিলেও চারা গাছ থেকে যেমন তাৎক্ষণিক ফল পাওয়া যায় না তেমনি কেয়ারফুল প্যারেন্টিং এর সুফলও হয়তো সাথে সাথে পাওয়া যায় না। তবে  অভিভাবক হিসেবে ধৈর্য্য ধরে নিজেদের দয়িত্বটা সচেতন ভাবে পালন করা উচিত নিজেদের স্বার্থেই। কারণ আমাদের সন্তান শুধু আমাদের সম্পত্তির উত্তরাধিকারই নয় আমাদের আদর্শ ও মূল্যবোধেরও পরম্পরা বহনকারী। তাই ভবিষ্যত প্রজন্মের ভালো-মন্দের দায়ভার আমরা এড়াতে পারি না।

লেখকঃ সাহিত্যিক। 

এই সিরিজের আগের লেখা-আমরা কি জানি আমাদের সন্তানরা কি শিখছে?

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.