আমাদের হাতে শিশুরা যেভাবে গিনিপিগ !

ফাহমিদা খানম

আজকালকার বাচ্চাদের শৈশব, কৈশোর সব কেড়ে নিয়ে নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার বলিরপাঁঠা বানাচ্ছি আমরা । বেশীরভাগ মা বাবার অপূর্ণ শখের শিকার হয় ওরা — আমি যা পারিনি আমার সন্তানকে সেটা পারতেই হবে, সেজন্যে কেউ আর আজকাল আশীর্বাদ করে বলে না “মানুষ হও” বরং বলে মা-বাবার আশা পূর্ণ হোক । ব্যাপারটা এমন যে মা বাবার স্বপ্ন পুরণ করতেই ওদের আগমন।অল্প দুই,একজন আছে হয়ত যারা বলে তুমি তোমার স্বপ্নপুরনের পথে যাও, আমরা পিছনে আছি । এভাবে ভাবতে বা চিন্তা করতে পারে কয়জন? সমাজে মুখ থাকবে না তাহলে! এই জেনারেশনের জন্য মায়াই লাগে, সারাদিন থাকে দৌড়ের উপরে, বই আর ব্যাগের ভারেই চাপা পড়ে যায় শৈশব,কৈশোর ।

আগেকার বাচ্চারা স্কুলে যেতো ৫/৬ বছরে আর এখন আড়াই, তিন হলে টেনে-হিচড়ে স্কুলে ভর্তি করে দেয় । ঘুম ঘুম চোখে বাচ্চারা স্কুলে যায় । ওদের খেলার সময়টুকু কেড়ে নেই, ঘুম কেড়ে নেই আর আশা করি ওরা আদর্শবান হবে ! কি হাস্যকর ব্যাপার স্যাপার ! প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার উপর চাপ দিতে গিয়ে কি ওদের অনুভূতি নষ্ট করছি না ? ও ফুল মার্কস পায় তুমি কেনো পারো না অথবা ঐ পড়াশোনার পাশাপাশি কতোকিছু করে তুমিতো ঠিক করে পড়াই করছো না ? আচ্ছা ফড়িংয়ের পিছনে দৌড়ানোর অথবা ঝুম বৃষ্টিতে খেলার মজা কি ওরা জানে ?ভিজলে জ্বর আসবে আর স্কুল মিস হবে—এই কথাইতো বলি সবাই ।

আমাদের সময়ে এতো চাপ ছিলো না তাই বলে কি কেউ মানুষ হয়নি ? শিক্ষাপদ্ধতি শুধু বইয়ের সংখ্যা বাড়িয়েই চলছে । ওরা কতজন এই ভার নিতে পারছে সেটা দেখার বা ভাবার মতো কেউ নেই । ক্লাস আর কোচিং এর বাহিরে কতোটুকু অবসর পায় বাচ্চারা ?আমরা নিজেরাও বলি এই জেনারেশন ফার্মের মুরগি আর নেট জেনারেশন ।…কথা সত্যি তবে ভাবি না কেনো ওরা এমন হচ্ছে ? স্কুল,কোচিং শেষ করে ওদের আর এনার্জি থাকে না । কোনোমতে সংক্ষেপে খাওয়া সেরে নেয় । আমাদের সময়ে সব খাওয়া শিখেছি কারণ এতো চাপ ছিলো না আর মা বাবাদের আকাশ্চুম্বী চাহিদাও ছিলো না।

যেভাবে দুইদিন পর পর শিক্ষাপদ্ধতি বদল হয় মনে হয় ওরা গিনিপিগ –পরীক্ষাগারের ! ব্যাপারটা অনেকটা এইরকম শিক্ষাপদ্ধতি আর অভিভাবকরা ওঁত পেতে বসে আছি বাচ্চাদের বলির পাঁঠা করার জন্য । এতো, এতো চাপ নিতে গিয়ে ওদের ভেতরের সুকোমল বোধগুলো হারিয়ে যাচ্ছে । অবশ্যই সবাই সন্তানের ভালোই চাই । চাই কঠিন বাস্তবতায় ওরা টিকে থাকুক ।ভালো রেজাল্ট করুক । কিন্তু কেউ যদি একবার খারাপ করে শিক্ষাপদ্ধতি তাকে আর উঠে দাঁড়াতেই দেয় না অথচ এটা হবার কথা নয় । একটা রেজাল্ট যদি কোনো কারণে খারাপ হয় সে অনেক জায়গায় এপ্লাই করার সুযোগ পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে ।—-এটা কতোটা যুক্তিসঙ্গত ???

আগে নভেম্বর মাসে পরীক্ষা শেষ হতো,বাচ্চারা হাতে সময় পেতো এখন পরীক্ষা শুরুই হয় ডিসেম্বর মাসে আর শেষ হবার পর হাতে ছুটি থাকে ৮/১০দিন । এক তারিখেই আবার স্কুল শুরু, বই দেয়া শুরু, ওদের অবসর কই ? রিফ্রেশ,রিলাক্স হবার জায়গাটুকুও নিয়ে নিয়েছি আমরা । এরা শুধু ফাস্টকাজিন চিনে আর আমরা চৌদ্ধগুষ্ঠি পর্যন্ত চিনতাম আর মেহমান আসা মানেই পড়া ফাঁকি ।

আর এখন কারো বাসায় যেতে হলে আগে জিজ্ঞেস করতে হয় বাচ্চাদের পরীক্ষা আছে কিনা ? আর মা বাবাদের দোষ ইবা কি ? দুইদিন পর পর শিক্ষাপদ্ধতি যেভাবে বদলায়! তারাও অসহায় , দেশে যে এতো এতো A+ সংখ্যা বাড়ছে তাতে আমরাও লোভী হচ্ছি । ওদের ফাউন্ডেশন মজবুত করার বদলে প্রশ্নব্যাংক মুখস্ত করিয়ে আমরা ভাবছি সফলতা,  কারণ এটা না পেলে বাচ্চারা অনেক জায়গায় ফরম পর্যন্ত তুলতে পারে না । আকাশছোঁয়া চাহিদার জন্য শিক্ষাপদ্ধতি কি অনেকটা দায়ী নয় ? বইয়ের পড়াতে বাচ্চারা মজা পাচ্ছে কিনা অথবা আনন্দ আছে কিনা সেটা নিয়ে কেউই ভাবে না ,কেউ প্রতিবাদী হলেও বিপদ ।

বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতি শিক্ষকদের ব্যবসায়ী করে তুলেছে, ক্লাসে পড়ায় না, কোচিং করতেই হয় আবার স্কুল কর্তৃপক্ষ জে এসসি, পিএসসি,এস এস সি নিয়ে স্পেশাল কোচিংক্লাস বাধ্যতামুলক করে রেখেছে কেউ কিছু বললেই বাচ্চারা পড়ে রোষানলে । এই যে বাচ্চাদের জোর করে চাপিয়ে দেয়া –এটা কতোটা সুস্থ্যতার পরিচয় ? স্কুলের বেতন দেবার পরেও কেনো আমাদের বাচ্চাদের কোচিং বাধ্য হয়ে চাপিয়ে দেয়া হয় ? কে দিবে উত্তর ? বোর্ড ফরম ফিলাপের টাকা নির্দিষ্ট করে দেবার পরেও অনেক স্কুল বাড়তি টাকা নেয় ।… শিক্ষা এখন স্রেফ ব্যবসা ।

কিছুদিন পর শুধুমাত্র সামর্থ্যবানরাই বাচ্চাদের পড়াতে পারবে, বাকিরা টাকার জন্য ঝরে যাবে । আগের শিক্ষাপদ্ধতিতে তৃণমূল থেকে অনেকেই মেধা আর যোগ্যতা দিয়ে উঠে এলেও এটা এখন আস্তে,আস্তে অকল্পনীয় ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে । আমরা সবাই দেখছি,বুঝছি তবুও মুখ খুললেও কিছুই হচ্ছে না ।শিক্ষাপদ্ধতি আর প্লাসের ফাঁদে রেজাল্টের পর অনেক বাচ্চাই কুইট করে তবুও কিছুরই পরিবর্তন হয় না, যারা হারায় তারাই আজীবন ভুগে ।
আমাদের মতো সুন্দর শৈশব ওদের নেই হয়ত সেটা এখন আর সম্ভবপর নাহ তবুও এতো,এতো বই না গিলিয়ে যদি পড়াটা আনন্দদায়ক হতো বাচ্চাগুলো হয়ত অনেকটাই আরাম পেতো । ওদের অনুভূতি, সুকোমলবোধ আমরাই নষ্ট করছি আমাদের স্বপ্ন ছুঁতে, একবারও ভাবছি না অজান্তে নিজেদের পায়েই কুড়াল মারছি । এটা থেকে বেরিয়ে আসাটা খুব দরকারি –নিজেদের স্বার্থেই । না হলে পরের প্রজন্ম আরো ভোঁতা আর অনুভুতিহীন হবে ।

২১/১১/১৯

লেখকঃ  সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.