বদলে যাচ্ছে শৈশব

নাহিদ তন্ময়

পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে লুকোচুরি, গোল্লাছুট, এক্কা-দোক্কাসহ অনেক খেলার নাম জানা থাকলেও খেলাগুলোর নিয়মকানুন জানা নেই এ প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের। কম্পিউটার, ফেসবুক, ইন্টারনেট, মোবাইল, টিভি সিরিয়ালের রকমারি বিজ্ঞাপনে বন্দি তাদের স্বপ্নময় রঙিন শৈশব। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এ যুগে বর্তমান প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের ভাবনার বড় অংশ জুড়ে থাকে ‘ফ্যাশন’। বড়দের অনুকরণ করতে গিয়ে এ ধরনের প্রবণতা শিশুদের স্বাভাবিক মানসিক গঠন ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন শিশু বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর ইস্কাটনের বাসিন্দা সালেহা বেগমের মেয়ে নাফিজা হাসান স্থানীয় একটি স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। সে এ বয়সেই যথেষ্ট রূপসচেতন। মাঝেমধ্যেই মায়ের সঙ্গে পার্লারে যায়। খাবার বাছাই নিয়েও মেয়েটির রয়েছে বাড়াবাড়ি সচেতনতা।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী তামিমা (ছদ্মনাম)। মোটা হয়ে যাওয়ার ভয়ে এ বয়সেই ডায়েট করতে শুরু করেছে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা বা আলোচনায় স্থান পায় খাদ্য সংযম বা ডায়েট ইস্যুটি। আলোচনা হয় পছন্দের নায়িকাদের খাবারের মেন্যু নিয়ে এবং কী করে ‘জিরো’ ফিগারের অধিকারী হওয়া যায় এমনসব বিষয়। তামিমার খাদ্য সংযম নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই তার মা-বাবার। কিন্তু মেয়ের জেদের কাছে অসহায় তারা।

শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে তাদের মানসিক গঠন বা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। শিশু-কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং তাদের সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো জরুরি। তারা জানান, এ প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে ফ্যাশন সচেতনতা বেশি। শিশু-কিশোর বয়সে বাধাহীন জীবনযাপন ও হেসে-খেলে বেড়ানোর কথা। বন্ধুদের সঙ্গে নির্মল আড্ডা দিয়ে অবসর মুহূর্তগুলো উপভোগ করবে তারা। সে বয়সেই শিশুরা নিয়মিত পার্লারে যাচ্ছে_ ডায়েট করা নিয়ে ভাবছে।

বারডেম জেনারেল হাসপাতাল-২-এর শিশু বিকাশ কেন্দ্রের চিকিৎসক জেবুন নাহার বলেন, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা শিশুদের চিন্তায় সব সময় বুদ্ধিমত্তা, ভালোবাসা ও সরলতা বসবাস করে। এসব গুণ তাদের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব গড়তে সাহায্য করে। কিন্তু যান্ত্রিক এই শহরে শৈশবকালীন মনন ও মেধা বিকাশের সুযোগ অপর্যাপ্ত। প্রয়োজনীয় খেলার মাঠ না থাকায় শিশুরা বন্দি হয়ে পড়েছে নিজের ঘরে। আর অনুকরণ করছে বড়দের কর্মকাণ্ড। শিশুদের মানসিক গঠনে পরিবারের সদস্যদের এখনই সচেতন হওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

পুষ্টিবিদদের মতে, শিশু বয়সে খাদ্য সংযম করা একেবারেই ঠিক নয়। এতে তাদের শরীরে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে হরমোন, কিডনি এবং হাটের সুস্থতার জন্য এ বয়সে এ ধরনের অভ্যাস ক্ষতিকর। দীর্ঘমেয়াদে শরীরে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
এ প্রসঙ্গে পুষ্টিবিদ অধ্যাপক ড. গোলাম মাওলা বলেন, শিশুদের জন্য খেলাধুলা এবং শরীর চর্চা জরুরি। তাদের প্রচুর হাঁটাহাঁটি করতে হবে। তিনি বলেন, শিশুদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা তৈরি হলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে যায়। ঠিকভাবে মেধা বিকশিত হয় না। মস্তিষ্কে এর প্রভাব পড়ে।]

মানবাধিকার কর্মী এলিনা খান বলেন, বর্তমান সময়ে শিশুদের চালচলন আলাদাভাবে চোখে পড়ে। তারা অনেক বেশি সচেতন। তিনি নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, এখনকার অভিভাবকরা চান না তাদের ছেলেমেয়েরা বাইরে বের হোক। পথে যদি দুর্ঘটনা ঘটে, এ ভয়ে তাদের একা বাইরে পাঠাতে ভরসা পান না অভিভাবকরা। রাজধানীর অধিকাংশ স্কুলে খেলার মাঠ নেই। যার প্রভাবে শিশুরা ফ্ল্যাটে বা ঘরে বন্দি হয়ে পড়ছে। তাদের বিনোদনের একমাত্র সঙ্গী হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্র। টেলিভিশনের ‘কার্টুন’, ‘অ্যানিমেশন’, ‘ফেসবুক’, ‘টুইটার’_ এসবের ফাঁদে আটকে যাচ্ছে তাদের কচি বয়স। তিনি বলেন, ইন্টারনেটের ভালো-মন্দ দু’দিকই আছে। তাই পরিবারের বড়দের এসব বিষয়ে সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, এ প্রজন্মের শিশুদের শৈশব বদলে গেছে। তারা অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে শিশুরা সঠিক বা ভুলের পার্থক্য বুঝতে পারে না। অনেক সময় কোনো কিছু না বুঝেই তারা বড় ধরনের সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। তাই পরিবারের বড়দের উচিত শিশুদের ব্যাপারে বেশি সচেতন হওয়া, তাদের সময় দেওয়া। তারা কখন কোথায় কীভাবে সময় ব্যয় করছে তার প্রতি নজর রাখা। ভালো-মন্দের ব্যবধান বুঝিয়ে দেওয়া এবং ভালোটাকে গ্রহণের মানসিকতা তৈরিতে সহযোগিতা করা।

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.