সু সন্তান তৈরিতে কোরআনের ভূমিকা

হাবিবা মুবাশ্বেরা
আমরা যারা খুব সাধারণ বাঙগালী মুসলিম তাদের কাছে কুরআন হলো  একটি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ যা পাক-পবিত্র হয়ে খুব আদবের সাথে পড়তে হয় এবং পড়া শেষ হলে যত্ন করে উঁচু কোন স্থানে তুলে রাখতে হয়। যেহেতু কুরআনের ভাষা আরবি এবং এটি আমাদের  মাতৃভাষা নয় , তাই কুরআন মুখস্থ করা সাধারণের পক্ষে সম্ভব নয় ,নামাজ পড়া এবং দুআ করার জন্য কিছু সূরা এবং কুরআনের কিছু আয়াত মুখস্থ করলেই চলে –কুরআন সম্পর্কে এটাই আমাদের সাধারণের মনোভাব । আর এই মনোভাব থেকেই আমরা আমাদের সন্তানদেরও ছোট বেলায় কায়দা , আমপারা শেখানোর পর একবার কুরআন খতম দেয়াই এবং এরপর প্রতি বছর রোজার মাসে একবার করে কুরআন খতম দিতে পারলেই  পরকালের জন্য যথেষ্ট নেকি অর্জন হয়ে যায় ভেবে মানসিক তৃপ্তি পাওয়ার চেষ্টা করি। সাধারণ  বাংলা মিডিয়ামে পড়া দেশের অধিকাংশ শিশু –কিশোরদের কাছে  কুরআন  তাই একটি দুর্বোধ্য ধর্মগ্রন্থ হিসেবেই রয়ে যায়,  যা occasionally পড়তে হয় সওয়াব পাওয়ার জন্য । অথচ কুরআনের মাহাত্ম্য কি শুধু ধর্মগ্রন্থের পরিচয়েই সীমাবদ্ধ ??
যারা কুরআনের অর্থ পড়েছেন এবং বুঝেছেন তারা খুব ভালো করেই জানেন যে, কুরআনে শুধু ইসলামের অতীত ইতিহাস কিংবা মৃত্যু পরবর্তী জীবনের বর্ণনা দেয়া আছে তাই নয় বরং কুরআন হলো সুস্থভাবে জীবন যাপন করার একটি গাইডলাইন যা  ফলো করতে পারলে ইহলৌকিক জীবনেও সঠিক পথে চলা যায় । কিন্তু কিভাবে সম্ভব এই গাইডলাইন সম্পর্কে জানা এবং তা মেনে চলা ? এই জানার চেষ্টা এবং মানার চর্চা টা শৈশব থেকেই শুরু করা উচিত । আমরা যখন আমাদের সন্তানদের আমপারা তে ছোট ছোট সূরা পড়ানো শুরু করি  তখন থেকেই যদি প্রতিটি  আয়াতের বাংলা অর্থ তাদের পড়াই  , কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে কোন সূরা নাজিল হয়েছে এবং কোন সূরা থেকে শিক্ষণীয় কি বিষয় আছে –তা সাথেই সাথেই তাদের বোঝানো এবং শেখানো শুরু করি তবে কুরআন খতম করতে হয়ত সময় অনেক বেশি লাগবে কিন্তু সবচেয়ে বড় যে উপকারটা হবে তা হলো কুরআন সম্পর্কে তাদের একটি স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হবে।
অর্থ সহ সম্পূর্ণ কুরআন পড়া শেষ হওয়ার পর তারা নিজেরাই বুঝতে পারবে যে –পিতামাতার অধিকার ,শিশুর অধিকার ,নারীর অধিকার ,দেশপ্রেম ,সম্পত্তির অধিকার ,হালাল ব্যবসা ,সুস্থ প্রতিযোগিতা ,সততা, ধৈর্য ,নিরহঙ্কারীতা, বিজ্ঞান ,প্রযুক্তি ,মহাকাশ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনেরএমন কোন বিষয় নেই যে বিষয়ে কুরআনে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই !! আর  এই উপলব্ধি কুরআনের সাথে তাদের একটি আত্মিক সম্পর্কের বীজ বপন করবে শৈশব থেকেই ।  কুরআনের সব আয়াতের তাফসীর যদিও শৈশবে বোঝা সম্ভব নয় ,কিন্তু ইহলৌকিক জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা যে  কুরআনে  দেয়া আছে এই ধারণা টুকু অন্তত শিশু মনে প্রোথিত করা খুব জরুরী ।
আমরা জানি শৈশবে শিশুদের মন থাকে উর্বর  কাদামাটির মতো। এই মাটিতে শৈশবে যে গাছের বীজ বপন করা হবে পরবর্তীকালে গাছে  সেই ফুল বা ফলই ধরবে । তাই আমরা যদি শৈশবেই সন্তানদের সাথে কুরআনের সহজ বোধগম্য সম্পর্ক তৈরি করে দিতে পারি  তবে পরবর্তী জীবনের যে কোন প্রতিকূল বা অনূকুল  পরিস্থিতিতে সে তার করণীয় সম্পর্কে জানার জন্য কুরআনের শরণাপন্ন হবে । আজকের যুগে আমরা যেমন যে কোন বিষয় জানতে গুগল বা ইউটউবে সার্চ দেই তেমনি কুরআনের সাথে আত্মিক সম্পর্ক   নিয়ে বেড়ে উঠলে সেই সন্তান জীবন চলার পথের সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কুরআনের আশ্রয় নিতে অভ্যস্ত হবে । আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ,মানুষ যখন নিজে পড়ে কোন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে তখন তাকে কথার ফুলঝুড়ি দিয়ে brainwash করে বিপথে চালিত করা সহজ হয় না । যে মানুষ নিজে কুরআন পড়ে জীবন সম্পর্কে ধারণা নেয় তাকে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্তও করা যায় না ।
তাই সচেতন মুসলিম অভিভাবকদের প্রতি আমার অনুরোধ ,আসুন আমরা আমাদের সন্তানদের বিশুদ্ধ আরবি উচ্চারণে কুরআন শেখানোর পাশাপাশি তাদের কুরআনের বাংলা অর্থও পড়াই যেন তারা কুরআনের সার্বজনীন দিকটি র সাথে শৈশব থেকেই পরিচিত হয় এবং কুরআনকে একটি ধর্ম গ্রন্থ হিসেবে সযত্নে বুকশেলফে তুলে না রেখে তাদের নিত্যদিনের পথ চলার গাইড  হিসেবে সঙ্গী  করে নেয় ।

চলবে

লেখকঃ সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.