একজন মা ও একজন সন্তান

ইশরাত জাহান রোজী

আজ আমার নিজস্ব কিছু চিন্তা-ভাবনার কথা লিখতে বসেছি।এখনকার সমাজে প্রায়ই মায়েদের প্রতি সন্তানদের অবহেলার কথা শুনি, খবরের কাগজে পড়ি। বিষয়টি বর্তমানে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ফেসবুকেও বহুল আলোচিত হয়।

এই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে গেলেই প্রথমে আমার মনে প্রশ্ন আসে, সন্তানেরা কেন মাকে অবহেলা করবে? আর,এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমার মনে আসে আমরা নারীরা বা মায়েরাই কি এর জন্য কিছুটা দায়ী নই?
কারণটা,একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন। দেখুন, আমরা যখন মা হই তখন সংসারে আমাদের নিজস্ব প্রয়োজন, চাওয়া, পাওয়াগুলোর কথা ভুলে যাই স্বাভাবিক ভাবেই।
খাবার ব্যাপারটাই বলি–সন্তান বড় না হওয়া পর্যন্ত স্বামীর পাতেই তুলে দিই মাছের মাথা, মুরগীর রান,ভালো মাংস। ‘ভালো’ শব্দটা যেন বেশিরভাগ পরিবারের পুরুষদের অধিকারের বিষয়। তাতে পরিবারের নারীদের অধিকার থাকে না তেমন। তবে, ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। কিন্তু, আজ ব্যতিক্রম বিষয়টি নিয়ে কথা বলব না।

যাই হোক, এরপর সন্তান বড় হলে, খেতে শিখলে স্বামীর অধিকারের অংশটা সন্তান অলিখিত ভাবেই কেড়ে নেয়। রান্না-বান্না করতে করতে মায়েরও যে কখনো কখনো মাছের মাথা বা মুরগীর রানটা খেতে ইচ্ছে হতে পারে,একথা কি সন্তানের জায়গায় দাঁড়িয়ে কখনো ভাবি আমরা?
বেশিরভাগই ভাবি না। মায়েরা ত্যাগ করবে-এটাই নিয়ম, নিজে না খেয়ে সন্তানকে খাইয়ে সুখ পাবে-এটাই নিয়ম। কিন্তু এই নীরব নিয়মে মায়েরা যে কখন তাদের সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে দিয়েছে তার ইতিহাস খুঁজে পাওয়া দূরহ। আমরা মায়েরাই আমাদেরকে সন্তানদের কাছে মূল্যহীন করে রাখি।
সন্তান কিছু দিতে চাইলে বলি, না থাক লাগবে না। খাবার কিছু দিতে গেলে বলি,এটুকু তুমিই খাও,আমার লাগবে না!
কিন্তু কেন? মায়েদের কি সত্যিই খেতে মন চায় না? চায়। কিন্তু মায়েদের খেতে নেই, বলতে নেই, চাইতে নেই। এটাই যেন বাস্তবতা।

এবার একটু আমার ও আমার সন্তানের কথা বলি। রীশাদ অনেক ছোট, বয়স মাত্র এগারো। ও ছোট বেলা থেকেই আমাকে ওর হাতে থাকা, বা বাইরে থেকে কিনে আনা খাবার যখনই দিতে চেয়েছে, আমি কখনো ‘না’ করিনি। ওকে বুঝতে দিয়েছি, আমারও খেতে ইচ্ছে করে। কিংবা,ও দিতে ভুলে গেলেও আমি চেয়ে নিয়েছি। উদ্দেশ্যে একটাই ছিল, আমারও ইচ্ছে আছে এটা ওর মনে প্রতিষ্ঠিত করা।

রীশাদ, সামিয়া দুজনই ওদের দৈনন্দিন কাজগুলো ছোট বেলা থেকে নিজেরাই করে। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ওদের ব্যাগ গুছানো, জুতা, ব্যাগ পরিস্কার, ইউনিফর্ম পরিস্কার সবই ওরাই করে। আমি করে দিতে পারতাম না, তা নয়। কিন্তু ওদেরকে দিয়ে করিয়েছি বলেই এখন ওরা অভ্যস্ত।

মাঝেমাঝে শরীরটা খারাপ করলে রান্না করি না। ওদেরকে বুঝতে দিই,মায়েরও শরীর খারাপ হয়। ওরা সেটা বুঝে নিয়ে নিজেরাই খাওয়ার ব্যবস্থা করে নেয় কিংবা যা আছে তা দিয়েই দু’এক বেলা দিব্বি চালিয়ে নেওয়া যায়, এটুকু মেনে নিতে শিখে গেছে।

আমার মনে হয়,প্রতিটা মায়ের উচিৎ সন্তানের কাছে নিজের ইচ্ছেগুলো প্রতিষ্ঠিত করা। কিছু কিছু জিনিস ছোটবেলা থেকে মনে গেঁথে গেলে সেটা পজিটিভ প্রভাব পরবর্তীতে পাওয়া যায়-এটা আমার বিশ্বাস।

আমি জানি না,আমার কথাগুলোর সাথে সবাই একমত হবেন কিনা। তবে,এটা সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব মতামত। তাই,অনায়াসেই কেউ দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন।

ধন্যবাদ।

০২/১১/২০১৯ইং

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.