সুসন্তান তৈরিতে মায়ের ভূমিকা

হাবিবা মুবাশ্বেরা

নেপোলিয়ান বলেছিলেন, “আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে একটি শিক্ষিত জাতি দিব” । এই কথাটির তাৎপর্য আমি আমার নিজের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে প্রতিটি পদে পদে উপলব্ধি করেছি। আজকের যুগের শিক্ষিত মেয়েদের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা এই যে, ‍ শিক্ষিত হওয়ার পর একটি চাকরী না করলে বা কোন কোন ভাবে অর্থ উপার্জনের সাথে জড়িত না হলে  বোধহয় শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন পুরোটাই ব্যর্থ হয়ে যায় । কিন্তু সত্যিই কি তাই ? বরং শিক্ষা তো হলো একটি আলোর মতো যা সর্বক্ষেত্রেই দ্যুতি ছড়াতে পারে। এবার একটু বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক ।

আমরা জানি পরিবার হচ্ছে একটি সমাজের প্রাথমিক ভিত্তি যেখান থেকে তৈরি হওয়া এক একটি আলোকিত মানুষ এক একটি ইটের মতো একত্রিত হয়ে তৈরি করতে পারে একটি আলোকিত সমাজের ইমারত । আর এই পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু যদি হয় একজন  শিক্ষিত নারী তবে সেই পরিবারে র সুসন্তানেরা একটি আদর্শ সমাজ গঠনে ইতি বাচক ভূমিকা রাখতে পারে । সুসন্তান তৈরি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া,অনেকটা বীজকে বৃক্ষে পরিণত করার মত। বীজ বপনের পর থেকেই যেমন তার পরিচর্যা শুরু করতে হয় তেমনি একজন সুস্থ সন্তান পাওয়ার জন্য সন্তান গর্ভে আসার পর থেকেই তার প্রতি যত্নশীল হওয়া দরকার । আর এ ক্ষেত্রে একজন মেয়ে যদি তার শিক্ষিত হওয়ার সুবিধাকে কাজে লাগায় যেমন, গর্ভাবস্থায় কোন ধরনের খাবার খাওয়া দরকার, কতবার ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার, চলাফেরার ব্যাপারে কি ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার প্রভৃতি বিষয়ে বই , ম্যাগাজিন পড়ে কিংবা ইন্টার নেট থেকে তথ্য নিয়ে সে নিজের প্রতি সচেতন হয় তবে সে একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে পারে। 

একইভাবে সন্তান জন্মের পর থেকে তাকে ছয় মাস পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধ খাওয়ানো, ছয় মাস পর থেকে কি ধরনের খাবার খাওয়ালে, কিভাবে প্রতিপালন করলে  তার শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উভয় ধরনের বিকাশ ঘটবে তা জানা ও মানার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষিত মায়ের ভূমিকা হতে পারে অগ্রগণ্য। এরপর সন্তান যখন কথা বলতে শেখে তখন তার মুখের ভাষা কেমন হবে, কথা বলার সময় তার শারীরিক অঙ্গভঙ্গি কেমন হবে, বিভিন্ন বয়সী, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার এবং ভিন্ন ধর্মে র  মানুষের সাথে তার ব্যবহারের ভিন্নতা কেমন হবে, টিভিতে কোন ধরনের অনুষ্ঠান দেখবে, মোবাইল বা ট্যাবে কোন ধরনের গেমস খেলবে এমনকি পোশাক নির্বাচন ও সাজ-সজ্জার ক্ষেত্রে তার রুচি কেমন হবে –এসব কিছুর মধ্যেই মা তার শিক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারে তার সন্তানের মাঝে । 

সন্তানের যখন প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু হয় তখন একজন শিাক্ষত মা যদি নিজে তার সন্তানকে পড়ান ,অন্তত প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত পড়িয়ে তার বেসিক তৈরি করে দেন  তবে সেই ভিত্তি হয় অনেক মজবুত । কারণ একজন মা যতটা আন্তরিকতা নিয়ে বিশদভাবে পড়াতে পারেন ,অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আসা একজন গৃহশিক্ষকের পক্ষে তা সম্ভব নয় । তাছাড়া মা নিজে পড়ালে তিনি তার সন্তানের দুর্বলতা কিংবা আগ্রহের বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারেন যা পরবর্তীতে সন্তানের উচ্চ শিক্ষার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কাজে লাগে । একটা পর্যায়ে গিয়ে হয়ত সব শিক্ষিত মায়ের পক্ষেই সন্তানকে নিজে পড়ানো সম্ভব হয় না ,যেহেতু শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল । কিন্তু তখনও যদি একজন মা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সন্তানের উপর পুরোপুরি নির্ভর না করে নিজেও অন্তত মনিটরিং এ রাখেন তবে সন্তান লক্ষ্যচ্যুত হতে  পারে না ।

 এরপর সন্তান যখন আরও বড় হয় তখন তার পরিচিতের পরিধি বিস্তৃত হয়, জীবন সম্পর্কে নিজস্ব মতামত তৈরি হয় । শুধু “জন্মদাত্রী মা বলেই সারা জীবন তাকে গাইড করার অধিকার আছে ”– এই মনোভাব নিয়ে তখন আর সন্তান কে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না । “ মা তোমার চেয়ে আগে পৃথিবীতে এসেছে বলে সে তোমার চেয়ে বেশী জানে কিংবা মা যা বলে সন্তানের মঙ্গলের জন্যই বলে”— এই জাতীয় কথা তখন অনেক সন্তানের কাছেই আবেগতাড়িত বাক্য মনে হয় ,বাস্তবে গুরুত্ব পায় না । তাই এই পর্যায়ে এস সন্তানের সাথে যেন দূরত্ব তৈরি না হয় সেক্ষেত্রেও  শিক্ষাই পারে একজন মাকে সহায়তা করতে। একজন মা যদি প্রতিদিন পত্রিকা পড়ে, ফেসবুক ,গুগল ,ইউটিউবে সক্রিয় থেকে চলতি বিশ্বের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে আপডেট থাকেন অর্থ্যাৎ রাজনীতি ,অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ,বি জ্ঞান ,প্রযুক্তি ,পোশাক ,প্রভতি বিষয়ে কোন ট্রেন্ড চলছে তা সম্পর্কে অবগত থাকেন তখন কিন্তু সন্তান তাকে আর ব্যাকডেটেড বলে দূরে সরিয়ে রাখে না । একজন কলেজ বা ভার্সিটি পড়ুয়া সন্তান তার বন্ধুদের সাথে যে বিষয়ে আড্ডা দিতে পারে সে বিষয় গুলো যখন সে মায়ের সাথেও শেয়ার করতে পারে তখন অনেক বন্ধুদেরর ভীড়েও “মা”ই থাকে তার “বেস্ট ফ্রেন্ড”। জীবনের যে কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্বে সে তার মায়ের সাথে আলোচনা করে । 

এভাবে একজন শিক্ষিত মায়ের সার্বিক তত্বাবধানে বেড়ে ওঠা একজন সন্তানের ইয়াবার নেশায় আসক্ত হয়ে অপরাধমূলক কাজ করা , প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করা কিংবা বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে জঙ্গী প্রশিক্ষণ নেয়ার মতো ক্ষতিকর কাজ করার সম্ভাবনা থাকে অনেক কম । “প্রতিটি মানুষেরই যে সমাজের প্রতি ভালো কিছু করার দায়বদ্ধতা আছে ”–এই বোধ একজন সন্তানকে সুসন্তানে পরিণত করে।  

তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নেয়ার পরও পারিবারিক বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে চাকরী করতে পারছেন না বলে যেসব মায়েরা হতাশায় ভুগছেন তাদের প্রতি আমার আহ্বান , “এত লেখাপড়া শিখেও  জীবনে কিছুই করতে পারলাম না” বলে হীনমন্যতায় না ভুগে আসুন আমরা আমাদের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে এক একজন সুসন্তান গড়ে তুলি যারা সমাজের আলোক বর্তিকা হিসেবে কাজ করবে আর সেই সাথে এটাও প্রমাণ করি যে, শিক্ষা মানে শুধু  ডিগ্রী বা সার্টিফিকেট নয় বরং শিক্ষা মানে হলো “ আলো “ তা সে হারিকেন ,বাল্ব , টিউবলাইট, এনার্জি লাইট কিংবা এল ই ডি লাইট —-যে ফর্মেই থাকুক না কেন সমাজের অন্ধকার দূর করতে শিক্ষারূপী আলোর ভূমিকা চিরন্তন ও অনস্বীকার্য ।

লেখকঃ সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন