সন্তানদের যেভাবে শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করেন বাবা-মারা

মাহফুজা শিরিন

কিছুদিন আগের কথা। প্রায়ই বাসা সংলগ্ন পার্কে ঘুরতে যাই।ছেলের অসুস্থতার পর ডাক্তারের মেনে চলা নির্দেশের মধ্যে এটিও একটি। বাচ্চারা দৌড়ায়-খেলে, আমি হাঁটি-বসে থাকি। এখানে বসলে অবশ্যই পা দোলাতে হবে কারণ কিউলেক্স মশার অত্যাচার। ডিএসসিসির তুলনায় যদিও ডিএনসিসি মশা নিধনে এগিয়ে তবু প্রাণীটাই এমন যাকে বিনাশ করা কঠিন একটা মারলে একশটা গজিয়ে উঠে। তথাপি আমাদের হাল ছাড়লে চলবেনা। আর এই পা দোলানোর মধ্যে একটা শৈশব শৈশব ফিলিংস আছে। মজার ব্যাপার!! শৈশবের কত খেলা চারদিকে কোন কিছুতেই তাল মিলানো যায় না, শুধু এই একটা ছাড়া। তাই যত মুরুব্বিরা বসে থাকেন তারা অত্যন্ত আনন্দের সাথে উদাস নয়নে এই কাজটি করতে থাকেন। যেনবা শৈশবে ফিরে যাওয়ার এক অদম্য চেষ্টা। অনেকক্ষণ আমিও তাদের সাথে তাল মিলিয়ে ভাবলাম যাই কয়েক রাউন্ড হেঁটে আসি। ঘরে ফেরার সময় হয়ে এলো। হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ পার্কের কর্ণারে চোখ আটকে গেল দেখি সাত-আটজন মেয়ে একসাথে দড়িলাফ খেলছে। একই তালে ছন্দে তারা লাফাচ্ছে। দৃশ্যটা মনোমুগ্ধকর এবং শৈশবের স্মৃতি জাগানিয়া। এ সুন্দর শৈশব কোথায় হারিয়ে গেছে!!! পায়ে পায়ে তাদের কাছে হাজির হলাম। মেয়েগুলোর বয়স আট থেকে দশের মধ্যে। জিজ্ঞেস করলাম – মেয়েরা! তোমাদের স্কুলে কি খেলা আছে? সেজন্য প্র্যাকটিস করছ? তারা একসাথে দুইদিকে মাথা নাড়লো। অর্থাৎ না। আমি প্রমাদ গুনলাম। তাহলে কী? তারা সমস্বরে বলল- স্পোর্টস আছে এবং একে অপরের দিকে তাকিয়ে মাথা দুলিয়ে এ ব্যাপারটাকে এনশিওর করল। পুরাই বজ্রাহত আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। বিষয়টা বুঝাতে চাইলাম কিন্তু তাদের মাঝে কোন আগ্রহ দেখা গেলনা বরং তারা আমাকে বুঝাতে পেরে সোৎসাহে খেলায় মনোযোগ দিল!!! অগত্যা

আমি হাঁটতে থাকলাম আর ভাবতে থাকলাম – এই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা!!! যার গোড়াতেই কোন শিকড় নেই!!!

আমাদের বাচ্চারা অন্য ভাষা অবশ্যই শিখবে প্রধানত ইংরেজি কিন্তু মাতৃভাষাকে ছুড়ে ফেলে নয়। আজকাল স্কুল বলতেই ইংলিশ মিডিয়াম আর ভার্সন। অভিভাবকরা এসব স্কুলে বাচ্চা পড়িয়ে বেশ তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেন। অথচ তাদের বাচ্চাগুলো কী ধরনের শেকড় ছিন্ন এবং পথে প্রান্তরে কতটা হাস্যরসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। তা কি উনারা ভাবতে পারেন???

একবার এক স্কুলের শিক্ষকতার জন্য যাচাই পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম। স্কুলটিতে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, ইংলিশ ভার্সন ইত্যাদি আছে। এক রুমে ১৮ বিশজনের মতো পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। পরীক্ষাটি ছিল বাংলায় এবং সামাজিক বিজ্ঞানের তত্ত্বগত বিষয়াদি। পরীক্ষার নির্ধারিত সময়ের অর্ধেক কোনভাবে পার হতেই একটি মেয়ে খাতা জমা দিতে চলে আসল এবং ইনভিজিলেটরের কাছে অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলতে লাগলো আমি একটি শব্দের বাংলা কি হবে জানি না বলে লিখতে পারছি না। আমি খাতা জমা দিয়ে দিব। সে খাতা জমা দিয়ে অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে ইংরেজি শব্দের বাংলা ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে গেল।

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম আর ভাবতে লাগলাম ইউনিভার্সিটিতে আমাদের একজন স্যার ছিলেন যিনি উপস্থিতের বদলে ইয়েস স্যার বললেই তাকে বৃটিশ আখ্যা দিয়ে গোটা ক্লাস দাঁড় করিয়ে রাখতেন এবং অত্যন্ত ব্যাঙ্গাত্মক বিভিন্ন শব্দ প্রয়োগে তার দফারফা করতেন। তাই আমরা তাঁর রোল কল শুরু হওয়ার সাথে সাথে অনুচ্চ স্বরে ‘ উপস্থিত উপস্থিত ‘ জপতে থাকতাম। এদের ভাগ্য যে এরা এমন কোন শিক্ষকের হাতে পড়েনি। তবে এইসব ঘটনায়,কথাবার্তায় আমাদেরও চক্ষু শুলায় কানে প্রদাহের সৃষ্টি করে।

আসুন ইংরেজিটা শিখি তবে বাংলাকে ভুলে গিয়ে নয়। আমরা যারা অভিভাবক আছি তারা বাসায় ইংরেজি পড়ানোর সময় বাচ্চাকে বাংলাটাও বলে দিই। যারা শিক্ষক আছেন তারা ক্লাসে শুধু ইংরেজি না পাশাপাশি বাংলা অর্থ বলুন। এমনকি আমার মতো পথচারীও কিন্তু এ দায়িত্ব কোনভাবেই এড়িয়ে যেতে পারেন না। পরিশেষে সুন্দর হোক, সুস্থ হোক আমার দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা! কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সঠিক জ্ঞান নিয়ে বেড়ে উঠুক এই প্রত্যাশায়!

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

 

আরও পড়ুন