বাবা-মা সন্তানের জন্য ভাল চায়, তা কি সব সময় ভালো হয়?

মো ইব্রাহীম খলিল
বর্তমান যুগে প্রচলিত সবচেয়ে বড় ইমোশনাল ব্লাক মেইল হল, “বাবা-মা এর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কোন কাজ করলে, সেটার ফল ভালো হয় না।” বলা হয়, “তাঁরা অবশ্যই সব বিষয়ে সন্তানদের চাইতে ভাল বুঝেন এবং তাঁরা যা করেন সন্তানের ভালোর জন্যই করেন।” এই কথাগুলো দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, আমাদের বাবা মা হলেন শতভাগ বিশুদ্ধ নির্ভুল মানুষ। সত্যি কি তাই? যদি তাই হবে তবে তাঁদের ভেতর থেকে যে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে তার কারণ কি?

আমাদের সন্তানদের অধিকাংশ মানসিক কষ্টের জন্ম আমাদের বাবা মায়ের হাতে। খুব যত্ন করে নিজেকে নির্ভুল ছাপিয়ে সন্তানের উপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিয়ে তাঁরা আদর্শ সন্তানের গর্বিত বাবা মায়ের তকমা নিতে ব্যস্ত। আমি বলছি না বাবা মা যা করেন সন্তানের খারাপের জন্য করেন। তেমনি এটাও মানতে পারছিনা তাঁরা যা করেন তার সবি সন্তানের ভালোর জন্যই করেন।আমি এমনকিছু মানুষকে চিনি যারা তাদের বাবা মায়ের বাধ্য সন্তান হতে গিয়ে হয়ে গেছে নির্জীব, নিষ্প্রাণ। তাদের মাঝে একজনের সখ ছিল ফটোগ্রাফার হবে। বাবা চান সে গবেষক হবে। তার সমস্ত ছবি চর্চার সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেয়া হল নানান অযুহাতে। আজ সে না পেরেছে ফটোগ্রাফার হতে, না পেরেছে গবেষক হতে। যে তার বয়ঃসন্ধিতে নানা রকম জড়তার মাঝ দিয়ে যাওয়া ছেলেটার তীব্র মানসিক কষ্টে মনে হয়েছিল, কোথাও ঘুড়ে আসতে পারলে সে নতুন করে সব শুরু করতে পারত। সব ভালো চাওয়া বাবা-মা তার এই আবদার পূরণে  বিমুখ। সামনে পরীক্ষা, এসব ফালতু চিন্তা বাদ দিয়ে পড়াশোনা করতে বলা হল। সপ্তাহ খানেক পর ছেলেটিকে ফ্যানের সাথে ঝুলে থাকতে দেখা গেল। যে ছেলেটা আজ ব্যবসায়ী হবার কথা ছিল সেই ছেলেটা বাবার চোখের ঝলমলানি স্বপ্ন পূরনে সরকারি চাকরীর পেছনে ছুটতে ছুটতে জীবন থেকে কতোগুলো বছর হারিয়ে ফেলল। বাবা কিন্তু নিজের দোষ স্বীকার না করে বলেন, “এতো মানুষ চাকরী পায় তুই কি করিস?” অথচ বাবার চোখে একবারো সফল ব্যবসায়ী কিংবা ক্ষুদে ব্যবসায়ী উদাহরণ হিসেবে ধরা পড়েনি। ফলশ্রুতিতে ছেলেটা আজ আপাদমস্তক হতাশ একটা মানুষ।

যে মেয়েটা আজ কর্পোরেট নারীর পাশাপাশি সংসারী হবার কথা ছিল সে মেয়েটা বাবা মায়ের চাপে পরে কর্পোরেট না হয়েই সংসারী হয়েছে। সব ভাল বুঝা বাবা মা এটাই বুঝিয়েছেন,”মেয়েদের হাই এম্বিশন থাকতে নেই”। ভালো চাওয়া বাবা মায়েরা মেধাবী মেয়েটিকে বানিয়ে দিল আট দশটা সাধারণ মেয়ের মত। পছন্দের মানুষকে বাবা মা মেনে নিতে রাজি নন। বাধ্য হয়েই পরিবারের পছন্দমত বিয়ে করতে হল। ঘরের দরজা বন্ধ করে দুজন এক রুমে ঘুমালে সন্তান সংসার নিয়ে সুখেই আছে বলে বাবা মায়ের ধারণা। অথচ চার দেয়ালের ভেতরে বদ্ধ ঘরে দুজন আলাদা বিছানাও করতে পারে সেই বিষয়ে তাদের বিন্দু মাত্র ধারণা নেই।

আমি জানি না আমাদের বাবা মায়েরা নিজেদের ভুল স্বীকার করতে এতো লজ্জা পান কেন? কেন তাঁরা নিজেদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করতে চান না? কেন তাঁরা মুখ ফুটে বলতে চান না, “ভুল আমারো হতে পারে”। কেন তাঁরা মানতে চাননা, “জেনারেশন গ্যাপ একটা বড় বিষয়। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ভাবনার পরিবর্তন হয়েছে, ইচ্ছার পরিবর্তন হয়েছে। যেমনটি হয়েছিল তাঁর সাথে তাঁর বাবার, তাঁর বাবার সাথে তাঁর বাবার।” সন্তানের উপর জোর করে নিজের সমস্ত ইচ্ছাগুলো চাপিয়ে দিয়ে সন্তানের মানসিক কষ্ট বাড়িয়ে তাঁরাকি স্বার্থপরতার পরিচয় দিচ্ছেন না?

তাঁরা কি বাবা-মায়ের অধিকার ফলাতে গিয়ে নিজের সুখ গুলো হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন না? যদি তা নাই হবে তবে কেন তাঁরা তাদের সন্তানদের ইচ্ছাকে গুরুত্বহীন চোখে দেখেন? এর সমাধান কোথাও আমি জানি না। আমি শুধু জানি, এই মূহুর্তে পৃথিবীর

বিভিন্ন জায়গায় অনেক সন্তান একদম ভালো নেই। যে পড়াশুনা, ক্যারিয়ার, সংসার তার জন্য প্যাশন হওয়ার কথা ছিল, সেসব এখন তার কাছে বোঝা। এই বোঝার ভার সহ্য করতে না পেরে অনেকেই মানসিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে !! অথচ আমাদের বাবা মায়েরা যদি নিজেদের স্বপ্নের সাথে সন্তানের স্বপ্ন একত্রিত করে স্বপ্নগুলোকে সংকলিত করত তবে এমনটি
হত না।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন