সুষ্ঠু প্যারেন্টিং এর জন্য কী জানবেন?

কানিজ ফাতেমা

প্যারেন্টিং বিষয়টা খুব বেশী দিন আগে আমাদের আলোচনার বিষয় হিসাবে পরিচিতি পায়নি। যদিও পৃথিবীর শুরু থেকেই বাবা মায়েরা সন্তাল লালন পালন করে আসছেন কিন্তু এটা যে শেখার মতন একটা বিষয় সেটা আমরা অনুধাবন করছি মাত্র কয়েক বছর হলো। আমরা বুঝতে পারছি অন্তত এই যুগে পারেন্টিংকে “এমনি এমনি ” হয়ে যাবার বিষয় হিসাবে ছেড়ে দেবার কোনো সুযোগ নেই। যদিও সন্তান লালন-পালন এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গঠনে প্রতিটি পিতা-মাতা কিংবা অবিভাবকের আকাশ ছোয়া আকাঙ্খা থেকে, কিন্তু বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সময়মত সুষ্ঠ এবং সুন্দর পরিকল্পনা থাকে না। সন্তান লালন পালনের সার্বিক বিষয়গুলো অনেকটা গৎবাধা নিয়মে অতিবাহিত হয়। কিন্তু এখন এটা আমাদের কাছে পরিস্কার যে ভালো ও যথাযথ প্যারেন্টিং সন্তানের সুষ্ঠ বিকাশের জন্য জরুরী এবং এর জন্য দরকার দক্ষতা ও প্রস্তুতি; এর জন্য দরকার পড়াশুনা ও প্রাকটিস।

শিশুদের লালন পলনে বাবা মায়েদের যা জানা দরকার একজন শিক্ষকের দৃষ্টিকোণ থেকে তা আজ তুলে ধরার চেষ্টা করব। বিস্তারিত খুঁটি নাটি তে না গিয়ে প্যারেন্টিং এর মূলনীতি গুলো এক বইতে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

এক: সন্তানের জীবনের মূল প্রভাবকগুলোকে জানুন –

পারেন্টিং এর জন্য প্রথমেই যেটা বোঝা দরকার তা হলো আপনার সন্তানের বেড়ে ওঠার পেছনে কোন শক্তি গুলো মূল প্রভাবক হিসাবে কাজ করছে সেটা জানা। বর্তমান সময়ে বাচ্চাদের বেড়ে ওঠাকে ৩ টি বিষয় বিশেষভাবে প্রভাবিত করে ।

১. পারেন্টিং-বাবা-মা ও অন্যান্য অভিভাবকরা বাচ্চাকে কিভাবে বড় করছেন এবং তারা নিজেরা নিজেদের ভেতর কেমন পারস্পরিক আচরণ করছেন ।

২. স্কুল সিস্টেম – শিক্ষক-শিক্ষিকার মান ও চরিত্র, কারিকুলাম, বই সহ অনান্য লেখাপড়ার উপাদান, অভিভাবকদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও দর্শন কেমন ।

৩. বন্ধু ও মিডিয়া – বাচ্চারা মিডিয়াতে কি দেখছে ও বন্ধুদের কি করতে দেখছে।

এই প্রভাবকগুলা এতটাই পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত (interrelated) যে প্রত্যেকটা প্রত্যেকটাকে প্রভাবিত করে। এই তিনটি উপাদান যদি পজিটিভ হয় তবে শিশুর বেড়ে উঠা সুসম হবে। তাই বাবা মায়েদের মনে রাখতে হবে নিজেদের পারেন্টিং এর পাশাপাশি অন্য দুটি প্রভাবককেও আমলে আনা জরুরী ।

এটাকে আমরা একটা ত্রিভূজের সাথে তুলনা করতে পারি-

ত্রিভুজের উপরের চুড়াতে অবস্থান করেন বাবা-মা। কারণ একজন সচেতন বাবা-মা বাকী উপাদান দুটোকে অনেক বেশী প্রভাবিত করতে পারেন। যেমন ধরুন স্কুল সিস্টেমের ব্যাপারে, সচেতন বাবা মায়েরা শুধু স্কুলের সুনাম বিবেচনা না করে সুনামের পাশাপাশি স্কুলের মূল্যবোধ, শিক্ষকদের আচরণ, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়গুলোও বিবেচনা করবেন। শুধু স্কুলের কারিকুলামের বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্যান্য উপকারী বই বাচ্চাকে নিয়ে পড়বেন । বাসায় বাচ্চার জন্য ও নিজেদের জন্য ছোট করে হলেও লাইব্রেরী রাখবেন। মনে করছেন, অনেক জায়গা লাগবে? একটা আলমারী এমনকি আপনার ড্রেসিং টেবিলের এক পাশকেও ব্যবহার করতে পারেন লাইব্রেরী হিসাবে। বাচ্চার স্কুলের শিক্ষকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা খুবই জরুরী। নিজের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি অনেক কিছুই আপনার চোখে পড়ার আগে শিক্ষকের চোখে পরে। প্যারেন্ট মিটিং এ নিয়মত যাওয়া বাবা -মায়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর অন্যতম। এভাবে বাবা মায়েরা স্কুল সিস্টেমের অনেক কিছুকেই প্রভাবিত করতে পারেন এবং বাচ্চার জন্য পসিটিভ হিসাবে নিশ্চিত করতে পারেন ।

বাচ্চার বন্ধু তৈরী করতে সক্রিয় ভুমিকা নিন। আপনার বাচ্চার বয়স যখন ৬.৭.৮.৯.১০ তখনি তার চারপাশ থেকে কে কে তার বন্ধু হতে পারে তা খেয়াল করুন। তাদের পরিবার সম্পর্কে খোজ নিন। তাদের বাবা মায়ের সঙ্গে আপনারা বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ুন – এভাবে নিশ্চিত হতে পারবেন যে আপনার সন্তান কেমন পরিবারের সন্তানের সঙ্গে মিশছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের দাওয়াত দিন , তাদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকুন। কৈশোরে ভুল বন্ধু বেছে নেবার ঝুকি এভাবে আপনি শৈশবেই কমিয়ে ফেলতে পারেন।

মিডিয়ার ব্যাপারে নিজে সচেতন হন। নিজে এমন কিছু দেখবেন না যা আপনি চাননা আপনার বাচ্চা দেখুক ( যেমন অনৈতিক টিভি সিরিয়াল) । টিভি চানেলে ভালো কিছু না থাকলে youtube থেকে ভালো জিনিস ডাউনলোড করে রাখুন , পরে বাচ্চাকে নিয়ে দেখুন। সপ্তাহে একদিন মুভি নাইট করতে পারেন – মুভি দেখার পর এ নিয়ে আলোচনা সমালোচনা একটি ভালো শিক্ষনীয় ব্যাপার। এতে বাচ্চরা মিডিয়ার সবকিছুকেই যে প্রশ্নাতীত ভাবে বিশ্বাস করতে হয়না সেটা শিখে যায়।

আপনার সন্তানের জীবনে বড় ও সার্থক হওয়া জরুরী – কিন্তু তার থেকেও বেশী জরুরী মানুষ হওয়া।

সন্তানের মাঝে মানবিক গুণাবলীর বিকাশ করুন। অনেক বাবা-মা এর মাত্রাতিরিক্ত মাইক্রো লেভেল প্যারেন্টিং অনেক ক্ষেত্রে বাচ্চাকে আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর ও স্বেচ্ছাচারী করে তোলে।

আপনার সন্তান অবশ্যই আপনার প্রায়োরিটি, কিন্তু সবসময় সব পরিস্থিতিতে তার সব ইচ্ছা বা আরাম আপনার প্রায়োরিটি না। বাড়ীর কেউ অসুস্থ, তার সেবা করতে গিয়ে যদি আপনার সন্তানের লেখাপড়ায় কিছুটা ব্যাঘাত ঘটে তবে তা ঘটতে দিন। আপনার সন্তানের কিছুটা কষ্ট হবে বা লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটবে বলে আপনার স্বামীকে তার অসুস্থ মাকে দেখতে যেতে দিবেন না – এটা আপনার সন্তানের চরিত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। আপনার সন্তানের স্কুল কামাই যাবে সেই অজুহাতে আপনার স্ত্রীকে তার বৃদ্ধ বাবাকে দেখতে যেতে দিবেন না – এটা আপনার সন্তানের কোনো কল্যাণ সাধন করবে না। আশ্চর্য্য হবার কিছু নেই যদি এই মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব পাওয়া সন্তান বড় হয়ে স্বার্থপর ভাবে আপনাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয় তার ক্যারিয়ারের সুবিধার জন্য। কারণ আপনিই তাকে শিখিয়েছেন কেবল নিজেরটা নিয়ে ভাবতে, কেবল নিজের সব প্রয়োজনকে বড় করে দেখতে আর অন্যের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করতে।

লেখকঃ কলামিস্ট এবং প্রবাসী বাংলাদেশী, যুক্তরাষ্ট্র

 

আরও পড়ুন