আদর্শ সন্তান গড়তে বাবা-মায়ের ভূমিকা

আব্দুল্লাহ আল মামুর

আমরা সবাই অন্যের মুখে হাসি ফুটিয়ে, আনন্দে বুক ভরিয়ে নিজে শুন্যহাতে কাঁদতে কাঁদতে পৃথিবীর বুকে প্রবেশ করি। এরপর ধীরে ধীরে মায়ের আদর, নিবিড় মায়া মমতা, বাবার প্রশস্ত বুকের ভালোবাসা, ভাইয়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সঙ্গ ও সাহায্য, বোনের হাসিমুখের উজ্জ্বলতায় ভবিষ্যৎকালের সকল দুর্দিনে পাশে থাকার নিশ্চয়তা নিয়ে
বড় হতে থাকি।

কেটে যায় শিশুকাল।
কেটে যায় দুরন্ত কৈশোর।
এসে যায় যৌবন।

আকাঙ্ক্ষা অনুভূত হয় নাম না জানা কোনো এক রাজকন্যার কিংবা রাজকুমারের। স্বপ্ন দেখতে থাকি নতুন এক রোমাঞ্চকর নাট্যমঞ্চের। জীবন এগিয়ে চলে। হৃদয়টাকে নতুন করে সাজাতে রাঙা পায়ে জীবনে ধীরে ধীরে প্রবেশ করে সেই
স্বপ্নের মানুষ।

অবচেতন মনের কল্পনার বাগানে নেচে গেয়ে হেসে খেলে বেড়াতে থাকে আগামীদিনের পুত্র-কন্যা।

প্রায় প্রতিটি মানুষই বিবাহিত জীবনে প্রবেশের পর সন্তান কামনা করেন। অধিকাংশ দম্পতিই হন সন্তানের গর্বিত পিতা-মাতা। কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিৎ শুধু সন্তান জন্ম দিয়েই পিতা-মাতা হওয়া যথেষ্ট নয়। আমাদেরকে হতে হবে দায়িত্বশীল পিতা বা মাতা। অন্যথায় দুনিয়াতে যেমন রয়েছে ভোগান্তি, আখিরাতেও রয়েছে তেমনি অশান্তি এবং অপেক্ষমান নিচ্ছিদ্র জবাবদিহিতা এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলার জন্য চরম লাঞ্ছনা।

পবিত্র কুরআনে সূরা আত-তাহরীমের ০৬ নং আয়াতে আল্লাহতালা বলেন ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন হতে বাঁচাও, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।

শিশুকে মূলত ভালো-মন্দ উভয় চরিত্রের মিশ্রণে সৃষ্টি করা হয়েছে। তার পিতামাতাই তাকে ভালো-মন্দের যে কোনোটির দিকে ধাবিত করেন। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা‌’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “প্রতিটি শিশু (ইসলাম) ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে। তার পিতামাতাই তাকে ইহুদী বানায়, খ্রিস্টান বানায় অথবা অগ্নিপূজক বানায়।” (সহীহ বুখারী : ১২৯২)

সন্তানকে শুধুই জাহান্নামের আগুনই নয় বরং যে কোন খারাপ থেকে রক্ষা করার উপায় হলো, আমাদেরকে তাকে শিষ্টাচার সম্পন্ন, সভ্য ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী করে গড়ে তুলতে হবে। তাকে অসৎ সঙ্গ থেকে বিরত রাখতে হবে বিভিন্ন কৌশলে । তাকে ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝিয়ে দিতে হবে বুদ্ধিমত্তার সাথে। তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান করতে হবে বাবা-মা সবাইকে। নিজেদের অতিরিক্ত সুখ সাচ্ছন্দ ত্যাগ করে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে শিশুদের আদর্শ মানুষ বানাতে।

পক্ষান্তরে আমাদের বেখায়ালে তারা খারাপে অভ্যস্ত করা হলে, তাদেরকে পশুর ন্যায় অবহেলা করবে সমাজ, তারা হবে হতভাগ্য এবং উভয় দুনিয়ায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। আর এর দায় বর্তাবে আমরা যারা বাবা, মা, অভিভাবক, তাদের ওপর।

আরেকটি কথা, সন্তান যত ছোটই হোকনা কেন, সেও কিন্তু পরিপূর্ণ একটি মানুষ। তার বোধ-বুদ্ধি, মেধা-মনন, চিন্তা ও বিবেক এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব রয়েছে । তার ঐ ব্যক্তিত্ব তথা সত্ত্বাকে কোনভাবেই খাটো করে দেখা ঠিক নয়। সন্তানের ব্যক্তিত্বকে খর্ব করা হলে সন্তানও বাবা মায়ের ব্যক্তিত্ব খর্ব করতে দ্বিধা করবে না। তাকে প্রাথমিক অবস্থায় ভালোবাসা দিয়ে ভুল ধরিয়ে দিতে হবে লোকচক্ষুর অন্তরালে। তাকে তার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন করতে হবে তার সামাজিক সম্পর্কগুলো বুঝে উঠার আগেই।

আমরা যদি তা করতে ব্যর্থ হই তবে তারা কেয়ামাতের দিন আমাদের কলিজার টুকরা বাচ্চারা আল্লাহর দরবারে নালিশ করবে। সূরা হা-মীম সিজদার ২৯ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, “হে আমাদের প্রতিপালক! যেসব জীন ও মানুষ আমাদের পদভ্রষ্ট করেছিলো তাদেরকে দেখিয়ে দিন, আমরা তাদেরকে পদদলিত করবো। যাতে তারা সর্বাধিক অপদস্থদের অন্তর্ভূক্ত হয়।

আর যদি আমরা সফলভাবে বাচ্চাদের প্রতিপালন করতে পারি তবে তাদের মাঝে দেখতে পাবো আমাদের যাচিত আকাংখার পূর্ণ বাস্তবায়ন। তাদের চারিত্রিক সৌন্দর্য এনে দিবে আমাদের চোখের শীতলতা এবং হৃদয় ভরিয়ে দিবে প্রশান্তির মিষ্টি আমেজে।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও ব্যাংকার

আরও পড়ুন