শিশুর পরিচর্যায় পিতামাতার দায়িত্ব

এম. তামজীদ হোসাইন

শিশু বেড়ে উঠার সাথে সাথে আমরা প্রথমেই মরিয়া হয়ে পড়ি কবে শিশুকে বর্ণ শেখাব সেটা নিয়ে। অভিভাবক হিসেবে এটা পিতা-মাতার মৌলিক দায়িত্ব। সন্তানকে শিশুকাল থেকেই মেধাবী হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন সন্তান জন্ম নেওয়ার আগে থেকেই মা-বাবারা লালন করেন। তাই এই লালিত স্বপ্ন ও দায়িত্ববোধ থেকে আমাদের মা-বাবারা তাদের সোনামণিদের জন্য বিভিন্ন বর্ণ পরিচিতির বই কিনে এনে পড়ানো শুরু করে দেন। কিন্তু প্রত্যেকটা শিশু হয়তো সেইভাবে বই পড়তে আগ্রহী নাও হতে পারে। তারপরও আমরা সেই একই রীতি অনুশীলন করি। অনেকসময় অভিভাবকেরা শিশুদের পড়ার টেবিলে বসাতে ব্যর্থ হয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। অনেক মা-বাবারা অল্পতে আশা ছেড়ে দেন। শিশুদের দুষ্টু স্বভাব দেখে তারা বলেই ফেলেন যে তার সন্তানকে দিয়ে কিছু হবে না। তবুও ব্যর্থ চেষ্টা হিসেবে সন্তানদের বই গেলাতে অভ্যস্ত করার চেষ্টা করেন!

অথচ একটা শিশুকে এভাবে বর্ণ পরিচয় না শিখিয়ে যদি আর্ট এন্ড ক্রাফটের তৈরী খেলনা দিয়ে বর্ণের সাথে পরিচয় করানো যায় হয়তো খুব সহজেই একটি শিশু যেমন বর্ণের সাথে পরিচিত হতে পারবে ঠিক তেমনি শিশুর মাঝে সৃজনশীলতা ও বাস্তব জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে। মা-বাবাদের সন্তানদের পড়ার প্রতি তাদের মনযোগ বা আকর্ষণ বৃদ্ধি করার জন্য শুরু থেকেই এই ধরণের নতুন নতুন বুদ্ধি বের করতে হবে। কষ্ট হিসেবে না নিয়ে খেলার ছলে শিশুদের সময় দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। শিশুর খেলাধুলার হাতিয়ার হতে পারে বিভিন্ন ধরণের সৃজনশীল অনুশীলন।

যদিও এমন পাঠদান রীতি শহরাঞ্চলে মাঝে মাঝে গুটিকয়েক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন পাঠদান রীতি খুব কমই প্রচলন আছে। এটা হওয়ার কারণ হচ্ছে শহুরে যেসব প্রতিষ্ঠানে এই রীতি দেখা যায় সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষায়িত প্রাইভেট স্কুল। এসব প্রতিষ্ঠানের সিলেবাস, পাঠদান পদ্ধতি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। আর গ্রামে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি সিলেবাসভুক্ত। তাই গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাইলেও এমনটা করতে পারে না। তবে আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি চতুর্থ, পঞ্চম শ্রেণি থেকে প্রায় সব শ্রেণিতে সৃজনশীল পদ্ধতি। যদিও এই পদ্ধতি এখনো খাতা-কলমে সীমাবদ্ধ মূলত Creativity অর্থাৎ সৃজনশীল মানে হচ্ছে সম্পূর্ণ নিজের চিন্তা, চেতনা, মেধা থেকে সৃষ্টি করা। তবে এমন এক সময় আসবে প্রিয় বাংলাদেশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চীন, সিঙ্গাপুর, জাপানের মত সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান রীতি চালু করবে। প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে Industry গড়ে উঠবে। এটা এক দিনে সম্ভব না। ধাপে ধাপে হবে। সৃজনশীলতাকে আবার মেধা বিকাশের অন্যতম মাধ্যমও বলা যেতে পারে। সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ কিন্তু সৃজনশীলতার মাধ্যমেও প্রকাশ পেতে পারে। যেহেতু গ্রামের শিশুরা সৃজনশীল কিছু করার প্রেরণা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পায় না তাই শিশুর অভিভাবকদের এই দায়িত্ব নিতে হবে। এই দায়িত্ব নিতে গেলে অভিভাবকদের যা যা করতে হবেঃ

১। শিশুকে বর্ণ পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন আর্ট, ক্রাফটের মাধ্যমে। যেমনঃ Ant মানে হচ্ছে পিঁপড়া। পিঁপড়া অংকন করে ছবিতে একটা অংশে A কে Bold করে দিলে শিশু সহজেই বুঝতে পারবে A দিয়ে Ant. আর Ant মানে যে পিঁপড়া সেটা ছবি দেখে যেকোন শিশু বুঝতে পারবে। এভাবে B মানে Bird. বার্ড মানে পাখি। এমন একটা পাখি অংকন করে পারেন যেটাতে B কে Bold করা যেতে পারে।

এভাবে সব ধরণের বর্ণ পরিচয়সহ শব্দগঠন, শব্দার্থ শেখানো মনে হয় খুব বেশী সময় লাগবে না। অথচ এনালগ নিয়মে সারাক্ষণ পড়ানো হলেও মনে হয় না তেমন রেজাল্ট পাওয়া যাবে। কারণ যেকোন মানুষ যে বিষয়ে আগ্রহী না সে বিষয়ে মনযোগ দিতে পারে না। সেখানে একটা শিশু কিভাবে মনযোগ দিতে পারবে? আর মনযোগ না দিলে তো এমন হবেই! তাই মনযোগী করার জন্যই এই সৃজনশীলতা।

শিশু যখন বর্ণ পরিচয় শিখে ফেলবে তখন নিশ্চয় সে স্কুলে যাবে। অবসর সময়ে শিশুর সৃজনশক্তি বৃদ্ধি করার জন্য শেখানো যেতে পারে কিভাবে ঘুড়ি বানানো যায়। বিভিন্ন রঙের কাগজ দিয়ে ঘুড়ি বানানো শেখাতে পারেন। এরকম আরো অনেক শিল্প ও নৈপুণ্যের কাজ আছে তা শিশুকে শেখাতে পারেন। যার ফলে একটা শিশুর জানার আগ্রহ, শেখার আগ্রহ বাড়তে থাকবে। এটাই প্রকৃত সৃজনশীলতা। আধুনিকতার সাথে যারা শিশুকে তাল মিলিয়ে নিয়ে যেতে চান তাঁদেরকে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন শিশু যেমন তেমন কম্পিউটার বা মোবাইল গেমসে আসক্তি না হয়। ইলেক্ট্রনিক গেইমস শিশুদের মেধাকে যেমন বিকাশ করতে পারে তেমনি শিশুকে বিকৃত মস্তিষ্কসম্পন্ন মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে পারে। নিশ্চয়ই কোনো মা-বাবা সন্তানের খারাপটা চাইবেন না। তাই শিশুদের মস্তিষ্ককে সুরক্ষা করতে ।

কম্পিউটার বা মোবাইলে যেমন তেমন গেইমস বা সফটওয়্যার ইনস্টল করা থেকে বিরত রাখতে হবে। অর্থাৎ কম্পিউটারে বা মোবাইলে এমন কোনো গেমস ইনস্টল না করা উচিৎ যে গেমসে আসক্তির মাধ্যমে শিশুর ক্ষতি হতে পারে। গেমসে রাখতে পারেন বিভিন্ন ধরণের শিক্ষণীয় গেমস, বর্ণ পরিচয়েরও কিন্তু অনেক সফটওয়্যার বা অ্যাপস আছে। অর্থাৎ এমন গেমস বা সফটওয়্যার/অ্যাপস সিলেকশন করবেন যেন সেটা শিশুর সৃজনশীলতাকে বৃদ্ধি করে। প্রতিটি শিশুকে শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলা যেমন পিতামাতার দায়িত্ব তেমনি  শিশুকে নৈতিক শিক্ষা বা আদর্শিক শিক্ষা দেওয়াও পিতামাতার অধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। সেদিকটাও অভিভাবকদের চিন্তা করে শিশুদের গড়ে তুলতে হবে।…।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন