আমি এবং আমার বাচ্চারা

কামরুন নাহার মিশু

আজ সকালে মেয়ে ঘুম থেকে উঠার পর ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে বললাম-
‘ আস্তে আস্তে ফ্রেশ হও! মা তোমার বাবাকে নাস্তা দিয়ে আসছি। ‘

তাড়াহুড়ো করে রুমে এসে দেখি ও জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ছে। দূর থেকে দেখেই সুখের মতো ব্যাথার আবেশে আমার কণ্ঠ ধরে এসেছে, চোখের কোণ বেয়ে তৃপ্তির অশ্রুকণা টুপ করে ঝরে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমি আস্তে করে নিজেকে সামলে নিয়েছি।

চৌদ্দ মাসের ব্যাবধানে দুটো পুত্র -কন্যার মা হয়ে আমি যে কী অসহনীয় কষ্ট করেছি, দু চার রাত ননস্টপ বললেও এক একদিনের কষ্টের বর্ণানা শেষ হবে না।

আমার বাড়ির শ্বাশুড়ি, জা, বুয়া, বাচ্চারা আমাকে যে কী পরিমান সহযোগিতা করেছে, আমি এক জীবনেও কোনোকিছুর বিনিময়ে এই ঋণ শোধ করতে পারব না।

বাচ্চারা ওদের জেঠিমাদের ভীষণ ভালোবাসে, পছন্দ করে, নির্ভর করে। পুরো বিষয়টা আমার কাছে ভালো লাগে। আমি চাই এই শ্রদ্ধাবোধ, এই ভালোবাসা চির অক্ষুণ্ণ থাক। কোনো স্বার্থ সংশ্লিস্ট বিষয়কে কেন্দ্র করেও যেনো কোনোদিন এই নির্ভেজাল সম্পর্কগুলো মলিন না হয়।

একসময় চব্বিশ ঘণ্টা ওরা ভাই- বোন মারামারি করত। খেলনা নিয়ে, খাওয়া নিয়ে, শোয়া নিয়ে, বসা নিয়ে, কোনোকিছু না নিয়ে। আমি মাঝেমধ্যে এত অসহায়বোধ করতাম। কখনো কখনো ক্ষণিকের জন্য মনে হয়েছিল অল্পসময়ের ব্যাবধানে দুটো সন্তানের মা হয়ে ভুল করলাম না- তো!

হঠাৎ করে আমি আলোর দিশা পেয়েছি। ওদের ওহী ভাইয়া মাদ্রাসায় পড়ে। ওকে হাফেজী পড়ানোর ইচ্ছে ভাইয়ার। ও মাদ্রাসা থেকে এসে ভাই-বোনের সাথে জান্নাত-জাহান্নাম, ভালো কাজ, মন্দ কাজ নিয়ে আলোচনা করত। কী করলে আল্লাহ খুশি হয়! যেগুলো ওকে মাদ্রাসা শেখানো হয় আর কী!

হুট করে আমার বাচ্চাদের মাঝে অমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। ওরা জান্নাতে যাওয়ার জন্য বায়না করে। ছেলে বাবার সাথে, মেয়ে আমার সাথে নামাজ পড়ে। অকারণে আর নিজেদের মধ্যে ঝগড়া ঝাটি করে না। আজান দিলে টিভি বন্ধ করে দেয়। বাসায় যতগুলো সফটটয় ছিল সব ফেলে দিয়েছে।
‘ মা ওহী ভাইয়া বলছে এগুলো শয়তান আমরা আর কখনো এগুলো দিয়ে খেলব না ‘।

কখনো শিশুসুলভ আচরণে মারামারি করলে-
আমি যদি বলি
‘ মারামারি করবে না, এসব ভালো কাজ নয় ‘। সাথে সাথে দুজনে আল্লাহকে সরি বলি, নিজেদের মধ্যে ওয়াদা করে আর কখনো মারামারি করবে না।

ওর দাদু নাতি নাতনিদের ভীষণ ভালোবাসেন। সারাক্ষণই ওদেরকে ভালো মন্দের একটা বোধের চর্চা সবসময়ই করান। মেয়েকে কপালে টিপ দিতে চায় না
‘ মা জেঠু বলেছেন টিপ দিলে গুনাহ হবে ‘।

আমি সারাক্ষণ মোবাইল টিপি, ঘুমাই। ওরা নিজেরা টিভি দেখে, খেলে, আঁকিবুকি করে। একটা কফি ক্যান্ডিও দুজনে শেয়ার করে খায়। অথচ একটা সময় দুই প্যাকেট দুজনকে দিলেও মারামারি লাগত।

আমি যে বসে বসে ওদের এসব শিখিয়েছি তা কিন্তু নয়। সবকিছু পরিবার থেকে শিখেছে। আমি হাজার কোটি শুকরিয়া এমন পরিবারের সদস্য হতে পেরে।
সবাই দোয়া করবেন আমার সন্তানদের মাঝে যেনো এমন সুন্দরের চর্চা আজীবন থাকে।

সত্যি ইসলাম একটা পুর্নাঙ্গ জীবন ব্যবস্হা যেখানে কেবল শান্তি আর শান্তি।

আরও পড়ুন