অসাবধানতার ভুল

মাহমুদা আক্তার

সুমি এবং আমির দু’জনেই ডাক্তারের মুখের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। যেন নিজেদের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। কিভাবে সম্ভব? এমন হলো আর ওরা বাবা মা হয়ে একবারও বুঝতে পারলো না। এমন ভুল কিভাবে হয়ে গেলো তাদের! নিজেদেরকে নিজেরা বারবার দোষারোপ করতে লাগলো।

সুমির সাথে আমিরের প্রথম পরিচয় হয় লালমাটিয়া এক বন্ধুর বিয়েতে। সুমি পাত্রীর সাথে হোস্টেলে একই রুমে থাকতো। ঢাকার আমির আর টাংগাইলের সুমি। প্রথম দেখাতেই ভালোলাগা থেকে পরিচয় হওয়া, ঘন ঘন দেখা করা। তারপর একসময় দু’জনেই খুলে বললো দু’জনার মনের কথা। চার বছর ভালবাসার সম্পর্ক বিয়েতে রূপ নিলো দুই পরিবারের সম্মতিতে। বিয়ের পর খুব ভালো চলছিলো ওদের জীবন। দুই বছরের মাথায় তাদের ঘর আলো করে এলো এক রাজকন্যা। ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে জন্ম নেওয়াতে মেয়ের নাম রাখলো বন্ধন।

সরকারি ব্যাংকে চাকুরি করা আমিরের মেয়ের জন্মের পরপরই পোস্টিং হয়ে যায় সাভারে। মেয়ে আর সুমিকে সাথে নিয়ে ছোট একটা বাসায় উঠলো। সাজাতে লাগলো স্বপ্নের নতুন ঘর। বন্ধন কে নিয়ে ওদের জীবন বেশ হেসে খেলেই কাটছিলো। দেখতে দেখতে বন্ধন ছয় বছরে পা দিলো। বন্ধন ছোট থেকেই একটু চুপচাপ স্বভাবের। মায়াভরা মুখটাতে সবসময় হাসি লেগেই থাকে৷ যখন সে খেলে খুব মনোযোগ দিয়ে খেলে। কখনো এক দুই ডাকে সাড়া দেয় না। সুমি যখন রাগ করে জোরে ডাক দেয় তখনি সে সাড়া দেয়। সুমি মাঝে মাঝেই বলে মেয়েটার ধ্যান যে কোথায় থাকে! ডাকলে সহজে সাড়া দেয় না। আমির বলে, বাচ্চা মেয়ে নিজের মতো করে খেলতে দাও না। ওর কি এখানে এতো জ্ঞান বুদ্ধি হয়েছে!

ইদানীং সুমির মনে কেন জানি এক ভয় কাজ করে। দুইদিন ধরে সে খুব বেশী চিন্তিত। সেদিন সুমি, বন্ধনকে স্কুলে কি পড়িয়েছে জানতে চাইলে মেয়েটি কাছে এসে বলে,,”মা আরেকটু জোড়ে বলো, আমি ভালো করে শুনতে পাচ্ছি না।” সেই থেকে এক অজানা আশংকায় সুমির মন খারাপ হয়ে আছে। আমিরকে বললো একজন ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে মেয়ের কানের পরীক্ষা করাতে। কিন্তু ওরা যেখানে থাকে তার আশেপাশে ভালো কোন ডাক্তার বা উন্নতমানের কোন হাসপাতাল নেই। তাই আমির ভাবলো সামনের ছুটিতে ঢাকায় গিয়ে ডাক্তার দেখাবে মেয়েকে।

কিন্তু হঠাৎ করেই বন্ধনের সমস্ত শরীরে চিকেন পক্স উঠা শুরু করলো। সাথে প্রচন্ড জ্বর। জ্বরের মাত্রা এতোটাই বেড়ে গেলো যে বাধ্য হয়ে মেয়েকে বড় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলো। ডাক্তার বিভিন্ন ঔষধ এবং এন্টিবায়োটিক দিয়ে বাসায় চলে যেতে বললেন। কিন্তু সুমি বললো এতো দূর যখন এসেছি কানের ডাক্তার দেখিয়ে যাই। অনেকক্ষণ বসে থেকে সিরিয়াল পেলো ডাক্তারের। বিভিন্ন পরীক্ষা করার পর ডাক্তার যা বললেন তাতে মোটেও প্রস্তুত ছিলো না বন্ধনের বাবা মা। ডাক্তারের ভাষ্যমতে,, বন্ধনের জন্মগত ভাবে শ্রবণশক্তির সমস্যা। কিন্তু ছোট থেকে এর কোন চিকিৎসা করানো হয়নি বলে কানের শ্রবণশক্তি ৬০% নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখন থেকে ট্রিটমেন্ট না করালে বাকি ৪০%ও খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যাবে। তখন হয়ত বন্ধন চিরদিনের জন্য শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলবে।

কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো আমির এবং সুমি। তাদের সুখের সংসারে যেন আঁধার নেমে এলো। মেয়েকে কিছুটা সুস্থ করে রওনা দিলো ঢাকার উদ্দেশ্যে৷ দেখানো হলো নামকরা একজন কানের বিশেষজ্ঞকে। সেও বিভিন্ন পরীক্ষা করে একই কথা বললেন। শুরু হলো ট্রিটমেন্ট। ভালো ভাবে যেন শুনতে পারে সেজন্য মেশিন লাগানো হলো কানে। তাও পুরোপুরি ভালো হওয়ার গ্যারান্টি ডাক্তার দিতে পারলেন না। শুধু বললেন,বাকি থাকা ৪০% শ্রবণশক্তি ধরে রাখবে এই মেশিন। কিন্তু মেশিনটা বন্ধনের কানের তুলনায় একটু বড় তাই সে স্কুলে যেতে লজ্জা পায়। অন্য বাচ্চাদের সাথেও খেলতে যায় না। সবসময় বারান্দায় দাঁড়িয়ে চুপচাপ শুধু অন্যদের খেলা দেখে।

মেয়ের আজকের এই অবস্থার জন্য আমির আর সুমি নিজেদেরকে দোষ দিতে থাকে বারবার। বাবা মা হয়ে এতো বড় ভুল তারা কিভাবে করলো? কেন সেই ছোটবেলায় যখন সে ডাকে সাড়া দিতো না তখন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলো না? কিভাবে কাটবে মেয়েটার বাকিটা জীবন? বন্ধন কি কোনদিন অন্য দশটা মানুষের মতো শুনতে পারবে না? এমনি হাজারো প্রশ্ন আর একবুক কষ্ট নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে আমির আর সুমি দিন কাটাচ্ছে এখন।

বিঃদ্রঃ আমরা বাবা মায়েরা অনেক সময় বাচ্চাদের ছোটখাটো সমস্যা গুলো গ্রাহ্য করি না৷ কিন্তু এই ছোট ছোট সমস্যা গুলো একসময় বড় রূপ ধারণ করতে পারে। তাই প্রতিটি বাবা মায়ের উচিত ছোট থেকেই সন্তানের সকল দিকে লক্ষ্য রাখা। সেটা দৃষ্টিশক্তি হোক, হাঁটা হোক, কথা বলা হোক, শ্রবণশক্তি হোক কিংবা মানসিক সমস্যা হোক।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন