সন্তানরা যেভাবে আয়নায় আমাদের প্রতিচ্ছবি

আফরোজা হাসান

ব্যক্তিগত ভাবে আমরা নিজেরা যেমনই হই না কেন, সবাই চাই আমাদের সন্তানরা যেন খুব ভালো মানুষ হয়। কিন্তু আমরা বাবা-মায়েরা বুঝতে পারি বা না পারি সন্তানরা সারাক্ষণই আমাদেরকে অবলোকন করে এবং আমাদেরকে দেখে শিখতে থাকে। এবং আয়নার প্রতিচ্ছবির মতো হুবহু তা অভিনয় করে দেখায় মাঝেমাঝে। বাচ্চারা আমাদের প্রতিটা জিনিস লক্ষ্য করে। অর্থাৎ, আমাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ থেকে শুরু করে আমরা কিভাবে মানসিক চাপ মোকাবিলা করি, অন্যের বিপদে কিভাবে এগিয়ে যাই, সাফল্য-ব্যর্থতাকে কিভাবে গ্রহণ করি ইত্যাদি সবকিছু। নিজেরা ভালো মনের, সুন্দর চরিত্রের না হয়ে, আলোকিত সন্তান আশা করাটা আমার কাছে কেন জানি না অন্যায় মনে হয়। কারণ আমার সন্তানটিকে দেখছি কিভাবে সে আমার ভালো এবং মন্দ দুটাকেই ধারণ করছে ধীরে ধীরে।

আমার ছেলে নাকীবকে নিয়ে খেলনা কিনতে গিয়েছিলাম। দুজন মিলে খেলনা দেখছিলাম হঠাৎ নাকীব ছুটে গিয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বলল, আম্মু এদিকে তাকিয়ো না। আমি আড়াল করে দাঁড়িয়েছি তুমি ঐ পাশে চলে যাও। আমি বেশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, কি হয়েছে? তুমি এমন বলছো কেন? জবাব দিলো, এখানে পোকামাকড়ের খেলনা রাখা আছে। তুমি তো পোকা ভয় পাও তাই আমি ঢেকে রেখেছি।(ওর ভয়ের বা অপছন্দের জিনিস থেকে আমি ওকে সবসময় দূরে রাখতে চেষ্টা করি বলেই হয়তো আমার ছেলেটাও একই চেষ্টা করেছে মার জন্য।)

আমার এসেডিটির সমস্যা আছে। রান্নায় তেল-মশলা-ঝাল সামান্য বেশি হলেই আমার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। যেদিনই আমার এসেডিটির সমস্যা হয় । তখন নাকীব বলে, তুমি আবারো পচা খাবার খেয়েছো তাই না? তোমাকে না বলেছি যেসব খাবারে সমস্যা হয় সেসব খাবে না। কথা কেন শোন না তুমি বুঝি নাতো। এখন থেকে বেশি বেশি সবজি আর মাছ খাবে। গোশত বেশি খাবে না, কেমন।( হুবহু এই কথাগুলোই আমি ওকে বলি যখন ওর কোন সমস্যা হয় খাবারে অনিয়ম করার ফলে।)

আমার একটা অনেক খারাপ স্বভাব হচ্ছে, আমি ঘর থেকে না পারতে বের হইনা। জন্মের পর থেকে তো ঘরকুনো মাকে দেখেছে তাই ছেলেও ঘরকুনো স্বভাবের হয়েছে। কোন ভাবেই ওকে ঘর থেকে বের করা যায় না। কোথাও বেড়াতে গেলে কখন ঘরে ফিরবো সেই চিন্তায় আমি অস্থির হয়ে যাই। আমার ছেলেও আমার মতো ছটফট করতে থাকে ঘরে ফেরার জন্য। যতক্ষণ বাইরে থাকি আমরা মা-ছেলে দুজনই গোমড়া মুখে থাকি। অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি নাকীবকে কিন্তু কোন লাভ হয়নি। বলে, বাইরে যাবো না বোরিং লাগে।(আমার অসামাজিক আচরণ আমার ছেলেকে কতখানি প্রভাবিত করেছে, দেখে আমি নিজেই চিন্তিত।)

আমি সবসময় চেষ্টা করি আমার কথা বা কাজের দ্বারা কাউকে সামান্য পরিমাণ কষ্ট-আঘাত না দিতে। কেউ যদি আমাকে কষ্ট বা আঘাত করে, সেটা হতে পারে সামান্য একটা শব্দ দিয়ে আমি সেটা কিছুতেই ভুলতে পারি না। যতটা সম্ভব তার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলি বা এড়িয়ে চলি। আমার ছেলেটিকেও আজকাল এমন করতে দেখছি। চার মাস আগে ক্লাসের একজন ওকে ধাক্কা দিয়েছিলো এখনো সে কথা মনে রেখে তাকে এড়িয়ে চলে।

আমার মধ্যের খারাপ স্বভাব গুলো আমি ওকে শেখাইনি, বরং আপ্রাণ চেষ্টা করি এসব থেকে ওকে মুক্ত রাখতে । কিন্তু আমাকে অবলোকন করে ঠিকই সব ধারণ করে চলছে নিজের ভেতর। সবকিছু মিলিয়ে আমি বুঝলাম যে, আমার ভালো এবং খারাপ দুটোই বাচ্চা অবলোকন করছে এবং নিজের মধ্যে ধারণ করছে। আমি অসামাজিক হয়ে পারবো না বাচ্চাকে সামাজিক বানাতে। ঠিক তেমনি আমি যদি ভালো মানুষ না হই, তাহলে কি শুধু বুঝিয়ে বাচ্চাকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়তে পারবো….?

বাবা-মায়ের আচার-ব্যবহার, স্বভাব-প্রকৃতি থেকে প্রতিটা দোষ-গুণ বাচ্চারা শোষণ করে নেয়। তাই নিজেরা সু-অভ্যাস গুলো অনুশীলন করে, বাচ্চাদের সু-অভ্যাসের বীজ বপন করতে হবে। বাচ্চারা বাবা-মাকেই তাদের মডেল হিসেবে ধরে নেয় সবক্ষেত্রে। আর মডেলের কাজ হচ্ছে সামনে বাড়ার অনুপ্রেরণা জাগানো। জীবনের চলার পথে যেখানেই আটকে যাবে মডেলের জীবনের দিকে তাকিয়ে কিছুটা হলেও যেন খুঁজে নিতে পারে করনীয় এবং পায় বাঁধাকে অতিক্রম করার সাহস।

লেখকঃ সাহিত্যিক, শিক্ষক ও প্রবাসী বাংলাদেশী, মাদ্রিদ, স্পেন

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.