আপনার সন্তানের খবর রাখছেন তো?

এস এম মুকুল

গুলশানে স্পেনিশ রেস্টুরেন্টের ঘটনাকে সন্ত্রাসী বা জঙ্গী হামলা যাই বলা হোকনা কেন- বাংলাদেশের জন্য এটি প্রথম এবং বিব্রতকর একটি ঘটনা। এ ঘটনা সারাবিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশে জঙ্গী কিংবা আইএস আছে বা নাই এ নিয়ে হয়তোবা নতুন ধুম্রজাল সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ সরকার সদাশয় যথোচিত ভুমিকা নিয়ে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অবস্থানের একটি বার্তা বিশ্ববাসীকে আবারো দিতে পেরেছে সত্যি। কিন্তু আমরা দেশের জনগণ, সমাজ ও পরিবারের অধিকর্তা যারা- তাদের কাছে নতুন একটি বার্তা দিচ্ছে – ‘কীভাবে বড় হচ্ছে আপনার প্রিয় সন্তান? আপনি তার যথাযথ খবর রাখছেন তো?’ কেননা, গুলশান হামলা থেকে শুরু করে তার আগেও বিভিন্ন অতর্কিত হামালা ও খুনের ঘটনায় ধৃত সন্ত্রাসীদের  পারিবারিক ও শিক্ষা পরিচয় অভিভাবকদের মনে নতুন দুশ্চিন্তার উদ্রেক হয়েছে। খবর মাধ্যমে জানতে পেরেছি দেশে জঙ্গী তৎপরতার সাথে জড়িয়ে পড়ছে ধর্ম পরায়ন ভালো শিক্ষিত পরিবারের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সন্তানেরা। এদের অনেকেই দেশের এমনকি ক্ষোদ রাজধানী ঢাকার নামকরা স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা অথবা অধ্যয়নরত ছাত্র। ব্যাপারটি খুবই ভয়ানক হাতাশার কারণ বটে। দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ধারণা ছিল দেশে যারা জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত তারা মাদ্রাসা পড়া এবং দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় যে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় ঘাতকদের বেশির ভাগই এসেছে উচ্চ-মধ্যবিত্ত অথবা উচ্চবিত্ত পরিবারের। যাদের প্রায় সকলেই ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ালেখা করে দেশের একটি খানদানি  বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছে। পত্রিকার পাতায় প্রতিদিনের খবরে চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, হত্যা এসব অপকর্ম যারা করে তারা তো কোনো না কোনো পিতা-মাতারই সন্তান। অথচ দিনবদলের প্রতিযোগিতায় আমরা হারাচ্ছি আমাদের  হাজার বছরের পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।  হারাচ্ছি ধর্মীয় সম্প্রীতি আর মানবিক মূল্যবোধ। নামী-দামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্তানদেরও পড়াতে টাকার বস্তা নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছি। তারপরই আমাদের দায়িত্ব শেষ। আর খোঁজ খবর রাখছিনা- আমার সন্তান সেখানে কি শিখছে, কি পড়ছে, তাদের কারিকুলাম কি, শিক্ষার পরিবেশ কেমন, বন্ধু-বান্ধব কারা, তাদের পরিবারের অবস্থান কোন ধরণের ইত্যাদি ইত্যাদি।

আগেকার দিনে সন্তানদের বন্ধু-বান্ধবদের সুবাধে তাদের পরিবারের সাথেও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠত। এখন কে কার খবর রাখে। সবাই ছুটছে টাকার পিছনে- যেন টাকা হলেই সব হবে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। মনে রাখতে হবে টাকা দিয়ে অনেক কিছু সম্ভব হলেও সবকিছু সম্ভব নয়। যেমন চাইলেও টাকা দিয়ে আপনি সন্তান মানুষের মতো মানুষ করতে পারবেন না। অভিভাবকদের উপলব্ধির সময় এসেছে যে- ব্যাংকে কাড়ি কাড়ি টাকা জমানো, ফ্ল্যাট-বাড়ি বা গাড়ি নিয়ে সুখি হওয়ার প্রনান্তকর প্রচেষ্টা কখনো সুখ এনে দিতে পারবে না। কেননা সুখী হওয়ার জন্য প্রয়োজন আত্মতুষ্টি, সুস্থ্য জীবন ও ধর্মীয় চর্চা এবং চারপাশকে নিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করা। একজীবনে প্রিয় সন্তানকে যথাযথভাবে গড়ে না তুলে টাকার উপর ছেড়ে দিয়ে, নিজেও টাকা কামানোর জন্য বৈধ-অবৈধ পথে হন্যে হয়ে ছুটে একসময় দেখবেন আপনার বাড়ি, গাড়ি সবই ঠিক আছে শুধু ঠিক নেই প্রিয় সন্তান। আর সন্তান যখন অমানুষ বা বিপথগামী হবে তখন আপনি চাইলেও বাড়ি-গাড়ি কিংবা সকল অর্থ সম্পদের বিনিময়ে প্রিয় সন্তানকে সুসন্তান হিসেবে ফিরে পাবেন না। তার মানে সুসন্তানই দুনিয়া এবং আখেরাতের জন্য শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হওয়া উচিত। কিন্তু আফসোস- আমরা কি তা ভাবছি।

প্রিয় সন্তানরা কেন এত খারাপ পর্যায় চলে যাচ্ছে- এর কারণ কী? সন্তানদের সম্পর্কে কোনো চিন্তা নেই বলেই তাদের মাধ্যমেই আজ সংঘটিত হচ্ছে যত ধরনের ঘৃণ অপকর্ম।  সন্তান ভালো হবে না খারাপ হবে তা নির্ভর করে পিতা-মাতার উপর। পিতা-মাতা  আদর্শবান হলে, ধর্মীয় অনুশাসন  মেনে চললে এবং তারা সন্তানকে সুশিক্ষা দিলে তবেই সন্তান- সুসন্তান হিসেবে গড়ে উঠবে। মনে রাখতে হবে ধন-সম্পদ নয় সুসন্তানই শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় হামলা-কারী নিহত আবির রহমানের বাবা সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমি দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাই। আর কোনো বাবার যেন এমন পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়। সব বাবা-মার কাছে আহ্বান, সন্তানদের খোঁজ নিন। কোথায় যায়, কী করে খোঁজ নিন।  ছেলেটি বা মেয়েটি কোথায় যায়, কী করে, কাদের সঙ্গে মেলামেশা করে খবর রাখতে হবে। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতাই তাকে অপরাধে উসকে দিয়েছে। ভেবে দেখুন তো, আমাদের পরিবারের ঘরে বাইরে সমাজে কি ঘটছে, কেন ঘটছে? কারণ হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের ধারবাহিকতা। বিলুপ্ত হচ্ছে একান্নবর্তী পরিবারের শেকড়ের শক্তি। অগোচরে, অবহেলায়, অবলীয়ায় ক্রমাগত ভুলের মাসুল দিয়ে বেড়ে উঠছে আমাদের সন্তানেরা। অতি আদর অথবা অতি শাসন কিংবা অনাদরে পথহারা হচ্ছে সন্তানেরা। ব্যস্ত দম্পতির দীর্ঘশ্বাসেরর মতো কাজের লোকের অজ্ঞান, অস্নেহে বড় হচ্ছে প্রিয় সন্তান। কি শিখবে সে এই কাজের লোকের কাছে? কি শিখবে দামি খেলনা আর প্রযুক্তির রঙিন প্রলোভনে? আমরা খবর রাখিনা- রাত জেগে পড়ার নামে প্রিয় সন্তান মোবাইল ফোনে কার সাথে কথা বলে? অনলাইন চ্যাটিংয়ে মেতে উঠে কার সাথে? একই বাসায় থেকে ছেলে মেয়ে কেন দরজা আটকে রাখে? কেন আমরা ভাবছিনা এগুলো?এসব দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না? প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে সন্তানদেরকে বিরত রাখা নয়, সে যেন প্রযুক্তির ভালো বিষয়গুলো গ্রহণ করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের পরিবারগুলোতে আদি বন্ধনের ঐতিহ্য ধ্বংস হতে চলেছে। দাদা-দাদু, নানা-নানু, বাবা-মা, চাচা-চাচী, মামা-মামী, খালা-খালু, ফুফা-ফুফুর চিরায়ত পারিবারিক সম্পর্কগুলো ঘনিষ্টতা হারাচ্ছে। বাবা-মা সন্তানদের সাথে শেয়ার করেনা তাদের সংগ্রামী ব্যক্তি ও সংসার জীবনের গল্প। সন্তানের কাছে তাদের দাদা-নানাদের ঐতিহ্যের কাহিনী শোনানো হয়না। সন্তানকে বলা হয়না- সন্তানের কাছে পিতা-মাতা হিসেবে তারা কি চায়। তাদের সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক ঐহিত্য এবং সংস্কৃতির রীতিনীতির কথা অনেক বাবা-মায়ের সন্তানেরাই জানেনা। অর্থাৎ সন্তানের মাঝে আমরা  স্বপ্নের বীজ বুনে দিতে পারছি না। আমরা সন্তানদের শেখাতে পারছিনা যে- প্রত্যেকটি জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে একটি পারিবারিক সংস্কৃতির ধারা এবং কিছু মূল্যবোধ।  শেকড় গ্রামে হলেও গ্রামের সাথে সম্পর্ক নেই- তাই প্রকৃতি আলিঙ্গন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি আমরা। প্রকৃতির আলিঙ্গন হৃদয়ে মায়া জন্মাবে কেমন করে? প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক স্থাপন হচ্ছে শ্রেষ্ঠ শৈল্পিকতার আলিঙ্গন।

আমাদের পারিবারিক বিনোদনের জায়গাগুলো ছোট হয়ে আসছে। বাবা-মা, ভাই-বোন মিলে একসাথে টিভির অনুষ্ঠান দেখা হয়না। যাওয়া হয়না সিনেমা হলে। সেখানে নেই পরিবেশ। নেই ভালো সামাজিক ছবি। তারপরও কিন্তু কিছু কিছু ছবি ভালো হচ্ছে। কিন্তু সন্তানদের নিয়ে দেশীয় সংস্কৃতির এসব বিনোদন শেয়ার করা হচ্ছেনা। যাওয়া হয়না নাট্যমঞ্চে। পারিবারিক ভ্রমণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তো আছেই। আত্মীয়দের বাসায় দাওয়াত খেতে যাওয়া এবং তাদেরকে দাওয়াত খাওনোর রেওয়াজটাও আধুনিকতার নামে চাইনিজ রেস্টুরেন্টে আটকে গেছে। একারণে আত্মীয়তার সামাজিক বন্ধনগুলো কাছে টানছেনা সন্তানদের। অভিভাবকরা  সন্তানদের ভাষা বুঝতে পারছেন না। তারা অনেক সময় সন্তানের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করছেন না, আলাপ-আলোচনায় সহনশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন না। সন্তানেরাও অভিভাকদের প্রত্যাশার কথা আমলে নিতে চাচ্ছেনা। খোলা মাঠে শিশুদের সামাজিকীকরণ ঘটছে না। শিশুরা বাড়ি থেকে স্কুল, স্কুল থেকে কোচিং সেন্টারে যাচ্ছে। তারা কাদের সঙ্গে মিশছে, অভিভাবকরা জানতে পারছেন না। তাহলে কেমন হবে ভবিষ্যৎ?

লেখকঃ সমাজ বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.