বিলুপ্তির পথে দেশীয় শৈশব

মো: গোলাম হাসিব

“আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা

তোমরা এ যুগে এই বয়সে লেখাপড়া কর মেলা।

আমরা যখন আকাশের তলে ওড়ায়েছি শুধু ঘুড়ি

তোমরা এখন কলের জাহাজ চালাও গগন জুড়ি।”

(সুফিয়া কামাল)

বাংলাদেশের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ নজর না দেয়া ঐতিহ্য হল আমাদের গ্রাম পল্লীজুড়ে প্রচলিত নানারকম গ্রাম্য খেলাধুলা ও সময় কাটানোর বিভিন্ন ধরণ। কতই না মজাদার, স্মৃতিময় কেটেছে আমাদের শৈশবকাল। কাবাডি,গোল্লাছুট,লুকোচুরি,নৌকাবাইচ,বদন,

ঘুড়ি ওড়ানো ইত্যাদিসহ কত রকম খেলা নানা নামে পরিচিত বিভিন্ন গ্রামে,অঞ্চলে।এছাড়াও সময় কাটানোর মত কত্ত মজাদার মাধ্যম ছিল! দাদাদাদির কাছে রাতের বেলা বসে পরিবারের সকল সদস্যদের পরীদের গল্প শুনত সবাই। এছাড়া দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ঠাকুমারঝুলি, আলিফ লায়লাতো ছিলই। এসব বিনোদন শিশুদের দৈহিক,মানসিক বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করত। সবচেয়ে বড় কথা হল এসকল সুস্থ বিনোদন পরিবারের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে তুলত, প্রকৃতির সাথে মনের সম্পর্ক সৃষ্টি করত নিবিড়ভাবে। শুধু তাই নয় দেশের ঐতিহ্যকে ধরে রাখার পাশাপাশি শরীরকে সুস্থ ও কর্মক্ষম করে তুলতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখত।

তবে দুঃখের বিষয় হল এসব বিনোদনের স্থলে আজকের দিনে জায়গা করে নিয়েছে ভিডিও গেইম ও সামাজিক মাধ্যমগুলোতে অপরিমিত আসক্তি যা আমাদের তরুণ সমাজ ও শিশুদের দেহ-মনের ওপর হুমকি ফেলবে। সারা বিশ্বজুড়েই এসকল মাধ্যমের নানা ক্ষতিকারক দিক নিয়ে গবেষণা চলছে। এসব অসুস্থ প্রযুক্তি যেভাবে নষ্ট করছে সময় সমানতালে নষ্ট করছে আমাদের দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবন,পরিবার বন্ধুবান্ধবদের সাথে সম্পর্ক, শারিরীক, মানসিক কর্মশক্তি সহ ধ্বংস করছে আমাদের আবহমান ঐতিহ্য সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়কে। এছাড়া বিদেশি সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতে গিয়ে অনেকেই নিজের সন্তানদের শৈশবটাকেও অস্বস্তিকর বানিয়ে ফেলছেন। কতিপয় গেইম সম্পর্কে বিশ্বের নানা গবেষকরা মতামত দিচ্ছেন যা অতিমাত্রায় খেললে মস্তিষ্কে ক্ষতিকর হরমোন ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। কতিপয় ভিডিও গেইম, ভিনদেশি কার্টুন ছবিও আমাদের বাচ্চাদের নিজ ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের এরকমভাবে সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে আসার আরো একটি কারণ তাদের পরিবেশ ও পর্যাপ্ত উপকরণের অভাব। জনসংখ্যা বাড়ায় জায়গা-জমি কমে আসছে, যৌথ পরিবার বিভিন্ন কারণে ভেঙ্গে ছোট হয়ে গেছে। আবার, শৈশবে শিশুদের মাথায় এমন বিষয় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে অথচ সে বিষয় সম্পর্কে তার তখন কোন ধারণা জন্মায়নি। তাই এরকম অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের শিশুদের শৈশব জীবন থেকে মধুর দিনগুলোকে সরিয়ে দিচ্ছে।

তারপরও আশা থাকে। আমাদের সচেতন হতে হবে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের মধ্যে যদি না থাকে নিজ সংস্কৃতির ধারণা,বাংলার অসাধারণ বৈচিত্র্যময় বিনোদন, ইতিহাস তাহলে তারা ভবিষ্যতের বিশুদ্ধ দেশপ্রেমিক কিভাবে হবে? বরং এরকম বৈদেশিক সংস্কৃতিতে অভ্যস্থ হয়ে উঠলে হুমকির মুখে পড়বে আমাদের দেশ,চিন্তাধারা। শেষ হয়ে যাবে দেশপ্রেম ও দেশজ শৈশব জীবন।

তাই বিভিন্ন দিকে নজর দিতে গিয়ে আমরা যেন মৌলিক পরিচয় হারিয়ে না ফেলি সেদিকে লক্ষ রাখার সময় এখনই। তাদের শৈশব ধর্মীয় নৈতিক ও সুস্থ দেশীয় বিনোদনে অভ্যস্থ করে তুলুন। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে তাদের গল্প শোনানো উচিত। কিভাবে কাবাডি খেলে সেটা আমাদের বেশিরভাগ শিশু-কিশোর জানে না। অনেকেই জানে না কিভাবে গোল্লাছুট,লুকোচুরি খেলতে হয়। তাদের মাথায় ঢুকে থাকে ইংরেজি মুভি,গান ইত্যাদি। আমাদের কিশোররা রবীন্দ্রসংগীত, দেশাত্মবোধক গান শুনলে চিনতে পারে না, জানে না বাংলার জীবনধারণ প্রকৃতি যার ফলে তারা বহির্বিশ্বের সংস্কৃতি অনুসরণ করতে শিখছে। এসবের পিছনে দায়ী আমাদের সমাজব্যবস্থা, অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও কতিপয় আধুনিক নামধারী অভিভাবক সমাজ। তারা ছোট বাচ্চাদের রাজা রাণীর গল্প শোনান না। মরিয়া হয়ে ওঠেন তাদের রাতারাতি শেক্সপিয়র, আইনস্টাইন তৈরি করতে। এখনকার খুব কম শিশুরাই ফেলুদা,কাকাবাবু পড়ে। যদি আমাদের দেশের ঐতিহ্য নিজ পরিচয় এভাবে হারিয়ে যেতে থাকে তাহলে খুব শীঘ্রই আমাদের দেশীয় পরিচয় হারিয়ে যাবে বিদেশি সংস্কৃতির ভীড়ে। ঔপনিবেশিক শাসন শেষ হলেও নতুন করে শুরু হয়েছে বিদেশি অবসর,সংস্কৃতি,পুতুল খেলা বিনোদনগুলোর সামনে দেশীয় শৈশব,খেলাধুলাকে অবহেলিত করার নিষ্ঠুর চিত্রের অঙ্কন। যা একরকম পরাধীনতারই অন্য নাম। দেশকে এমন পরাধীনতা থেকে বাঁচাতে সচেতন হতে হবে আমাদের অভিভাবক,শিক্ষক ও সমাজ।তারা যদি নতুন প্রজন্মকে তার শৈশব চেনাতে পারেন তাহলেই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শৈশব হবে নিরাপদ ও সতেজ।

তাই পরিশেষে বলব, আমাদের শিশুদের পরিচয় করিয়ে দিন নিজ দেশের আসল জীবনধারার সাথে। দুর্বিষহ করে তুলবেন না তাদের নিষ্পাপ জীবন। তাহলে আবার হয়তো তাদের পুনরায় দেখা যাবে লুকোচুরির আনন্দে আবার দেখা যাবে রাতের বেলা দাদির পাশে গোল হয়ে বসে ডালিমকুমারের গল্প শোনার ভিড়ের ভেতর।

লেখক : কলামিস্ট এবং ছাত্র, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

আরও পড়ুন