নিকোটিন থেকে প্রজন্মকে বাঁচাতে হবে

এস এম মুকুল

ধূমপানকে বলা হয় মাদক সেবনের প্রবেশপথ। তামাক সেবনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম মাদকের দিকে ধাবিত হয়ে পরিবার ও রাষ্ট্রের জন্য  বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার প্রাথমিক স্কুলে পড়া ৯৫ শতাংশ শিশুর দেহে উচ্চমাত্রার নিকোটিন পাওয়া গেছে। নিকোটিন হলো এক ধরনের ঘাতক পদার্থ, যা সিগারেটের  ধোঁয়ার মধ্যে থাকে। কিন্তু অন্য কোনো ধোঁয়ার মধ্যে থাকে না। একবার ভাবুন  তো এই শিশুরা নিকোটিন কী জিনিস তা কি জানে? না জানা না বুঝার আগেই তাদের অজান্তে শরীরে জায়গা করে নিয়েছে নিকোটিন নামক এই বিষাক্ত পদার্থটি। খবরটি খুবই আশঙ্কার। পরোক্ষ ধূমপানকে এর  মূল কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়েছে। কারণ ধূমপায়ীরা  যে ধোঁয়া ছাড়ে, তা নিশ্বাসের সঙ্গে অন্যের শরীরে প্রবেশ করে। আর এটিকেই পরোক্ষ ধূমপান বলে। ধূমপান সাধারণত দু’ভাবে হয়- এক. জ্বলন্ত সিগারেটের ধোঁয়া; দুই. ধূমপায়ীর মুখের ভেতর থেকে নির্গত  ধোঁয়া। গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, বিশ্বের ৪০ শতাংশ শিশু পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। অবশ্য এর আগেও বহু গবেষণায় শিশু স্বস্থ্যে পরোক্ষ ধূমপানের প্রভাব প্রমাণিত হয়েছে।  তথ্য বলছে বাংলাদেশের শিশুদের বিরাট অংশ ধূমপানের বিষক্রিয়ার শিকার। ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা সিটি করপোরেশন ও আশপাশ এলাকার ৯৫ শতাংশ শিশুর শরীরে ক্ষতিকর নিকোটিন আছে। তখনও বলা হয়েছে পরোক্ষ ধূমপান নিকোটিন উপস্থিতির কারণ। গবেষণাটি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড  থেকে প্রকাশিত নিকোটিন অ্যান্ড টোব্যাকো রিসার্চ সাময়িকীতে ছাপা হয়েছে। ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার: ঢাকা, বাংলাদেশে একটি জরিপ’ ( সেকেন্ডহ্যান্ড  স্মোক এক্সপোজার ইন প্রাইমারি স্কুল চিলড্রেন: আ সার্ভে ইন ঢাকা, বাংলাদেশ) শিরোনামে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শিশুদের ওপর পরোক্ষ ধূমপানের প্রভাব কমানো জরুরি হয়ে পড়েছে। নিকোটিন অ্যান্ড  টোব্যাকো রিসার্চ সাময়িকীর প্রতিবেদনে ঢাকার ১২টি স্কুলের ৪৭৯ জন শিশুর লালার মধ্যে ৪৫৩ জনের লালায় এই ঘাতক ব্যাধি পাওয়া যায়। রিডার্স ডাইজেস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, একটি সিগারেটে সাত হাজারেরও  বেশি রাসায়নিক থাকে। কিন্তু নিকোটিনটাই ধূমপানের পর শরীর চাঙ্গা করে  তোলে। এর কারণেই মানুষের তামাকের প্রতি আসক্তি তৈরি হয়। একটি সিগারেটে থাকতে পারে এক মিলিগ্রাম নিকোটিন। সিগারেটের মান বা ফিল্টারের ধরন যেমন হোক না কেন এর পরিমাণ একই থাকে।  যেসব সিগারেট ‘লাইট’ বলা হয়,  সেগুলোতেও ০.৬  থেকে ১ মিলিগ্রাম নিকোটিন থাকে।

সিগারেটের নিকোটিন সাময়িক ভাবে মস্তিষ্ক উজ্জীবীত করলেও মস্তিষ্ক নিকোটিনের দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতি নানাবিধ। নিকোটিন রক্তের স্বাভাবিক প্রবাহকে কমিয়ে দেয়। নিকোটিন রক্তনালী সরু করে, হার্টের রক্তনালীতে চর্বি জমতে সাহায্য করে। ফলে অঙ্গ-প্রতঙ্গের রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। এতে শারীরিক ক্ষমতা হ্রাস পায়, পাশাপাশি নিকোটিন ফুসফুস ও হার্টের স্বাভাবিক ক্ষমতাকেও হ্রাস করে।

নিকোটিন মস্তিষ্কের রক্তনালীকে সরু করে মস্তিষ্কে রক্তচলাচল ব্যহত করে। ভয়ঙ্কর খবর- এই শিশু বাচ্চাগুলোও যদি নিকোটিনে আক্রান্ত হয়ে থাকে তবে এদের ভবিষ্যত কি? বলা হয়েছে, একই পরিবেশে পরোক্ষ ধূমপানে স্বাস্থ্যঝুঁকি বয়স্কদের তুলনায় শিশুদের  বেশি, কারণ বয়স্কদের  চেয়ে শিশুদের নিশ্বাস-প্রশ্বাসের হার  বেশি। আবার আশপাশে কেউ ধূমপান করলে তাতে বাধা  দেওয়ার ক্ষমতা শিশুদের কম। গবেষণা বলা হয়, বাসায় বাবা, বড় ভাই বা অন্য কেউ ধূমপান করার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। ঘরে মা, ও বড় বোনেরা যখন তামাক-জর্দা দিয়ে পান খান এর মাধ্যমেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। রাস্তায়, বাসে, দোকানে, হোটেলে অবাদে সিগারেট খাওয়ার ফলে  সেই ধোঁয়া শিশুর শরীরে প্রবেশ করে। আমরা মনেকরি, পারিবারিক ধূমপান বা তামাকজাত দ্রব্য সেবনের ফলেই এই শিশুদের শরীরের জীবননাসী নিকোটিন বাসা বেঁধেছে। কিন্তু আশ্চর্য লাগে, রাজধানী ঢাকার মতো জায়গায় শিশুদের শরীরে নিকোটিনের এই মাত্রার প্রভাব যদি চিহ্নিত হয়ে থাকে, তাহলে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের অবস্থা কি হতে পারে তা ভেবে গাঁ শিউরে উঠে। কারণ ঢাকায় শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের সংখ্যাধিক্য, অপরপক্ষে গ্রামাঞ্চলে অশিক্ষিত ও অসচেতন মানুষের আধিক্য বেশি।

আমরা সচরাচর দেখতে পাই গ্রামের মানুষেরা সন্তানদের সামনে, ঘরে বাইরে ধুমপান ও তামাক সেবন করে। এতে সহজেই ধারণা করা যায় ধূমপানের পরোক্ষ প্রভাবে গ্রামের শিশুদের শরীরে নিকোটিনের মাত্রা থাকাটাই স্বাভাবিকক। কিন্তু একটা ব্যাপার বুঝে উঠতে পারছি, শহরের মানুষগুলো এতটা অসচেতন হয় কি করে। এই খবরটি খুবই হতাশার যে- পিতা-মাতার অসচেতনতার কারণে নিকোটিনে আক্রান্ত হচ্ছে কোমলমতি শিশুগুলো। ভাবতেও কষ্ট লাগে এদের ফুসফুস শিশুকাল থেকেই ভয়ঙ্কর ক্ষতির মধ্য দিয়ে জীবন পাড়ি দিবে। আমরা মনে করি, প্রজন্মকে নিকোটিনের প্রভাব থেকে বাঁচাতে এখনই এর বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির ব্যাপক প্রচারণা চালানো উচিত। এজন্য স্কুল ক্যাম্পেইন, রেডিও, টিভি, পত্রিকা, অনলাইনসহ সকল সামাজিক মাধ্যমে সচেনতামূলক প্রচারণা ,শুরু করতে হবে।

গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭ অনুযায়ী বাংলাদেশে এখন ৩  কোটি ৭৮ লাখ (৩৫.৩%) প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করে। কর্মক্ষেত্রে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয় ৮১ লাখ মানুষ। এমনকি বাড়িতেই পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে ৪ কোটি ৮ লাখ মানুষ এবং এক্ষেত্রে নারীরা আক্রান্ত হচ্ছে অনেক বেশি। পরিসংখ্যানে বিশ্বের তামাক ব্যবহারকারী দশটি  দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এখনো অন্যতম। তামাক ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপও দিন দিন বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে এষড়নধষ অফঁষঃ ঞড়নধপপড় ঝঁৎাবু ২০১৭  হিসাব মতে, ৩৫.৩ শতাংশ অর্থাৎ ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক (১৫ বছর এবং তদূর্ধ্ব) মানুষ তামাক  সেবন করে। নারীদের মধ্যে এই হার ২৫.২ শতাংশ এবং পুরুষদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ।  দেশে  ধোঁয়াবিহীন তামাক বা গুল, জর্দা, সাদাপাতা ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে নারী ২৪.৮ শতাংশ এবং পুরুষ ১৬.২ শতাংশ। বাংলাদেশে ধূমপান ও  ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবনের ফলে ফুসফুস ক্যান্সার, মুখগহ্বরের ক্যান্সার, হৃদরোগ,  স্ট্রোক, ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগ (সিওপিডি), ডায়াবেটিস, যক্ষা (পলমনারিটিউবারকুলোসিস), হাঁপানি, বার্জাজ ডিজিজ ইত্যাদি রোগে ১২ লক্ষাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়। ৩ লাখ ৮২ হাজার মানুষ অকাল পঙ্গুত্বের শিকার হয়। প্রতি বছর ১ লাখ ৬১ হাজারের অধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করে।

সারা পৃথিবীতে মৃত্যুর পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় কারণের মধ্যে দু’টিই ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্র সংক্রান্ত জটিলতা। আর তামাক ব্যবহার ও পরোক্ষ ধূমপান ফুসফুসের বিভিন্ন  রোগের প্রধানতম কারণ। তামাক চাষ জন¯ স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। তামাক চাষে মাটির উর্বরতা কমে যায়। ফলে নতুন নতুন জমিতে তামাক চাষ করতে হয়। WHO এর ২০১৪ সালে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বে সবচেয়ে কম দামে সিগারেট পাওয়া যায় এমন তিনটি দেশের মধ্যে একটি হচ্ছে বাংলাদেশ। তাই ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্র সংক্রান্ত অসুস্থতা প্রতিরোধে তামাকপণ্যের দাম বাড়ানোর বিকল্প নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তামাক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য  ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশ এফসিটিসি প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে ও প্রথম  স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে সুনাম অর্জন করেছে। ২০০৫ সালে এ  দেশে মহান জাতীয় সংসদে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পাস হয়। এবং বর্তমান সরকারের সময়ে ২০১৩ সালে সেই আইনকে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়। প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার  ঘোষণা দিয়েছেন। বর্তমানে কোনো ধরনের তামাক শিল্পকেই সরকারি সহযোগিতার সুযোগ  নেই। সরকারের সদিচ্ছার পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং গণমাধ্যমের সম্মিলিত প্রয়াসে তামাকের ব্যবহার কমে আসছে। এই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সাল নাগাদ অসংক্রামক  রোগ নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব¯^াস্থ্য সংস্থার ৯টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে তামাকের ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব।

আমরা জানি, বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞান প্রমাণিত উল্লেখযোগ্য ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থটি হচ্ছে তামাক ও সিগারেট। বিজ্ঞান মতে, একটি সিগারেটের তামাকে রয়েছে প্রায় ৭ হাজার ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ এবং গ্যাস। যার মধ্যে ৭০টি পদার্থ ক্যান্সার বৃদ্ধির কারণ। বিশ্ব¯স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সিগারেট বা তামাক  থেকে ২৫টি রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই অল্প বয়সের শিশুদের জীবনের শুরুতেই এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন। তার আগে প্রয়োজন অভিভাবকদের সচেতন করে তোলা। কারণ তাদের অসচেতনতার কারণে পরোক্ষভাবে নিকোটিন নিচ্ছে আপন সন্তানেরা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.