হেরটা মুলারঃ দ্বিতীয় পর্ব-চশেস্কু সমসাময়িক

জুম্মি নাহদিয়া

হেরটা মুলার রোমানিয়ায় যতদিন বসবাস করলেন একরকমের দুর্বোধ্য মানসিক অবস্থার ভেতর দিয়েই তাকে যেতে হয়েছে। সে অভিজ্ঞতা থেকে পালাতে গিয়ে কি লিখতে যাচ্ছেন নিশ্চিত না হয়েই আস্ত একটা গল্পগ্রন্থ লিখে ফেললেন।

একটি শিশু কেমন দৃষ্টিতে রোমানিয়ার সঙ্কট দেখে, দেখে বানাতের সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব, নিচিডর্ফের সীমাহীন দারিদ্র কিংবা একনায়কতন্ত্র কিভাবে ভীতির বিস্তার ছড়ায় এ সম্পর্কিত অনুভূতির প্রকাশই হল নিদারুঙ্গেন।

মুলারের Niederungen,1982 (English title: Nadirs) সহ অন্য বইগুলোতেও মোটামুটি বিষয়বস্তুর কেন্দ্রে আছেন কমরেড সাহেব আর তার একপেশে শাসনব্যবস্থা;যা মানুষের স্বাভাবিকভাবে জীবন ধারণকে কল্পনার বিষয় বানিয়ে ছাড়ে। ফোলানো ফাঁপানো বুলি, আশা ভরসার আড়ালে লুকানো স্বার্থপরতা জীবনটাকে কিভাবে নরক বানিয়ে ফেলে পেছনে তাকালেই তিনি স্পষ্ট দেখতে পান আবারো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জীবন- সম্পদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। কমিউনিস্ট ব্লকে রোমানিয়ার জায়গা হবার পর যেন শুরু হল আরেক লড়াই। স্তালিন আমলে প্রচুর প্রাণহানি তো ঘটেই গেল আর তারপর চশেস্কুর পুলিশী রাষ্ট্রে জীবনীশক্তির সীমাহীন ক্ষয় শুরু হল।

১৯৬৭ সালে কমরেড নিকোলাই চশেস্কু কমিউনিস্ট রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ক্ষমতারোহণ করলেন। কমরেডের শুরুটা মনে হচ্ছিল মোটামুটি বৈপ্লবিক। দেশের শিল্পায়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নেয়া হচ্ছিল নানামুখী পদক্ষেপ। যুদ্ধোত্তর রোমানিয়ার জন্মহার কমে গেলে চশেস্কু গর্ভনিরোধক দ্রব্য এবং গর্ভপাত নিষিদ্ধকরণ আইন প্রণয়ন করেন। কোন অজুহাতেই গর্ভধারণ থেকে বিরত থাকা যাবেনা এই মর্মে প্রজ্ঞাপন জারী হল। ডিক্রি ৭৭০ অনুসারে অন্ততপক্ষে চারজন সন্তান একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ না করার আগ পর্যন্ত জন্মনিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোপুরি নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ ছিল সেক্স এডুকেশন। রোমানিয়ান নারীদের সন্তান জন্মদান ছিল রাষ্ট্রীয় আদেশ এবং জাতীয়তাবাদের প্রতি আনুগত্যের প্রতিক। ঘোষণা এলো দশ সন্তানের মা কে দেয়া হবে “হেরোইন মা” খেতাব, সেই সাথে বিশেষ সম্মাননা, বাড়তি রোমানিয়ান মুদ্রা। আইন বাস্তবায়িত হলে দেশের জনশক্তি এক বছরের ভেতর দ্বিগুণ হয়ে যায়।

৬৮ তে এসে চশেস্কু চেকোস্লোভাকিয়ায় সোভিয়েত আক্রমণের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নেন এবং রোমানিয়ার সীমানায় সোভিয়েত হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি জারী করেন। স্নায়ু যুদ্ধেও তিনি তার কট্টর মতবাদকে সাথে নিয়ে সোভিয়েত সমাজতন্ত্র থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলেন। নিজ দেশের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সকল পথ খারিজ করে দিয়ে পুরোদমে একনায়ক বনে যেতে লাগলেন তিনি। গণগ্রেফতার, সমালোচনার কঠোর দমন, বিদ্রোহী হত্যা তার স্বৈরাচারী শাসনে পূর্ণতা এনে দিয়েছিল আরও। তিনি দিন দিন নিজেকে একজন আপোষহীন কম্যুনিস্ট ডিক্টেটর হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে যাচ্ছিলেন।

এশিয়ান সমাজতান্ত্রিক ধারণায় নেতাকে ঈশ্বর মানা হত। যেমন উত্তর কোরিয়ায় কিম ইল সুং, চীনে আবার ছিলেন মাও সেতুং, তো দেশগুলোতে বিশেষ সফর করে চশেস্কুর এই এশিয়ান স্টাইল মনঃপুত হওয়ায় দ্রুতই নিজেকে রোমানিয়ানদের ঈশ্বরের আসনে নিজেকে বসিয়ে ফেললেন। উত্তর কোরিয়া বা চীন তো বটেই মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি পাশ্চাত্যেও তখন চশেস্কুর জয়জয়কার। সোভিয়েতের সাথে ঝামেলা পাকানো এবং দলত্যাগী চশেস্কুকে পুঁজিবাদ- সাম্রাজ্যবাদ তার নিজে স্বার্থে খাতির করবেনা তা তো হতে পারেনা।

চশেস্কুকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের প্রসার বাড়তে লাগলো। প্যারেড, অর্কেস্ট্রা, কোরিওগ্রাফি সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে চশেস্কু এবং সমাজতন্ত্রের গুণকীর্তন অনিবার্য বিষয় হয়ে দাঁড়ালো।

তবে চশেস্কু তার পরিকল্পনা মোতাবেক দেশের জনসংখ্যা বাড়াতে পারলেন ঠিকই কিন্তু তার বিপরীতে উদ্ভূত সমস্যা মোকাবেলার কোন প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হতে লাগলেন দ্রুতগতিতে। যেহেতু চার সন্তান জন্মানোর আগে সন্তান জন্মদানে মায়ের শারীরিক সক্ষমতা বিচার্য ছিলনা সে কারণে বিশ শতাংশ শিশুই মৃত জন্মাতো। ভয়াবহ ব্যপার হল গর্ভ ধারণে অনিচ্ছুক নারীরা নিজেদের হাতে গর্ভপাতের চেষ্টা করত। মাতৃমৃত্যুর হার বেড়ে গিয়ে ইউরোপের ভেতর সর্বোচ্চ হয়ে দাঁড়ালো।

চশেস্কুর স্ত্রী কমরেড এলিনা চশেস্কু রোমানিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তিনি প্রেসিডেন্টের একান্ত সহচর, বিশ্বস্ত পরামর্শদাত্রী, রাজনৈতিক উপদেষ্টাও বটে। কমরেড এলিনার পরামর্শ তিনি সবচেয়ে বেশী আমলে নিতেন এবং দুজন মিলে গড়ে তুলেছিলেন পরিবারতন্ত্রও। তারা পতি- পত্নী মিলে রোমানিয়ানদের একাধারে ঈশ্বর- ঈশ্বরী, মনিব, পিতামাতা, রক্ষক- নিয়ন্ত্রক সব হয়ে উঠছিলেন, এবং নিজেদের এ মর্যাদায় চিরকাল দেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছিলেন দিনকে দিন।

এরই মধ্যে শিল্পায়ন প্রকল্প অনুযায়ী দেশের গ্রামাঞ্চলের ঘরবাড়ি একরকমের ধ্বসিয়ে ফেলে সেখানে কংক্রিটের দালান তোলা হল আর এদিকে শহুরে পাড়া- মহল্লা ভূমিসাৎ করে স্থাপন করা হল অসংখ্য বহুতল ভবন, এবং সবগুলো ভবন দেখতে সম্পূর্ণ এক। তবে সেখানে গ্যাস- পানি সহ বাদবাকি বসবাসের অনুষঙ্গ মোটেও ঠিক ঠাক ছিলনা।

খাবারের মেন্যু থেকে শুরু করে বসত বাড়ির কক্ষসংখ্যা সবকিছুই ছিল রাষ্ট্রীয় কড়া নিয়ন্ত্রণে। ব্যক্তিগত পছন্দ- অপছন্দের কোন রকমের অবকাশ ছিলনা। অবাধ্য হয়ে যে মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাঁচবে সে পথও সুগম ছিলনা সবার ক্ষেত্রে।

ঐতিহ্যের চর্চা, ব্যক্তি উদ্যোগে নেয়া সাহিত্য সংস্কৃতির উদ্যোগে হস্তক্ষেপ শুরু হল। কলখারখানায় কাজ করা ছিল বাধ্যতামূলক। যার ফলে রোমানিয়ার যাযাবর সংস্কৃতি ভেঙে যেতে লাগলো।

মোটামুটি এরই মধ্যে দেখা গেল চশেস্কুর স্বপ্নের শ্রমিক বাহিনী মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছে। বেআইনি গর্ভপাত আশংকাজনক হারে বেড়ে গিয়েছে। শিশু প্রতিপালন আস্তে আস্তে অসম্ভব বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। অধিক শিশু জন্মানোর বিপরীতে নামে মাত্র যে কয়টা রোমানিয়ান লেউ (রোমানিয়ান মুদ্রা) হাতে আসতো সেগুলো প্রহসনেরই নামান্তর। চশেস্কু এরপর কৌমার্য ট্যাক্স চাপানো শুরু করলেন।

একটা পর্যায়ে এসে অনাথ এবং পরিত্যক্ত শিশুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে লাগলো। তবে সরকারিভাবে অনাথালয়ে শিশুকে দত্তক দেয়ার ব্যপারে অপারগ পিতা মাতাকে উৎসাহই দেয়া হত। প্রোপাগান্ডা চালানো হত ইন্সটিটিউট নামের সে আশ্রমে ভাল খাবার, লেখাপড়া, যত্ন সুনিশ্চিত। এ সমস্ত শিশুদের নিয়ে চশেস্কু বিশেষ ফোর্স গঠন করলেন যার নেতৃত্বে থাকবে তুলনামূলক মেধাবী শিশুরা। এবং নিজেকে তিনি ঘোষণা করলেন রাষ্ট্রের সহ সকল পিতৃ মাতৃহীন শিশুদের পিতা হিসেবে, স্ত্রী এলিনা তাদের মাতা।

হেরটা মুলার তার Der Mensch ist ein großer Fasan auf der Welt, 1986 (The Passport) নামের ছোট গল্প গ্রন্থে প্রাইমারী স্কুল গুলোতেও যে দলীয় স্তবকগুলো শেখানো- পড়ানো হত সে প্রসঙ্গে জানান,

Amalie points at the map. This is our “fatherland”, she says. With her fingertip she searches for the black dots on the map. “These are the towns of our fatherland”, says amalie. “The towns are the rooms of this big house, our country. Our fathers and mothers live in our houses. They are our parents. Every child has its parents. Just as the father in the house in

which we live is our father, so Comrade Nicolae Ceausescu is the father of our country. And just as the mother in the house in which we live is our mother, so Comrade Elena Caesescu is the mother of our country. All the children love comrade Nicolae and Comrade Elena, because they are their parents.”

অথচ বাস্তবতা ছিল কল্পনাতীত ভয়াবহ। কোন একটি মৌলিক চাহিদার সঠিক বাস্তবায়নও প্রচারণার ধারে কাছে ছিলনা। পর্যাপ্ত পুষ্টি- যত্ন- আদর এগুলো বহু দূরে, ইঞ্জেকশন পুশ করে করে ক্ষুধার্ত শিশুদের ঘুম পাড়িয়ে রাখা ছিল অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। যে কোন সাধারণ অসুখ বিসুখে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ছিল চরমভাবে অনিয়ন্ত্রিত।

ভয়াবহ ব্যপার হচ্ছে সে সময় মনোবিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান কিংবা ধর্মশিক্ষাও নিষিদ্ধ ছিল। শিশুদের শারীরিক- মানসিক বিকাশের পথ গোঁড়া থেকেই ছিল ভীষণভাবে রুদ্ধ। তাছাড়াও চশেস্কুর শিল্পজাত রোমানিয়ার হিসাব খাতায় শারীরিক- মানসিক বিকলাঙ্গদের কোন জায়গা ছিলনা। এ সমস্ত শিশুদের জন্মের সাথে সাথেই মাকে অবহিত করে বা তার অজ্ঞাতেও অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে প্রত্যন্ত এলাকায় পাঠিয়ে দেয়া হত। সেখানকার গুমোট কুঠুরিতে বেড়ে উঠত অথবা সেই গোপনেই নিঃশেষ হয়ে যেত অবহেলিত শৈশব।

পরিবারের ভেতর বড় হতে থাকা কিছুটা প্রিভিলেজড শিশুও দারিদ্র- অশিক্ষা আর নিম্নমানের জীবন যাত্রার কোন্দলে পড়ে প্রাপ্ত বয়সে এসে পায়ের নীচের ভিত্তি মজবুত করতে পারেনি। ওদিকে ইন্সিটিউটে অনাদরের শিশুদের হতাশার জীবন কিছুতেই যেন আলোর মুখ দেখতে পারছিল না। এসব অপ্রাপ্তি, অবহেলা তাদেরকে অপরাধ জগতের সাথে একসময় পরিচয় করিয়ে দিতে বাধ্য হল।

তো যাই হোক, দুই কমরেড এবারে সিদ্ধান্ত নিলেন চোখ ধাঁধানো- তাক লাগানো এক প্রাসাদ বানাবেন নিজেদের বসবাসের জন্য। নির্মাণ সামগ্রী হিসেবে সেখানে দামী মার্বেল পাথরের পাশাপাশি পরিশোধিত সোনাও থাকবে।

অন্যদিকে পুরো দেশ তখন ডুবে ছিল বিদেশী দেনায়। চশেস্কুর সত্তরের দশকের শিল্পায়ন প্রকল্প মাঠে মারা যাওয়ায় রোমানিয়ার কাঁধে ছিল ১০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল অঙ্কের ঋণ। চশেস্কু এই ঋণ পরিশোধের দায় জনগণের ওপরেই চাপিয়ে দিলেন। সময়সীমা বেঁধে দিলেন আগামী দশ বছর। দেশের জনগণ দিন রাত পরিশ্রম করে দায় চুকাতে থাকে। রেশনিংএ তো ঝামেলা ছিলই আগ থেকে এদিকে জনগণের জন্য বরাদ্দ সামান্য আমিষটুকুও বিদেশে রপ্তানি করে ফেলা হচ্ছিল। অনাহারে অর্ধাহারে দেশের মানুষ দিন কাটাতে লাগলো। শিশুদের অবস্থা ছিল বর্ণনাতীত। গরুর দুধও রপ্তানি করে ফেলা হচ্ছিল বাড়তি অর্থের আশায়। ইন্সটিটিউট নামের গারদে শিশুরা দিনকে দিন ফ্যাকাশে হয়ে পড়তে লাগলো খাদ্যাভাবে। খাদ্যের বিকল্প ছিল সস্তার ওষুধ। ওষুধে ওষুধে তাদের জর্জরিত করে ফেলা হচ্ছিল।

সেখানকার রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত অপুষ্ট শিশুদের জিইয়ে রাখতে যখন রক্তের প্রয়োজন হত, রক্ত সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা হত না। যার কারণে এইডস সহ নানান মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে করুন পরিণতি বরণ করতে হয়েছে হতভাগ্যদের।

প্রবল শীতের সময় তাপ বিদ্যুতের তীব্র সংকটে নিমজ্জিত হল গোটা দেশ। সেই বিদেশী দেনা শোধের নিমিত্তে দেশের মানুষ অনাহার তো বটেই এবার লোডশেডিং আর শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। ওদিকে প্রাসাদের কাজ থেমে ছিলনা, থেমে ছিলনা চশেস্কুর সপরিবারে বিলাসী জীবন

যাপন। দেশের মানুষকে চরম দুর্ভোগে রেখে ভোগ বিলাসের সকল উপকরণের ভেতর তারা অবস্থান করেছেন সে ভয়াবহ দুঃসময়ে। নিজেদের আভিজাত্য- শ্রেষ্ঠত্বও অক্ষুন্ন রেখেছেন।

এরপর একদিন ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে তিমিসোয়ারার রাজপথে নেমে এসেছিল লক্ষাধিক বিক্ষুব্ধ মানুষের দল। আন্দোলনটা চশেস্কু পতনের। আন্দোলনকারীর অধিকাংশই বয়সে তরুণ। হতে পারে এরাই সেই চশেস্কুর সন্তান। যাদের পিতা নিকোলাই, মাতা এলিনা। যাদের অনেকেরই বসবাস ছিল হয়ত ইন্সটিটিউট নামের স্যাঁতস্যাঁতে খোঁয়াড়ে।

আন্দোলন চলাকালীন অবস্থায় পরদিন ১৭ই ডিসেম্বর পিতার নির্দেশে সামরিক বাহিনী তার সন্তানদের ওপরেও নির্বিচারে গুলি চালায়। নিহত হয় সহস্র মানুষ। আন্দোলন থামানোর কঠোর নির্দেশ দিয়ে চশেস্কু একাই ইরানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

ইরান থেকে ফিরেও এলেন ২১ তারিখ। তারপর তার বুখারেস্টস্থ প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রোমানিয়ার সমৃদ্ধি আর অর্জন বিষয়ক বক্তব্য প্রদানের কিছুক্ষণ পরই টের পেলেন গণহত্যার প্রতিশোধে উন্মত্ত জনতা এগিয়ে আসছে।

সেনাবাহিনীও তখন চশেস্কুর পক্ষ নিলনা, তারা বরং জনগণকে আক্রমণে প্রশ্রয় দিল। বাধ্য হয়ে চশেস্কু সস্ত্রীক বুখারেস্টের কাছাকাছিই এক পুলিশ ষ্টেশনে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে হেলিকপ্টারে পালিয়ে যান। তবে শেষ রক্ষা হয়নি।

২৫ শে ডিসেম্বর তাকে আর তার পরম বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহচর কমরেড এলেনাকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে গণহত্যার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ফায়ারিং স্কোয়াডে সে দণ্ড কার্যকর হয়ে যায়।

হলুদেটে জীর্ণ দেয়াল ঘেঁষে পড়ে ছিল ঝাঁঝরা দুটো শরীর। দাগ কাটা সিমেন্টের ওপর। যাদের অন্তীম ইচ্ছা ছিল একসাথে মৃত্যুবরণ। বিষণ্ণ শীত এবং উৎসবের বড় দিনে পড়ে ছিল মানুষের জীবন নিয়ে দুই জুয়াড়ির মৃতদেহ।

বাম ঘেঁষা রাশিয়ান ফিল্ম ডিরেক্টর পুদোফকিন অথবা আইজেস্টাইন ঠিক মনে পড়ছেনা দু জনের কেউ একজন একবার এভাবে বলেছিলেন যে, আমি মানুষের হৃদয়ের চেয়ে বেশী বামে যেতে রাজী নই। এই মানুষের হৃদয়ের সীমানা ভুলে যাওয়া মহা অন্যায়- মহা ভুল তো বটেই। এমন কট্টর বামপন্থার কাছে সমাধানের অর্থটাই ছিল জবরদস্তি, চাপিয়ে দেয়া কিংবা একেবারে শেষ করে দেয়া।

সে ভুলে, সে অন্যায়ে পতন ঘটল ইউরোপের সর্বশেষ সমাজতান্ত্রিক একনায়কের। তিমিসোয়ারা আন্দোলন মোড় নিল রোমানিয়ান বিপ্লবের অন্য দিগন্তে। তবে চশেস্কুর কাতরাতে থাকা অসুস্থ- অপুষ্ট সন্তানদের দুর্ভোগ আর শেষ হলনা। আশ্রমের অন্ধকার ফুরোলো না এত সহজে।

(চলবে)

পূর্বের পর্বের লিঙ্ক- কবিতায় একাগ্র ও গদ্যে অকপট নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হেরটা মুলার

আগামী পর্বঃ গোপন পুলিশ সিক্যুরিটাটে

লেখকঃ সাহিত্যিক ও জার্মান প্রবাসী বাংলাদেশী

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.