শিক্ষার্থীদের রক্ষার দায় শিক্ষককে নিতে হবে

আক্তার বানু আলপনা

আমাদের দেশের স্বাধীনতা অর্জনে ছাত্ররাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস যেমন আছে, ঠিক তেমনি এর বিপরীতে আছে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভয়াবহ ও করুণ নির্যাতনের অজস্র কাহিনী এবং অসংখ্য ছাত্র হত্যার দীর্ঘ তালিকা। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় হতে আবরার পর্যন্ত – ছাত্র রাজনীতির মোড়কে রাজনৈতিক দলের নির্লজ্জ লেজুড়বৃত্তির কারণে কত ছাত্রের মায়েদের কোল যে খালি হয়েছে, তার পরিপূর্ণ খতিয়ান দেখলে শিউরে উঠতে হয় !

তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে শিক্ষার্থী নির্যাতন নতুন কোন বিষয় নয়। বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে তাদের নিজ নিজ ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা হলগুলোতে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার উপায় হিসেবে এই নির্যাতনকে হাতিয়ার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করে এসেছে। ক্ষমতায় যাবার জন্যও আন্দোলনে ছাত্রদেরকে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে শিক্ষার্থী নির্যাতনের জন্য আওয়ামী লীগের ছাত্রনেতাদের দায়ী করা হলেও বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দলই আসলে “ধোয়া তুলসীপাতা” নয়। সামান্য কম আর বেশী, এই যা।

বর্তমান সরকারের আমলে সব সেক্টরে দূর্নীতি, লুটপাট, অপরাধ, রেপ, পুলিশী নির্যাতন ইত্যাদি যেমন লাগামহীনভাবে বেড়েছে, তেমনি ছাত্রনেতাদের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, রেপ, জবরদখল, সন্ত্রাস, র‍্যাগিং ইত্যাদিও বেড়েছে আশংকাজনকভাবে। (কেউ স্বীকার করুন আর না করুন, কেউ ভয়ে বা গোঁয়ার্তুমি করে মুখ ফুটে বলুন আর না বলুন) এর কারণ হলো ভোটকেন্দ্রগুলোতে কুকুর ঝিমানো। শক্তিশালী বিরোধী মত না থাকলে বা ভোটের মাধ্যমে জনগণের সরকার পরিবর্তনের সুযোগ না থাকলে জনগণের কাছে সরকারের কোন জবাবদিহিতা থাকেনা। আর জবাবদিহিতা না থাকলে মানুষ বেপরোয়া হয়ে যা খুশী তাই করে। আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পর্যন্ত দ্বিধা করেনা।

বাংলাদেশে সব ক্ষমতাসীন দল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় ভিসি নিয়োগ দেয়, যাতে দলীয় শিক্ষক ও ছাত্ররা নানা সুবিধা পায় এবং বিরোধী দল-মতের ছাত্ররা সরকারের কাজের সমালোচনা করতে বা সরকারের বিরুদ্ধে কোন আন্দোলন করতে না পারে। এভাবে একই উদ্দেশ্যে ভিসিরা নিজ নিজ দলের লোকদেরকে প্রশাসক ও প্রভোস্ট হিসেবে নিয়োগ দেন।

দলীয় প্রভোস্ট তাঁদের দলীয় ছেলেমেয়েদেরকেই হলগুলোতে নানা সুবিধা দেন। (যাঁরা দেননা, তাঁরা পদে থাকতে পারেন না।) এই সুবিধা পেয়ে তারা দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা বছরের পর বছর হলে থাকে, ইচ্ছামত রুম দখল করে রাখে, হলে এবং আশপাশের দোকানে ফাও খায়, স্থানীয় দোকানদারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে, বহিরাগত রাখে, রাজনীতির নামে শিক্ষার্থীদের উপর নানা নির্যাতন চালায় (সামান্য একটা সালাম না দেওয়ার অপরাধেও ধরে নিয়ে গিয়ে ছাত্রদেরকে নির্মমভাবে মারে। শিক্ষার্থীরা রাতে কী পড়ে ঘুমাবে, সেই নির্দেশনাও দেয় ছাত্রনেতারা। চাকরের মত হুকুম চালায়, তাদের কথা শুনতে বাধ্য করে, বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করতে দেয়না। রুমে রুমে গিয়ে ছাত্রদের কাছ থেকে চাঁদা নেয়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময় ছাত্রনেতারা ভিসিসহ বিভিন্ন পদে থাকা দলীয় শিক্ষকদের কাছে চাঁদাবাজি করে, টেন্ডারবাজিসহ গায়ের জোরে নানা সুবিধা নেয়।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হলগুলোতে আবাসন সংকট তীব্র। শিক্ষার্থীদের তুলনায় সিটসংখ্যা খুবই অপ্রতুল। তার উপর আমাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা গরীব। হলে থাকতে পারলে মেসভাড়া লাগেনা। রান্না করে অল্প টাকায় খাওয়া যায়। এজন্য অসহায় গরীব শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়েই হলে উঠতে চায়। আর তাদের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ছাত্রনেতারা এদের উপর নানাভাবে নিপীড়ন চালায়। মিছিলে যাবার শর্তে তারা গরীব ছাত্রদেরকে হলে সিট দিয়ে দলে ভেঁড়ায়। র‍্যাগিং- এর নামে নির্যাতন করে এবং ভয় দেখিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে তারা বশে রাখে। প্রভোস্ট রুম বরাদ্দ দিলেও ছাত্র নেতারা রুম ছাড়েনা বা বরাদ্দ পাওয়া শিক্ষার্থীদেরকে হলে উঠতে দেয়না। উঠলেও ভয়-ভীতি দেখিয়ে বা নির্যাতন করে রুম থেকে নামিয়ে দেয়। তখন প্রভোস্টদের পরিবর্তে হলগুলোতে সিট বরাদ্দ দেয় ছাত্রনেতারা।

কারো দয়া নিলে তার প্রতিদানে আপনাকেও কিছু দিতে হয়। দিতে দিতে যখন আপনি তাদের লোভ ধরিয়ে দেবেন, তখন কখনও কখনও অনেক বেশী দিতে হয়। তখন আর আপনি ‘না’ বলতে পারবেন না। আপনার গলায় সে জোর থাকবে না। তখন আপনি নিজের ক্ষতি করে হলেও আপনার সুবিধাদাতাকে খুশী রাখতে চাইবেন। প্রশাসনের অবস্থাও তাই হয়। ছাত্রনেতাদের সাপোর্ট নিয়েই প্রভোস্ট (এবং সরকার ও ভিসি) মহোদয়েরা যেহেতু বিরোধী দলের ছাত্রদেরকে কোণঠাসা করে রেখে নির্বিঘ্নে হল চালান, সেজন্য ছাত্রনেতাদের দ্বারা শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের কথা জেনেও তাঁরা তেমন কিছুই করতে পারেন না বা করেন না। কারণ তারা তাঁদেরই দলের ছেলে, তাঁদেরকে রক্ষা করতেই ছাত্রনেতারাকাজ করে। এভাবেই ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি দিনে দিনে ছাত্রদের ও শিক্ষকদের স্বার্থ রক্ষা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর পরিবর্তে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বা সরকারের গদি রক্ষার জন্য দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে জড়িয়ে পড়েছে।

কিন্তু ছাত্রনেতারা চরম কোন অপরাধ করে ফেললে তখন প্রশাসন বা রাজনৈতিক দলগুলো আর সে অপকর্মের দায় নিতে চায়না। তখন সেটা হয়ে যায় “ব্যক্তিগত অপরাধ। জনমত দাবাতে দেয়া হয় “সর্বোচ্চ শাস্তির নিশ্চয়তা”।

যেসব শিক্ষকরা প্রশাসনিক কোন পদে থাকেননা, নানা সুবিধার লোভে নিয়মিত ভিসির পা চাটেননা, ভিসির অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে কথা বলেন বা ক্ষমতাসীন দল করেন না, তাঁরা আমাদের শিক্ষার্থীদেরকে ছাত্রনেতা নামধারী সন্ত্রাসীদের দ্বারা নির্যাতিত হওয়া থেকে রক্ষা করতে কোন ভূমিকা রাখতে পারেন না। অধিকাংশ সময় নির্যাতনের খবর জানতেও পারেননা। কখনও কখনও জানলেও সরকার এবং ভিসিসহ ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র-শিক্ষকদের দাপটে বিশেষ কিছু করতে পারেননা। কোটা সংস্কার আন্দোলনে আমাদের শিক্ষার্থীরা নির্মমভাবে নির্যাতিত হলেও আমরা শিক্ষকরা তাদের জন্য বিশেষ কিছুই করতে পারিনি। নিরাপদ সড়কের দাবীতে আন্দোলনেও একই ফল হয়েছে।

যেদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদেরও বাকস্বাধীনতা নেই, সেদেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলাও অপরাধ। এরকম অবস্থায় শিক্ষার্থীদেরকে নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে প্রশাসনের বাইরে গিয়ে সচেতন ছাত্র ও শিক্ষকদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, আমি ইউএন ওমেন, BNWLA এবং ইউজিসির যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন নির্যাতন বিরোধী একটি প্রোগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন নিরোধ ও অভিযোগ কমিটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যৌন নির্যাতনের বিচার করে থাকে। ঐ কমিটিকে সহায়তা করার জন্য আমরা কয়েকজন শিক্ষক স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদেরকে নানা সহায়তা দিতে একটি শ্যাডো কমিটির সদস্য হিসেবে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। যেমন – কোন্ কোন্ আচরণগুলো যৌন নির্যাতনের আওতায় পড়ে, কেউ নির্যাতিত হলে অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া কী, সাক্ষ্য-প্রমাণের বিষয়টি কেমন, যৌন নির্যাতনের কারণ ও প্রতিরোধ করার জন্য করণীয় কী – এসব বিষয়ে আলোচনা, সেমিনার, সচেতনতামূলক নাটক দেখানো, দিবস পালন ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে সচেতন করে তোলা। কখনও কখনও প্রশাসন অপরাধীদেরকে নানাভাবে বাঁচানোর চেষ্টা করে বা বাঁচিয়ে দেয়। ফলে নির্যাতিতরা ভয়ে অভিযোগ দায়ের করতে চায়না। এজন্য ন্যায়বিচার করতে প্রশাসনকে চাপ দেওয়াসহ নির্যাতিতদেরকে মানসিক সাপোর্ট দেওয়া জরুরী, যা শ্যাডো কমিটি করেছে।

বর্তমানে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে ছাত্রনেতাদের নির্যাতন থেকে রক্ষা করার জন্য প্রশাসনের বাইরের শিক্ষকদেরকে ও শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে ওরকম একটি শক্তিশালী শ্যাডো কমিটি করা দরকার। প্রতিটি হলে ঐ শ্যাডো কমিটির শিক্ষার্থী সদস্য থাকবে, যাদের কাজ হবে শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং যেকোন ধরণের নির্যাতনের খবর কমিটির শিক্ষকদেরকে তৎক্ষণাৎ জানানো, যাতে তাঁরা নির্যাতনের প্রতিকার করতে পারেন।

কোন সরকারই (সরকারের চামচা হিসেবে ভিসিরাও) নিজেদের স্বার্থে ছাত্রদেরকে ব্যবহার করবে বলে ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ করবে না। (এরশাদ নিষিদ্ধ করেছিল। কারণ হলগুলোতে তার নিজের কোন দলীয় ছাত্র সংগঠন ছিলনা এবং ঐ সময় ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে সে তার বিরুদ্ধে চলমান ছাত্র আন্দোলন দমাতে চেয়েছিল)। তাই এ দায় এখন মূলতঃ শিক্ষকদেরকেই নিতে হবে। শিক্ষকরা এ দায় নিতে এবারও ব্যর্থ হলে আবরাররা এভাবেই নির্যাতিত হতে এবং মরতেই থাকবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক রাজনীতির নোংরা চেহারা আমরা প্রতিনিয়তই দেখছি৷ ভিসিসহ দলীয় শিক্ষকদের দূর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, ঘুষ নিয়ে যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদেরকে শিক্ষকসহ নানা চাকরীতে নিয়োগ, নৈতিক স্খলন, অন্যায়ের প্রতিবাদকারী শিক্ষকদেরকে নানাভাবে নির্যাতন করা ইত্যাদি নানা অরাজকতা চলছে। বাকস্বাধীনতা ও জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনতে না পারলে এদেশের সরকারগুলোও একের পর এক দেশবিরোধী নানা কার্যক্রম ও চুক্তি করতেই থাকবে।

লেখকঃ কলামিস্ট ও অধ্যাপক, আই ই আর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.