হেরটা মুলারঃ চতুর্থ পর্ব-দ্বৈতসত্ত্বা কিংবা ভঙ্গুর সময় সংক্রান্ত গদ্যের নির্মাণ

জুম্মি নাহদিয়া

মুলার তার অনুবাদকের চাকরীর শুরু থেকেই ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের কাছ থেকে মেশিনপত্রের দুর্বোধ্য শব্দগুলোর অর্থ জেনে নিতেন। এই কুক্ষণেও তিনি তার কাজের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে শ্রমিকদের কাছ থেকে সহায়তা নেবার জন্য গেলে তারা তাকে সোল্লাশে গুপ্তচর গুপ্তচর অপবাদে চেঁচিয়ে ওঠে। এমনটাই ছিল কর্তাব্যক্তিদের পক্ষ থেকে নির্দেশনা।

একটা পর্যায়ে এসে মুলারকে বরখাস্ত করা হল। রেফারেন্স হিসেবে ছিল একজন লেফটেন্যান্টের ঘটনার সত্যায়িত নিশ্চিত করণ বিষয়ে ছোট্ট একটা হাতে লেখা নোট। হেরটা মুলার স্তম্ভিত হবার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেললেন যেন তখন।

পরবর্তী পর্যায়ে তাকে মুখোমুখি হতে হয় জিজ্ঞাসাবাদ নামের নাজেহাল এবং বেশুমার গালাগালির। তাকে বলা হল তিনি পশ্চিম জার্মানির গোয়েন্দা বিভাগের লোক। কারণ হিসেবে দেখানো হল গ্যোটে ইন্সটিটিউটের লাইব্রেরিয়ানের সাথে সখ্যতা এবং জার্মান দূতাবাসের এক অনুবাদকের সাথে পরিচয়।

তাকে অপবাদ দেয়া হল কালোবাজারির, সেই সাথে বেশ্যাবৃত্তির সাথে জড়িয়ে ক্রমাগত কটূক্তিতে তাকে ধরাশায়ীর চেষ্টা চালানো হল কোত্থেকে খতেন এনে জানানো হল তিনি পোশাক- প্রসাধনের আশায় গোটা কয়েক আরব ছাত্রের সঙ্গে বিছানায় গিয়েছেন মুলার প্রতিবাদ করে উঠলে তাকে পাল্টা হুমকী দিয়ে সাদা পোশাকধারী পুলিশেরা জানায় যে তাদের জন্য সাক্ষী সাবুদ যোগাড় করে মামলা মোকাদ্দমা কোন ব্যপার না

হেরটা মুলারের জবানে সিক্যুরিটাটের সদস্যদের তার প্রতি কৃত আচরণ ছিল এমন,

“বারবার সে আমার পরচয়পত্র মেঝেতে ছুড়ে ফেলে আর আমি নীচু হয়ে আবার কুড়িয়ে নিই এভাবে ত্রিশ বা চল্লিশবার ঘটার পর আমি যখন একটু ক্লান্ত হয়ে গেছি, অমনি সে লাথি ছুড়ে দেয় টেবিলের পেছনের বন্ধ দরজার ভেতর থেকে এক মহিলার আর্তনাদ শুনি আমি এরপর আমাকে আটটার বেশি সেদ্ধ ডিম খেতে বাধ্য করা হয় তারপর সেই হাড়গিলে আমার পরিচয়পত্র রাস্তার ছুঁড়ে ফেলে পেছনে লাথি কষে মুখ থুবড়ে পড়ে যাই মাথা না তুলেই বমি করা শুরু করি তারপর তাড়াহুড়ো না করে পরিচয়পত্রটি রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হই

(প্রবন্ধ: রোমানিয়ার দিনগুলো; অনুবাদ: এস. এ. মামুন)

 

এছাড়াও প্যারিস রিভিউতে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মুলার আমেরিকান নাট্যকার ফিলিপ বোমকে জানান,

পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের সময় আমাকে বলেছিল, ‘ভুলে যেও না তুমি রোমানিয়ান রুটি খাও’ আমি বলেছি ‘আমাদের পূর্ব পুরুষের সবকিছুই ছিল আমার দাদার সব কেড়ে নেওয়া হয়েছে তা না হলে আমাদের রোমানিয়ান রুটি খেতে হতো না’ আমার এরকম প্রতিউত্তর তাদের সবসময়ই রাগান্বিত করেছে তারা এও বলেছে, যদি আমি রোমানিয়ান জনগণকে পছন্দ না করি, তাহলে পশ্চিমে আমার ফ্যাসিস্ট বন্ধুদের সঙ্গে যেন চলে যাই

(সাক্ষাৎকারটির বাংলা অনুবাদে আছেন, অজিত দাশ)

মুলার আরও জানান সিক্যুরিটাটের সদস্যদের পেশাদারিত্বের কথা, কিংবা তাদের শিকারের মনস্তত্ত্ব নিয়ে লেখাপড়ার কথাও তার লেখায় উঠে আসে। আসে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট কারণের অনুপস্থিতি কিংবা কোন টার্গেটকৃত ব্যক্তির সাথে যোগসাজশও কঠোর নির্যাতনের আওতাধীন থাকাটা। সরকার কর্তৃক বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত সে লোকগুলো বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রশ্নবাণে এবং নিপীড়নে জর্জরিত করার ব্যাপারে ছিল ভীষণ রকমের দক্ষ। তারা মানুষকে হতাশায় ঠেলে দিতে সক্ষম ছিল। সক্ষম ছিল বিনা নোটিশে বাসাবাড়িতে ঢুকে সন্ত্রস্ত করে ফেলতেও।

মুলারের আবাসস্থলেও তারা মাইক্রোফোন লাগিয়ে দিয়েছিল গোপনে এবং তাকে কড়া নজরদারীর ভেতরে রেখে দিয়েছিল।

ঘটনা জানতে পেরে মুষড়ে পড়েন তিনি। অঙ্ক মেলাতে চেষ্টা করেন। তার ধারণাতেই ছিল না যে রোমানিয়ার জনগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে খাবারই ঠিকঠাক কিনতে পারে না, তারাই আবার গোয়েন্দাগিরীর জন্য এত যন্ত্রপাতি কেনার জন্য অর্থ পায় কিভাবে?

সরকারী গুপ্তচরদের নিয়মিত ধরপাকড় হেরটা মুলারকে তার বাক্সবন্দী- বৃত্তবন্দী শৈশব স্মৃতির সাথে যুক্ত হয়ে আরও এবং আরও বিপর্যস্ত করে তুললো। সে বড় ভঙ্গুর সময়!

আর সেই ভঙ্গুর সময়ের মানুষেরা এক সত্ত্বায় প্রকাশিত হতে পারছিল না। তাদের মতন করে মুলারও অনেকাংশেই, না। নিজের দুটো কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে তারও বেশী সংস্করণ বয়ে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা খুব ভারী, অনবরত পাথর ভাঙ্গার মতন ক্লান্তিকর।

তিনি নাদিরস তো আগেই লিখে ফেলে হই চই বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর পুরোদমে আরও লিখতে লাগলেন জীবনকে আঁকড়ে ধরে রাখার প্রচেষ্টায়। কোথাও একটা অজ্ঞাতনামা আশ্রয় খুঁজে নেবার আকুল বাসনায় অবিরাম লেখালেখিতে নিবিষ্ট হতে লাগলেন তিনি। সাহিত্য রচনার কোন অভিলাষ তার এই প্রচেষ্টা কিংবা নিবিষ্টতায় ছিল না।

Niederungen; 1982 (Nadirs; ইংরেজী অনুবাদ যিগলিন্ডে লুগ)

বলা বাহুল্য হেরটা মুলারের বসবাস ছিল পশ্চাদপদ এক সমাজের ভেতর। যে সমাজে না পাওয়া, দারিদ্র এবং ক্ষুধা ছিল নিত্যকার বিষয়। তাবৎ বেঁচে থাকা ছিল উদ্দেশ্যবর্জিত, শুধুই বাঁচার জন্য বাঁচা। শিশুদের সামনে এমন কোন পৃথিবীর উপস্থাপন সেখানে ছিল না, যেখানে প্রস্ফুটিত হতে পারবে অসম্ভব সুন্দর কোন আগামীদিন, কোন স্বপ্ন, নতুন কোন সম্ভাবনা নির্মাণের সামান্যতম ইঙ্গিত।

বরং মুলারের শৈশব জুড়ে ছিল নিদারুণ অভাবের ভেতর আনাগোনা করা এক একটা তিক্ত সম্পর্ক, নাদিরসে তিনি যে সম্পর্কগুলোর কথা অকপট বলেন। তেমন কোন গুরুতর বিষয় নয়, এই যেমন একটা বেড়াল কেমন করে ঘুমায় অথবা অর্গানবাদক কিভাবে মনের সুখে বাজিয়ে চলে এই ধরণের সামান্য সামান্য প্রশ্নের কারণেও শিশুরা প্রহৃত হত।

ম্যাডোনা কেন পুরোহিত বর্ণিত মাছি এবং জঘন্যসব প্রানীদের রক্তে তৈরি লিপস্টিক ঠোঁটে মাখেন প্রশ্ন করে সেই পুরোহিতের বেত্রাঘাতেরই শিকার হন হেরটা নিজে, জরুরী কথার বাইরে কথা না বলতে বলতে জীবন পার করতে থাকা অপ্রতিভ মানুষগুলোর বিষণ্ণতার প্রকাশ ঘটে যেত তুলনামূলক কম ক্ষমতাধরেদের ওপর। বড়রা জড়িয়ে পড়ছিল নানারকমের প্রতারণামূলক অনৈতিক সম্পর্কে। হেরটা মুলার দেখে যেতেন সবকিছু। শুধু টের পেতেন তিনি আপাদমস্তক পূর্ণ হয়ে যাচ্ছেন খণ্ড খণ্ড অসংখ্য গল্পে, অথচ সে গল্পগুলো ঝাঁক বেঁধে তিমিসোয়ারার আকাশ ছাড়িয়ে চলে যেতে চাইতো বারবার, তিনি তার অপারগতাতেই ভীষণভাবে সেগুলোর লাগাম টেনে রাখতেই বরং অভ্যস্ত হয়ে পড়ছিলেন।

নিদারুঙ্গেন অথবা নাদিরস এমন কিছু আখ্যানের সমন্বয় যেটা আসলে ঠিক শিশুর চোখে স্বৈরতন্ত্রের কবলে থাকা গ্রাম কিংবা শহরের মানুষের ভাবনাকে প্রকাশ করে না বরং যা কিছু ঘটছিল চারদিকে তার অন্তর্নিহিত অর্থগুলোকে খুঁজে দেখবার জন্য প্রচেষ্টা বলা যেতে পারে। বলা যেতে পারে মিউকাসে বস্তাপচা সময়ের গন্ধ কিংবা তার উৎস খুঁজে নেয়ার এক রকমের অভিজ্ঞতা।

মুলার প্রাপ্তবয়স্কদের যুক্তির জগতের সাথে শিশুতোষ যুক্তির এক মিশেল ঘটিয়ে দিয়েছেন তার এই হোঁচট গ্রন্থে, যেখানে সচরাসচর ঘটে যাওয়া যৌক্তিক বিচারে উত্তীর্ণ ঘটনাগুলোর আবার বিচিত্র সব ছেঁড়া ছেঁড়া ব্যাখ্যা দানের প্রয়াস দেখা যায়। সে ব্যাখ্যায় পাঠক কিছুটা হোঁচট খেয়ে কিংবা খেই হারিয়ে ফেললেও আবার প্রত্যাবর্তন করতে পারে মূল বিন্দুতে। মুলার হয়ত শব্দগুচ্ছ নিয়ে এভাবেই খেলতে পছন্দ করেন,

“Squealing salamanders in a nest that resembles a handful of frazzled corn fibers. Glued-shut eyes ooze from every naked mouse. Thin little legs like wet thread. Crooked Toes.

Dust trickles down from wooden planks.

You get chalky fingers from it, and it settles on the skin of your face so that you get the feeling of being dried out.”

এই বইয়ের প্রথম গল্প “দ্য ফিউনারেল সেরমন”। সেখানে আমরা পাই গ্রামীণ সমাজের চিরায়ত এক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার চিত্র। অস্ত্র কাঁধে ছেলেদের দল কিংবা নারীদের হাতে জপমালার খড়খড় শব্দের মত সহজ বিষয়ের সাথে মিশে ছিল যেখানে ক্ষুধা, কাম-ক্রোধ আর নিপীড়ন।

টেলিভিশনের পর্দায় একটা ট্রেন যাচ্ছিল যুদ্ধের দিকে। চট করে সেখান থেকে দেয়াল জোড়া ছবি সমেত ঘরে ঢুকে পড়া। পিতার কফিন মাঝে রেখে ছবিগুলোতে কর্মনিষ্ঠ অতীত খুঁজে ফেরা এর সবকিছুই মুলার খুব ছোট ছোট কয়েকটা বাক্য গেঁথে চটজলদিই চোখের সামনে এনে ফুলতোলা চাদরের মতন বিছিয়ে দিতে বিশেষভাবে পারদর্শী। পিতার সমাধিতে খরার মৌসুমে গর্ত উপচানো পানি বিষয়ে মেদো মাতাল শবযাত্রীর যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা, যা থেকে উঠে আসে মৃতের ভয়াল অতীত। যুদ্ধের নিয়মমাফিক খুনের বাইরেও কদাকার ধর্ষণের বৃত্তান্ত, যে নির্মমতায় হুট করে জড়িয়ে পড়ে নিরীহ সবজী ওলকপি।

পিতার পাপের সপক্ষে আরও আরও দলিল আসতে লাগলে একসময় গল্পের মেয়েটি নিজেকেই অশরীরী দেখতে পেল গ্রামবাসী কর্তৃক তার খুন হবার পর। এমনিতেই হেরটা মুলারের রচনাভঙ্গী ততটা গতানুগতিক নয়। তার বাক্যগঠন রীতি কিছুটা অস্ফুট থেকে যায়, নোবেল কমিটি যে রীতিকে আখ্যা দিয়েছে সাবলীল কিংবা অকপট হিসেবে।

তার গদ্যশৈলীতে বাক্যগুলো দশ শব্দেরও কম সংখ্যক শব্দে গঠিত হয় সাধারণত, সর্বোচ্চ চৌদ্দে।

অল্প কথার কয়েকটি বাক্যে লেখা গল্পটিতে উঠে এসেছে রোমানিয়ান- জার্মান দ্বন্দ্ব, স্তালিনীয় গুলাগের চালচিত্রের এক ঝলক। ঠিক একটা চাকার মত চক্রাকারে ঘুরে গল্পের মূল মানুষেরা আবার ছবিঘরের ভেতরেই চলে এলো। চোখের সামনে সে ঘরের দুলে ওঠার সাথে সাথে শনিবার সকালের অ্যালার্মঘড়িটা বেজে ওঠার মাধ্যমে হয়ত একটা স্বপ্নদৃশ্যের দিকেই লেখিকা ইঙ্গিত দিতে চাইলেন।

“দ্য সোয়াবিয়ান বাথ” নাদিরসের আরেক অনবদ্য গল্প যেখানে সত্তরের দশকের দারিদ্রক্লিষ্ট রোমানিয়ার চিত্রায়ন দেখা যায়। এক গ্রামীণ সোয়াবিয়ান তথা এথনিক জার্মান একান্নবর্তী পরিবারের সাপ্তাহিক গোসল সংক্রান্ত গল্প এটি। পুরো পরিবার একই পাত্রে, একই পানি দিয়ে গোসল সেরে নিতে বাধ্য ছিল। দ্য সোয়াবিয়ান বাথের একটা লাইন ছিল এমন,

“The little gray rolls of Mother, of Father, of Grandma, and of Grandpa are whirling down the drain.”

২০১৮ বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সড়ক আন্দোলনের সময় একটি শ্লেষাত্মক শ্লোগান বেশ খ্যাতি পেয়েছিল। সেটা ছিল, “যদি তুমি চুপ থাকো ,থাকবে তুমি বেশ! যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তোমার চৌদ্দ গোষ্ঠী শেষ”। আরও পেছনে তাকালে আমরা জ্ঞান হবার আগ থেকেই শুনে আসছি “বোবার কোন শত্রু নেই”। মোদ্দাকথা বাঁচতে চাইলে জবানটা বন্ধ রাখতেই হবে। রোমানিয়ানদের বহুল ব্যবহৃত একটা প্রবাদ সেই একই ধারার। “চুপচাপ থাকো”। দরকার হলে দুর্নীতিতে জড়াও, দেখেও না দেখার ভাণ করো, রাজনীতি বিমুখ হবার প্রাণান্ত অভিনয় করো, নিজেকে বিপদমুক্ত রাখার জন্য দরকার হলে পাশবিকতার চূড়ান্ত পথ ধরো কিন্তু কথা একটাই “চুপচাপ থাকো”।

সমসাময়িক পোল্যান্ড, রাশিয়া কিংবা যুগোস্লাভিয়ার মানুষেরা তাদের ভাষাকে প্রতিবাদের কাজে লাগিয়েছিল সাহসিকতার সাথে, ভাষাকে তারা দাবী আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে ধীরে ধীরে সক্ষম হচ্ছিল যখন, রোমানিয়ার প্রাচীনপন্থী মানুষেরা তখন তাদের চমৎকার ভাষাটিকে বরং মাটিচাপাই দিয়ে যাচ্ছিল বারবার।

রোমানিয়ানরা এতটাই “চুপচাপ থাকতে” অভ্যস্ত যে তারা চরম বিপর্যয়কেও বিপর্যয় বলতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। তারা যদি হিটলার কিংবা আইওন আন্তোনেস্কুর মত ফ্যাসিবাদী সরকারকে নির্বিচারে- সজ্ঞানে আঞ্জামও দিয়ে যায় তাহলে সেটাকে দায়িত্বপালন আখ্যা দিয়ে দায় এড়াতে চায়। স্তালিনীয় যজ্ঞের ব্যপারেও তাই। সমাজতান্ত্রীক একনায়কতন্ত্রের সাথে নিরবে সমঝোতা করে নেয়াটাও তাদের অন্যায়ের সাথে আপোষকামী চরিত্রেরই ধারাবাহিকতা বলে মুলার মনে করেন।

মুলারের এই আক্ষেপ, এই অভিমান পুরো নাদিরসে বেশ একটা তির্যক ছায়া ফেলে দেবার কারণে জন্ম নেয় নানান কূট তর্ক। My Family; Nadirs; Rotten Pears; Oppressive Tango; The Window; The Man with the Matchbox; Village Chronicle; About German Mustaches and Hair Parts; The Intervillage Bus; Mother, Father, and the Little One; The Street Sweepers; Black Park; Workday শিরোনামে যে আখ্যানগুলো রয়েছে সেখানে বিমর্ষ বিমর্ষ কালিতে লেখা রয়েছে নিতান্ত অপারগ- অসহায় হয়ে পরিস্থিতির ভেতর পড়ে যাবার বাইরেও মানুষের অসহ্য নিরবতাকে সাথে নিয়ে নানাধর্মী সমস্ত শোষণের সাথে সহাবস্থান। তাছাড়া নাদিরস তো আত্মজীবনীও, নিঃসন্দেহ স্মৃতিকথা। বিতর্ক এড়ানো তাই সম্ভব হলনা আর।

নাদিরস প্রকাশিত হবার পর হেরটা মুলারকে বেশ তিক্ত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল। রাষ্ট্র তো নির্যাতন করেছিলই, তার নিজ গ্রামবাসীরাও বিষয়টাকে প্রসন্নচিত্তে গ্রহণ করেনি। মুলারের পরিবারকে হতে হয়েছিল অপমানিত- অপদস্থ। অপ্রিয় কতগুলো সত্য, রোমানিয়ান- সোয়াবিয়ান টানাপড়েন এই এক গ্রন্থেই এত প্রকটভাবে উঠে আসায় সবগুলো গোষ্ঠীই আসলে মুলারের প্রতি বিরাগভাজন হয়ে পড়েছিল। পাঁচ ছ জনের বাইরে আর কারো সাথে তখন তার তেমন একটা যোগাযোগ ছিলনা।

হেরটা মুলার সে সময়ে মারাত্মক একা হয়ে পড়েছিলেন।

(চলবে)

আগামী পর্বঃদ্য পাসপোর্ট এবং একটি বিমর্ষ গ্রাম

লেখকঃ সাহিত্যিক ও জার্মান প্রবাসী বাংলাদেশী

 

 

 

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.