উচ্চশিক্ষায় আফ্রিকান নারী

শেখ সাফওয়ানা জেরিন

ইস্তাম্বুলের ডর্মে একটা জিবুতির মেয়ের সাথে পরিচয় এবং বেশ ভালো খাতির হয়েছিলো। মেয়েটার নাম রাহমা। দেখতে অনেকটা ইন্ডিয়ানদের মতো কাটিং, গায়ের রং শ্যামলা। ঐ বাসায় যে কয়টা ছাত্রী আছে সবাইই আফ্রিকার কোন না কোন দেশ থেকে এসেছে। তুরস্কের সরকারী স্কলারশিপ পাওয়াটা এখন বেশ কঠিন। আফ্রিকানদের জন্য অবশ্য আরও কঠিন। একবছর তো স্কলারশিপের সার্কুলারে লেখেই দিলো এ বছর সোমালিয়া এপ্লাই করতে পারবেনা, পরে যাই হোক অনেক কথার পরে সেটা বাতিল হয়েছিল। কিন্তু সোজা কথা সরকারী স্কলারশিপ যেটা YTB অরগানাইজ করে সেটা খুবই কম্পিটিটিভ।কারন এটা সরাসরি প্রেসিডেন্সির আন্ডারে পরিচালিত একটি ডিসিপ্লিনিড সরকারী বৃত্তি। যা হোক, সোজা কথা এই বৃত্তি খুব এক্সট্রা অর্ডিনারি মেধাবি আফ্রিকানরা পেতে পারে, কিন্তু এর কোটা বিপুল সংখ্যক বিদেশে পড়তে আগ্রহীদের চাহিদা পূরণ করতে পারেনা। রাহমাও বৃত্তি পায়নি, পারসোনাল ফান্ডিং এ পড়তে এসেছে। আমার সাথে কয়েকবার বাজারে বের হয়েছিল, দেখলাম খুব পাতলা একটা জ্যাকেট, হাত মোজা নেই। শীতে একটু একটু কাঁপছে। আমি লিপজেল দেওয়ার সময় আমার থেকে লিপজেল নিয়ে একটু দিতো , বাকি সময় ঠোট শুকনাই থাকে ওর। দিনের মধ্যে ২ বার খাবার খায়, কিন্তু মাছ মুরগী খেতে দেখিনা। আমি অবশ্য আসার আগে আমার ভারী ২ টা জ্যাকেটই ওকে দিয়ে এসেছিলাম, আরও অনেক কিছুর সাথে। ও আমাকে বলেছিল ঊখতি আন্তাল কারীম। মানে তুমি খুব দয়াবান।
যাইহোক মরে বেঁচে এভাবে সারভাইভ করেও পড়ালেখার প্রতি এতো আগ্রহ দেখে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কীভাবে কী করে, খরচ কোথা থেকে আসে?
রাহমা বলেছিল ওর বড় বোন ওর খরচ দেয়। বোন ডাক্তার, বাবার এতো সামর্থ্য নেই। তাই, ভালো কাপড় বা জীবনধারনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা না নিতে পারার পরেও পড়ালেখা শেষ করে সে ভালো কিছু করতে চায়।এসব সাময়িক কষ্ট, এক বেলা না খেয়ে থাকলে ও তার আফসোস লাগেনা, নতুন কাপড় না পড়লেও খারাপ লাগেনা। আফ্রিকায় তুর্কি ডিগ্রীর অনেক দাম, একবার কোনোমতে পাশ করতে পারলেই এই কষ্ট থাকবেনা।
আফ্রিকান মেয়েদের এরকম হাজারো কাহিনী আছে, একটা ভাই অথবা বোন এসেছে পড়েছে একটু দাড়াতে পারার সাথে সাথে পুরো গোষ্ঠীর যাকে পেরেছে টেনে তুলে এনেছে, পড়িয়েছে। আফ্রিকান মেয়েরাও বিদেশে টাকা কামানোর ধান্দার চেয়ে পড়ালেখাকেই প্রায়োরিটি দিয়ে থাকে। আর আফ্রিকান মেয়েদের এই দূরদেশে খেয়ে না খেয়ে দুঃস্বপ্নের জীবন কাটানোর দুঃসাহস ও অবাক করার মতো। আমাদের দেশের মেয়েরা এতো অনিশচয়তার চেয়ে ভালো একটা বিয়ে হয়ে পায়ের উপর পা তুলে খাওয়াকেই নিঃসন্দেহে বেশি প্রেফার করে। নাহয় বিদেশে বাংলাদেশ থেকে পড়তে আসা মেয়েদের সংখ্যা এতো হাতে গোনা হওয়ার কথা ছিলনা। একলা জিবুতির মতো দেশের ছাত্রী গুণে শেষ করা যায়না। একেক শহরে কতজন আছে নিজেরাও ঠিক জানেনা। আমাদের মেয়েরা কী তাহলে আফ্রিকান মেয়েদের থেকেও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে? আমাদের সমাজে এখনো কী মেয়েদের বাইরে পড়তে যাওয়ার ব্যাপারে সামাজিক অন্ধ মতবাদগুলো কলকাঠি নাড়ছে না? বিষয়টি গবেষণার দাবী রাখে

লেখকঃ সহযোগী সম্পাদক, মহীয়সী ও পি এইচ ডি গবেষক, তুরস্ক

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.