রবীন্দ্র ভাবনায় যাকাত

সুমাইয়া আফরোজ

মহৎপ্রাণ মানুষের অন্তর চিরকালই মানব কল্যানে ভাবিত হয়, তাদের দৈন্যে দুঃখিত হয়, তাদের মুক্তির পথ অন্বেষণে সচেষ্ট হয়। তবে মনুষ্য ভাবনার সীমাবদ্ধতায় কল্যানের পথে ঐক্যমত আসে না। ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয় শত শত পথে সহস্র মতের। এমনই এক পথের স্রষ্টা ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানোভ লেনিন। ১৯১৭ সালের নভেম্বরে তাঁর নেতৃত্বে সসস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে বলশেভিক পার্টি ক্ষমতায় এসে শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রবর্তন করে। এর মাধ্যমে সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানার সত্ত্ব অস্বীকার করা হয়। চাষীদের ব্যক্তিগত জমিকে রাষ্ট্রায়ত্ত করে ‘ঐকত্রিক’ চাষের প্রচলন ঘটে। সেসময়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে রাশিয়া ভ্রমণের আমন্ত্রন জানানো হলো তিনি সেখানে যান ১৯২৯ সালে। বিপ্লবের দশ বছরে রাশিয়া সমাজ ও অর্থব্যবস্থার প্রভূত পরিবর্তন ও উন্নয়ন তাঁকে মুগ্ধ করে। সরেজমিনে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব দেখতে থাকেন কবি, কথা বলেন সাধারণ চাষীদের সাথে। যে ঐকত্রিক চাষের প্রবর্তন হয়েছে তার পক্ষে বিপক্ষে মত যাচাই করতে গিয়ে লক্ষ্য করেন সবাই এই ব্যবস্থাকে মন থেকে মেনে নেয় নি যদিও কেউ মুখ ফুটে তার বিরোধিতা করতে পারে না।
ভ্রমণকালে রচিত “রাশিয়ার চিঠি” তে তিনি এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।
“পরিদর্শক প্রস্তাব করলে, হাত তুলে মত জানানো হোক। দেখা গেল, যাদের সম্মতি নেই এমন লোকও অনেক আছে। অসম্মতির কারণ তাদের বলতে বললুম; ভালো করে বলতে পারলে না। একজন বললে, “ আমি ভালো বুঝতে পারি নে। ” বেশ বোঝা গেল, অসম্মতির কারণ মানবচরিত্রের মধ্যে। নিজের সম্পত্তির প্রতিনিজের মমতা, ওটা তর্কের বিষয় নয়, ওটা আমাদের সংস্কারগত। নিজেকে আমরা প্রকাশ করতে চাই, সম্পত্তি সেই প্রকাশের একটা উপায়।
সাধারণ মানুষের পক্ষে আপন সম্পত্তি তার আপন ব্যক্তিস্বরূপের ভাষা— সেটা হারালে সে যেন বোবা হয়ে যায়।” (১)
একজন মানুষের যখন একান্ত নিজের বলে কিছুই থাকবে না তখন কোন শক্তিই তাকে দেশের উন্নয়নে শ্রম বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারে না। একজন কারখানার মালিক যেমন কারখানার পরিধি বৃদ্ধির স্বপ্ন দেখে কাজ চালিয়ে যায় তেমনি একটু কুঁড়েঘরের মালিকও ঘরের চালা মেরামতের স্বপ্ন দেখে কাজের সন্ধানে ছুটতে থাকে, এটাই মানব প্রবৃত্তির স্বাভাবিকতা। তবে দরিদ্র মানুষকে সর্বস্বান্ত করার কোন অধিকার ধনীর জন্য থাকা উচিত নয়।
“এর একটা মাঝামাঝি সমাধান ছাড়া উপায় আছে বলে মনে করি নে; অর্থাৎ ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকবে অথচ তার ভোগের একান্ত স্বাতন্ত্র্যকে সীমাবদ্ধ করে দিতে হবে। সেই সীমার বাইরেকার উদ্‌বৃত্ত অংশ সর্বসাধারণের জন্যে ছাপিয়ে যাওয়া চাই। তা হলেই সম্পত্তির মমত্ব লুব্ধতায় প্রতারণায় বা নিষ্ঠুরতায় গিয়ে পৌঁছে না।” (২)
এই মাঝামাঝি সমাধানের পথই হলো ইসলাম।
একজন মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে অর্থ উপার্জন করতে পারবে কিন্তু কাউকে ঠকাতে পারবে না। আর তার সম্পদে বাধ্যতামূলক অধিকার থাকবে যারা সহায় সম্পদহীন। তাই ইসলামী অর্থব্যবস্থায় যাকাত এবং ওশর হলো একান্ত পালনীয় বা ফরজ।
কারো একশত টাকার সম্পদ থাকলেও সে তার থেকে আড়াই টাকা দিতে বাধ্য থাকবে যেটা অবশ্যই তার দয়া বা অনুগ্রহ হিসেবে গণ্য হবে না তা নিতান্তই সম্বলহীনের হক।
এ বিষয়ে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ)
‘‘সালাত কায়িম কর ও যাকাত আদায় কর।’’ (৩)
ইসলাম যে পাঁচটি খুঁটির ওপর প্রতিষ্ঠিত তার একটি হলো যাকাত তাই এটাকে অস্বীকার করলে কেউ সম্পূর্ণ মুসলমান বলে নিজেকে দাবি করতে পারবে না।
শুধু নগদ বা সঞ্চিত অর্থ নয় জমিতে উৎপন্ন ফসলেও রাখা হয়নি উৎপাদনকারীর একচ্ছত্র অধিকার। সেখানেও ফসলের দশ ভাগের এক ভাগ থাকবে নিঃস্ব মানুষের ভাগে। আর সেচযুক্ত ফসলে বিশ ভাগের একভাগ।
অর্থাৎ যে কেউ চাইলে ইচ্ছা মত ফসল উৎপাদন করতে পারবে কিন্তু নিঃস্ব অসহায় মানুষকে নির্দিষ্ট অংশা না দিয়ে সে তা একাকী ভোগ করতে পারবে না।
তাই পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
وَهُوَ الَّذِيْ أَنْشَأَ جَنَّاتٍ مَعْرُوْشَاتٍ وَغَيْرَ مَعْرُوْشَاتٍ وَالنَّخْلَ وَالزَّرْعَ مُخْتَلِفًا أُكُلُهُ وَالزَّيْتُوْنَ وَالرُّمَّانَ مُتَشَابِهًا وَغَيْرَ مُتَشَابِهٍ كُلُوْا مِنْ ثَمَرِهِ إِذَا أَثْمَرَ
وَآتُوْا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ وَلاَ تُسْرِفُوْا إِنَّهُ لاَ يُحِبُّ الْمُسْرِفِيْنَ-
‘তিনিই লতা ও বৃক্ষ-উদ্যানসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং খেজুর গাছ, বিভিন্ন স্বাদ বিশিষ্ট খাদ্যশস্য, যায়তুন ও ডালিমও সৃষ্টি করেছেন; এগুলি একে অপরের সদৃশ এবং বিসদৃশও। যখন তা ফলবান হয় তখন তার ফল আহার করবে আর ফসল কাটার দিনে তার হক(যাকাত) প্রদান করবে এবং অপচয় করবে না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদেরকে ভালবাসেন না’(৪)
অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানে কত শত অর্থব্যবস্থা জন্ম নিয়েছে, কত মহান মনীষীগণ তার পেছনে শ্রম দিয়েছেন। কিন্তু কোন কিছু দিয়েই পূর্ণ সমাধান আসে নি, এক সমস্যা ঢাকতে গিয়ে উন্মুক্ত হয়েছে হাজারো সমস্যা। তাই রবীন্দ্রনাথ এসব চরমপন্থার মাঝামাঝি সে সহজ শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়েছিলেন তা ইসলামের মাঝেই বিদ্যমান। শুধু পরিতাপ এখানেই যে কেউ অন্ধকারে হাতড়েও পথ পায় না খুঁজে, আর কেউ আলোতে বসেও চোখ থাকে বুজে।
তথ্যসূত্রঃ
১। রাশিয়ার চিঠি (৫)
২। রাশিয়ার চিঠি (৫)
৩। আল-বাকরাহঃ ২/৪৩
৪। আন‘আম ৬/১৪১

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.