ফাতিমা আল ফিহরিঃ বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা

মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম ডিগ্রী প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা একজন মুসলিম নারী!! তথ্যটি বিস্ময়কর হলেও এটাই সত্যি। মরক্কোর ফেজ শহরে অবস্থিত ‘ক্বারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে পরিচিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি (যা অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও ৩০০ বছর পুরাতন) যার পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয়েছিল তিনি হলেন ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ আল ফিহরি। হাজার বছর আগে নবম শতাব্দীতে প্রথমবারের মতো জ্ঞানচর্চা এবং গবেষণার কাজকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের কথা চিন্তা করেন এই বিদুষী নারী  এবং সেই চিন্তাকে বাস্তব রূপদানের জন্য তিনি তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সকল সম্পদ ব্যয় করেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজে। ক্বারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীও পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো ও বৃহত্তম গ্রন্থাগার।

একজন অত্যন্ত সম্পদশালী ব্যবসায়ীর ঘরে তিউনিসিয়ায় জন্ম হয় ফাতিমা আল ফিহরির। পরিবারের আভিজাত্যের কারণে ফাতিমা আল ফিহরি ছিলেন রাজকন্যার মত সম্মানিতা। নতুন ব্যবসার জন্য মুহাম্মদ আল ফিহরি তার দুই মেয়ে ফাতিমা আল ফিহরি ও মারিয়াম আল ফিহরিকে নিয়ে মরক্কোতে বসবাস শুরু করেন। সেখানে থেকেও তিনি তার মেয়েদের জন্য সেই সময়ের পৃথিবীর সেরা ইসলামী শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থা করেন। তারা দুইজনই উন্নত নৈতিকতাসম্পন্ন, আত্মবিশ্বাসী ও উচ্চ শিক্ষিতা নারী হিসেবে বেড়ে ওঠেন। ফাতিমা ক্যালিগ্রাফিক আর্টের প্রতি বিশেষ দুর্বল ছিলেন। ক্যালিগ্রাফিক স্টাইলে অনেক বই লিখে তিনি এতে দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি অল্প বয়সেই জ্ঞানের অনেক শাখায় বুৎপত্তি অর্জন করেন এবং একজন ধার্মিক নারী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন।  ফাতিমা ও মারিয়াম দুই বোনেরই নকশা, স্থাপত্যশিল্প ইত্যাদির প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল। দুজনেরই স্বপ্ন ছিল এমন স্থাপনা তৈরী করার যা একই সাথে দৃষ্টিনন্দন এবং উপকারী হবে।

তারা যখন মরক্কোর ফেজ শহরে বসবাস শুরু করলেন, তারা চিহ্নিত করলেন এই নতুন এলাকার মানুষের চাহিদা কি এবং কিভাবে সেই চাহিদা তারা পূরণ করতে পারেন। প্রথমেই ফাতিমা খেয়াল করলেন যে, এই শহরে কোন সুপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষা কেন্দ্র নেই। দুই বোন মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন তারা একটি মসজিদ নির্মাণ করবেন। এমন একটি মসজিদ যা হবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য পারষ্পরিক যোগাযোগের প্রাণকেন্দ্র। উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ হাতে পাওয়া মাত্রই দুই বোন সেই মসজিদের নক্শা করা শুরু করলেন, যা ছিল রীতিমতো রাজকীয়। ফাতিমা নিজে  নকশা অনুযায়ী মসজিদটির নির্মাণ তত্ত্বাবধান করেন। ৮৫৭ সাল থেকে ৮৫৯ সাল পর্যন্ত যতদিন না মসজিদটির নির্মাণ সম্পন্ন হয়, টানা দুই বছর তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাহায্যের আশায় রোজা রাখেন । পরবর্তীতে এই মসজিদটিকেই তিনি বিশাল গ্রন্থাগার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করেন। এভাবেই ফাতিমা আল ফিহরি পৃথিবীর সর্বপ্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলেন এবং বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থার একজন পথিকৃতে পরিণত হন।

উচ্চতর শিক্ষার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক এই ধারণাটি পরবর্তীতে ইউরোপীয়রা কাজে লাগিয়ে অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলে। অসংখ্য বিখ্যাত পন্ডিত এই স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পড়াশোনা করেছেন। এমনকি শোনা যায় যে, গার্বার্ট অফ অরিল্যাক যিনি পোপ দ্বিতীয় সিলভেস্টার নামে পরিচিত, তিনিও এই কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। ইনিই সেই ব্যাক্তি যাকে ইউরোপে সর্বপ্রথম আরবি সংখ্যা পদ্ধতি প্রচলনের কৃতিত্ব দেওয়া হয়।

আল কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়টি আজও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে স্বমহিমায় উজ্জল। এখানকার গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে প্রায় ৪০০০ পান্ডুলিপি; ১৪শ শতকের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুনের ‘আল মুক্বাদ্দিমাহ’ও তার মধ্যে একটি। এছাড়া এর ভেতরের বিভিন্ন দর্শনীয় বস্তুর মধ্যে একটি অন্যতম আকর্ষণ হলো কাঠে খোদাই করা ফাতিমা আল ফিহরির আসল ডিপ্লোমার স্মারক। সম্প্রতি লাইব্রেরীটিকে সম্পূর্ণ নতুনরূপে ঢেলে সাজানো হয়েছে, যার দায়িত্বে ছিলেন আরেকজন নারী স্থাপতি আজিজা শাউনি।

বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ সাধনের ক্ষেত্রে মুসলিম নারীরাও যে অবদান রাখতে পারেন ফাতিমা আল ফিহরি তার জ্বলন্ত প্রমাণ। ফাতিমার দূরদর্শিতা, স্থাপত্য বিষয়ক দক্ষতা এবং শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য সম্পদ উৎসর্গ করার মানসিকতা তাঁকে একজন শিক্ষানুরাগী হিসেবে কিংবদন্তীতে পরিণত করেছে। আজও তিনি শিক্ষিত মুসলিম নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার এক অনন্ত উৎস।

অনুবাদকঃ আম্মাতে রাব্বানী
তথ্যসূত্রঃ         https://hamariweb.com/articles/120426

আরও পড়ুন