কলকাতার জীবনধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাতা অলভ্য ঘোষের সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার  নিয়েছেন নিবেদিতা হালদার

– তুমি নি:সন্দেহে একজন নির্ভীক, নিভৃতচারী গুণী লোক, তা বলার অবকাশ থাকে না।

-এইরে…. শুরুতেই এত ভাল ভাল কথা। কিন্তু দেখো সাক্ষাৎকারটা সাজানো গোছানো না হয়ে অগোছালো থাক। তুমি আমার বন্ধু না হয়ে শত্রু বা সমালোচক হিসেবে সাক্ষাৎকার নিলে খুশি হবো।

আমি প্রচণ্ড ভীতু নির্ভীক হলাম কি করে।আর দশজনের মত আমার হরেক রকম ভয় আছে। না ভূতের ভয় না।এই সিস্টেমটাকে নিয়ে ভয়। প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে আমি প্রতি মুহূর্তে ভয়ে ভয়ে থাকি। কখন সে আমার ঘাড় মটকে দেবে। কথা বলার শক্তি কেড়ে নেবে। ভয়ে থাকি তোমার মত সুন্দরীদের। নারীর প্রতি দুর্বলতা আমার প্রবল। তার মধ্যে আমার মা ও পড়েন।আর এই নারী শক্তি যে কত ভয়ঙ্কর রকমের শক্তিশালী তা তুমি নিজেই অনুভব করতে পারো।জগত সংসারের চাবিকাঠি নারীর হাতে। পুরুষের হাতে নেই। নারীর মোহিনী শক্তির আমার বড় ভয়।কার প্রেমে কোথায় ভেসে যাব ভগবান জানে। ভয় এই যে একটা বিপ্লবী বিপ্লবী রাজনৈতিক আবেগ আমার মধ্যে এটি আর নারী বিপরীতমুখী পরস্পর বিরোধী দুটোর খপ্পরে এক সাথে পড়ার উপায় নেই।তাই নারী সংসর্গ থেকে নিজেকে কিছুটা দূরত্ব রেখেই চলতে হয়। এক্সেপশনাল তুমি।কারণ তুমি আমার কাছে কেবল নারী নও। তুমি আমার ফ্রেন্ড ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড।

নিভৃতচারী কথাটা সত্যি।তবে আগে বলে রাখি আমি গুণী নোই। মানে প্রথাগত যে সব কোয়ালিটি থাকলে সমাজ একটা মানুষকে গুণী বলে আমার সেসব কোন গুণ নেই।নেই বলে আমার কোন দুঃখ নেই।আর সেই সব গুণ অর্জনের বিন্দুমাত্র চেষ্টা করিনি কোনদিন।তবে মাকাল ফল নই। যা দেখতে সুন্দর লাগে।কিন্তু কোন কাজেই আসে না।আসলে আমি গুণের মাপকাঠি টা অন্যভাবে নির্ণয় ও পরিমাপ করি।গুণ মানে সরস্বতীর বরপুত্র এমন ব্যাপার নয়। রাবীন্দ্রিক এই ধরনের সাংস্কৃতিক জীবন বোধে আমার তীব্র ঘৃণা আছে।কারণ এটিও একটি চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতি যা আমার শ্রেণী কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছে।যা আমার শ্রেণী স্বার্থের পরিপন্থী। আমার শ্রেণী সংগ্রামের জন্য মোটেই হিতকর নয় বরং প্রশমিত দুর্বল করে দেয়।

তুমি আমাকে প্রশ্ন করতে পারো যে তুমি যা করো তা কত লোকের কি উপকারে এসেছ তুমি?

– সত্যিই মানুষের বিন্দুমাত্র উপকারে আসার ক্ষমতা আমার নেই।আজ আমার কাছে একটি টাকা নেই। আমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কত কি আছে তুমি ভালো করেই জানো ভাঁড়ে মা ভবানী।আমি কিন্তু কখনোই সেটির উন্নতি সাধনে সব রকমের চেষ্টায় নেমে পরিনি।যখন যে অবস্থা হয়েছে আমি মেনে নিয়েছি।মেনে নিয়েছি আমার গরিবি।আর বারবার উপায় খুঁজেছি মানুষের কাছে কিভাবে পৌঁছানো যায়;পুঁজি মুনাফা বাজারের হাতে নিজের আদর্শ মূল্যবোধ গুলো বিক্রি না করে।আমার শিল্পকে পর্ণ দ্রব্য না বানিয়ে আমি হাতিয়ার বানাতে চেয়েছি নিজেকে বেশ্যা না বানিয়ে আমি যোদ্ধা বানাতে চেয়েছি।আমি যেটুকু পারি বলে মনে করি তা মানুষের প্রথাগত সামন্ততান্ত্রিক জীবন দর্শন কে আঘাত করা;বিবেক কে আক্রমণ করে ;ক্ষতবিক্ষত করা! উর্বরতা কামী কৃষকের হাল চষার মত মানুষের হৃদয় কে উজ্জীবিত করা! ভাবা ও ভাবানো যা কিনা আমাদের একটি সংশোধিত গণতন্ত্র; সমাজতান্ত্রিক সাম্যবাদের দিকে প্ররোচিত করবে।এর ভেতরেই আমি ঘুরপাক খাই।এর মধ্যেই আমার শিল্প সাহিত্য চর্চা।

হ্যাঁ আমি নিভৃতচারী আড়ালে থেকে চুপচাপ নিজের কাজটা করে যেতে ভালবাসি।কারণ আমার কাজটাই আত্ম-বিশ্লেষণ।আমার এই যে বাবা মা বা ভাবান্তরে ঈশ্বর প্রদত্ত শরীর আত্মা মন এগুলো একসাথে একটা অনুভূতি ধরার ট্রান্সমিটার।a set of equipment used to generate and transmit feeling waves carrying messages or signals.অন্যভাবে বলতে গেলে উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মত সমাজ সংসার পরিবেশ থেকে অনেক কিছু গ্রহণ করে নিজের মধ্যে ফিল্টার করে সমাজকে বাঁচার অক্সিজেন টা ফিরিয়ে দিই।এটাই আমি মনে করি আমার কাজ।আর এই কাজটা যে পারছি তখন বুঝতে পারি যখন আন্তর্জাল কিংবা লিটল ম্যাগাজিনের দৌলতে ভারত কিংবা বাংলাদেশের কোন প্রত্যন্ত এক অঞ্চলে কেউ আমার লেখা পড়ে অভিভূত হয়ে পরেন বলবো না বলবো একটা সজোরে আঘাত পান নড়ে ওঠেন বলেন দাদা এটা খুব দরকার ছিল।আমি সুড়সুড়ি দেবার শিল্প সাহিত্য করিনা বরং আমার কাজগুলো গালে থাপ্পড় নয়; চাবুক মাড়ুক মানুষের বিবেকে এটা আমি চাই। আজ এই যে সাক্ষাৎকার দিচ্ছি আমার বোন তুল্য মহীয়সী পত্রিকার সম্পাদিকা শারমিন আকতারের অনুরোধে;সেটাও আমি মনে করি আমার কর্ম সফলতার একটি অংশ।না হলে এতো লোক আছে শারমিন আমার সাক্ষাৎকার কেনও চাইলো।আমিতো সাজুগুজু করে সেলফি দেওয়া লেখক নোই।আমি চিরকাল প্রচার বিমুখ।কলকাতায় দুই চারবার নিজের ছবির প্রদর্শন ও পুরস্কার প্রাপ্তির পর ছাড়া এ ধরণের সাক্ষাৎকার কেবল বিদেশে দিয়েছি চলচ্চিত্র উৎসব গুলিতে কারণ বাধ্য হয়েছি।তারা হাঁড়ির খবর জানতে চায় এবং খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বার করে।

আমার মনে হয় প্রতিটি সৃজনশীল মানুষের নিজের সাথে নিজের বসবাস করা উচিত।একা থাকা উচিত।উচিত প্রতি মুহূর্তে নিজের সাথে নিজে কথা বলা।নিজেকে অনেক অনেক সময় দেওয়া।আমি সেটা করি।বলা ভাল করতে এখনো পর্যন্ত করি।কারণ আমার নিজের জন্য আমার একটা পৃথিবী বানিয়ে সেখানে বসবাস করি খুব ছোট দিয়ে।আমার জীবন যাপন আর দশজনের মত নয়;তুমি তা খুব ভালো করেই জানো।আজ মানুষের সব আছে;কেবল সময়ের অভাব মরারও সময় নেই।আমার অঢেল সময়।আমি কোন অনুষ্ঠানে বাধ্য না হলে যাই না বললেই চলে।জীবনে ইঁদুর দৌড় নেই।অনেক উপার্জন, অনেক অনেক কিছু প্রত্যাশা কিছু নেই।কেবল খেয়ে পরে বেঁচে থাকা আর নিজের কাজ করে যাওয়া।

(চলবে)

আরও পড়ুন