বেগম রোকেয়ার দৃষ্টিতে নারীর শিক্ষা ও অধিকার

আজিজা সুলতানা

নারী জাতির সম্ভাবনা, সমস্যা ও স্বাধিকার নিয়ে যে মহীয়সী জীবনব্যাপী সংগ্রাম করে গেছেন তাঁর কীর্তিগাঁথা নব নব মহিমায় আজো উদ্ভাসিত হচ্ছে।তিনি অতি শুভাকাঙ্ক্ষীজন, নারী জাতির অভিভাবক বেগম রোকেয়া।তাঁর কথায়, লেখায়, উদ্যোগে ও বাস্তবায়নে বারবার নারীর শিক্ষা ও অধিকারের কথা আন্দোলিত হয়েছে। নারী জাতিকে নানাভাবে উজ্জীবিত করার জন্য তাঁর প্রচন্ড প্রয়াস লক্ষণীয়।তিনি নারীর শিক্ষার প্রতি গুরুত্বআরোপ করেছেন,শিক্ষার ভিত্তিমূল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং শিক্ষার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও স্বরূপ নিয়ে গবেষণা করেছেন।নারী জাগরণের ডাক এসেছে তাঁর আহবানে।“জাগো মাতা, ভগিনী, কন্যা- উঠ, শয্যা ত্যাগ করিয়া আইস ।অগ্রসর হও। ঐ শুন “মোয়াজ্জিন” আজান দিতেছেন । তোমরা কি ঐ আজান ধ্বনি, আল্লাহর ধ্বনি শুনিতে পাও না?  আর ঘুমাইও না; উঠ, এখন আর রাত্রি নাই, এখন সুবহে সাদেক- মোয়াজ্জিন আজান দিতেছেন । যৎকালে সমগ্র জগতের নারীজাতি জাগিয়া উঠিয়াছে, তাঁহারা নানাবিধ সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিয়াছে-তাহারা শিক্ষা মন্ত্রী হইয়াছে, তাঁহারা ডাক্তার, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, যুদ্ধমন্ত্রী, প্রধান সেনাধ্যক্ষা, লেখিকা, কবি ইত্যাদি ইত্যাদি হইতেছে-আমরা বঙ্গনারী গৃহ-কারাগারে অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে মেঝেতে পড়িয়া অঘোরে ঘুমাইতেছি । আর যক্ষ্মা রোগে ভুগিয়া হাজারে হাজারে মরিতেছি ।”[সুবেহ সাদেক, অগ্রন্থিত প্রবন্ধ, (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২৪১)]।

মুসলিম জাতির গৌরবজ্জ্বল হারানো অতীত,সোনালী ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন ইতিহাসের কথা।“এমন একদিনও ছিল, যখন অন্যান্য দেশের মুসলমানসমাজে “স্ত্রীকবি, স্ত্রীদার্শনিক, স্ত্রীঐতিহাসিক, স্ত্রীবৈজ্ঞানিক, স্ত্রীবক্তা, স্ত্রীচিকিৎসক, স্ত্রীরাজনীতিবিদ্‌” প্রভৃতি কিছুরই অভাব ছিল না। কেবল বঙ্গীয় মোসলেম সমাজে ওরূপ রমণীরত্ন নাই।  ”[স্ত্রীজাতির অবনতি, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২১,টীকা ১১)]

১৯৩০ সালে বঙ্গীয় নারী শিক্ষা সম্মেলনে পঠিত ভাষণে তিনি স্মরণ করে দিয়েছিলেন “পৃথিবীতে যিনি সর্বপ্রথম পুরুষ-স্ত্রীলোককে সমভাবে সুশিক্ষাদান করা কর্তব্য বলিয়া নির্দেশ করিয়াছিলেন, তিনি আমাদের রসুল মকবুল অর্থাৎ হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)। তিনি আদেশ করিয়াছেন যে, শিক্ষা লাভ করা সমস্ত নর নারীর অবশ্য কর্তব্য। তেরশত বৎসর পূর্বে আমাদের জন্য এই শিক্ষাদানের বাধ্যতামূলক আইন পাশ হইয়া গিয়াছে। কিন্তু আমাদের সমাজ তাহা পালন করে নাই।”

শিক্ষা বাধ্যতামূলক এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।কিন্তু এ শিক্ষা আসলে কোন ধরনের শিক্ষা।তিনি তাও সুস্পষ্ট করেছেন।সমকালীন সমাজে যে সার্টিফিকেট সর্বস্ব পাস করা বিদ্যা তাকে বয়কট করে তিনি বলেছেন এটা প্রকৃত শিক্ষা না।এভাবে জাতি কখনো পাসের হার দিয়ে প্রকৃত শিক্ষিত জাতি হতে পারেনি এবং পারবেও না।শিক্ষা হচ্ছে প্রতিটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার।অন্য সংস্কৃতি,ঐতিহ্য,দেশ ও ব্যবস্থার অন্ধ-অনুকরণ কখোনই শিক্ষা নয়।এ ব্যাপারে নতুনভাবে আত্মপর্যালোচনা আমাদের আশু প্রয়োজন। মহীয়সী বলেছেন,“যাহা হউক “শিক্ষা”র অর্থ কোন সম্প্রদায় বা জাতিবিশেষ “অন্ধ-অনুকরণ” নহে। ঈশ্বর যে স্বাভাবিক জ্ঞান বা ক্ষমতা (faculty) দিয়াছেন, সেই মতকে অনুশীলন দ্বারা বৃদ্ধি (develop) করাই শিক্ষা। ঐগুণের সদ্ব্যবহার করা কর্ত্তব্য এবং অপব্যবহার করা দোষ। ঈশ্বর আমাদিগকে হস্ত পদ, কর্ণ, মনঃ এবং চিন্তাশক্তি দিয়াছেন। যদি আমরা অনুশীলন দ্বারা হস্তপদ সবল করি, হস্ত, দ্বারা সৎকার্য্য করি, চক্ষুদ্বারা মনোযোগ সহকারে দর্শন (বা observe) করি, কর্ণ দ্বারা মনোযোগ পূর্ব্বক শ্রবণ করি, এবং চিন্তাশক্তি দ্বারা আরও সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করিতে শিখি-তাহাই প্রকৃত শিক্ষা। আমরা কেবল “পাশ করা বিদ্যা”কে প্রকৃত শিক্ষা বলি না।”[স্ত্রীজাতির অবনতি, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ১৯)]সুশিক্ষা সেটাই-যাহাতে মস্তিষ্ক ও মন উন্নত হয়।সেজন্য আমাদের সর্ববিধ জ্ঞানের চর্চা করতে হবে।অনেকে আধ্যাত্মিক জগতকে পাশ কাটিয়ে চলি।তাঁর সুযোগ তিনি রাখেননি।তিনি বলেছেন,“পতঙ্গ-ভীতি দূর করিবার জন্য প্রকৃত সুশিক্ষা চাই-যাহাতে মস্তিষ্ক ও মন উন্নত হয়।আমরা উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত না হইলে সমাজও উন্নত হইবে না।যতদিন আমরা আধ্যাত্মিক জগতে পুরুষদের সমকক্ষ না হই, ততদিন পর্যন্ত উন্নতির আশা দুরাশা মাত্র।আমাদিগকে সকল প্রকার জ্ঞানচর্চ্চা করিতে হইবে।”[বোরকা, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ৪৫)]

মুসলিমদের শিক্ষার ভিত্তি হবে আল-কুরআন।আল কুরআন বোঝা ও মানার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।এর বিপরীত হলে শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।কেননা প্রাথমিক শিক্ষার সমস্তই আল কোরআনে বর্ণিত আছে। আমাদের ধর্ম ও সমাজের জন্য কোরআনের শিক্ষা একান্ত প্রয়োজন।তাঁর বাণীতে এ বিষয়টি অনেকবার এসেছে।তাকে একশ্রেণীর লোক “ধর্মবিরোধী” ও তথাকথিত “নারীবাদী” হিসেবে চিহ্নিত করে। আসলে তিনি তা নন।“মুসলমান বালিকাদের প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে কোরআন শিক্ষাদান করা সর্বাপেক্ষা অধিক প্রয়োজন। কোরআন শিক্ষা অর্থে শুধু টিয়া পাখীর মত আরবী শব্দ আবৃত্তি করা আমার উদ্দেশ্য নহে। বিভিন্ন প্রাদেশিক ভাষায় কোরআনের অনুবাদ শিক্ষা দিতে হইবে। সম্ভবত: এ- জন্য গভর্নমেন্ট বাধ্যতামূলক আইন পাশ না করিলে আমাদের সমাজ মেয়েদের কোরআন শিক্ষাও দিবে না। যদি কেহ ডাক্তার ডাকিয়া ব্যবস্থাপত্র লয়, কিন্তু তাহাতে লিখিত ঔষুধ- পথ্য ব্যবহার না করিয়া সে ব্যবস্থাপত্রখানাকে মাদুলী রূপে গলায় পরিয়া থাকে, আর দৈনিক তিনবার করিয়া পাঠ করে, তাহাতে কি সে উপকার পাইবে, আমরা পবিত্র কোরআন শরীফের লিখিত ব্যবস্থা অনুযায়ী কোন কার্য করি না, শুধু তাহা পাখির মত পাঠ করি’ আর কাপড়ের থলিতে [জয়ুদানে] অতি যত্নে উচ্চস্থানে রাখি।”[বঙ্গীয় নারী- শিক্ষা সমিতি,,অগ্রন্থিত প্রবন্ধ,(রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২২৯)]

“আমার অমুসলমান ভগিনীগণ! আপনারা কেহ মনে করিবেন না যে, প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে কোরআন শিক্ষা দিতে বলিয়া আমি গোড়াঁমীর পরিচয় দিলাম। তাহা নহে, আমি গোঁড়ামী হইতে বহুদূরে। প্রকৃত কথা এই যে, প্রাথমিক শিক্ষা বলিতে যাহা কিছু শিক্ষা দেওয়া হয়, সে সমস্ত ব্যবস্থা কোরআনে পাওয়া যায়। আমাদের ধর্ম ও সমাজ অক্ষুন্ন রাখিবার জন্য কোরআন শিক্ষা একান্ত প্রয়োজন।”[বঙ্গীয় নারী- শিক্ষা সমিতি,অগ্রন্থিত প্রবন্ধ,(রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২৩০)]

“ছেলেবেলায় আমি মার মুখে শুনতাম, কুরআন শরীফ ঢাল হয়ে আমাদের রক্ষা করবে। সে কথা অতি সত্য। অবশ্য তার মানে এই নয় যে, খুব বড় আকারের সুন্দর জেলদ বাঁধা কুরআনখানা আমার পিঠে ঢালের মতো করে বেঁধে নিতে হবে। বরং আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে আমি এই বুঝি যে, কুরআন শরীফের সার্বজনীন শিক্ষা আমাদের নানা প্রকার কুসংস্কারের বিপদ থেকে রক্ষা করবে। কুরআন শরীফের বিধান অনুযায়ী ধর্ম-কর্ম আমাদের নৈতিক ও সামাজিক অধঃপতন থেকে রক্ষা করবে।”[ধ্বংসের পথে বঙ্গীয় মুসলিম,অগ্রন্থিত প্রবন্ধ,(রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২৫০)]

“কোন ভদ্রলোক বায়না ধরেছেন যে আই এ পাশ পাত্রী চাই। কেউ চান অন্তত ম্যাট্রিক পাশ, তা না হলে তারা খ্রীস্টান বা ব্রাক্ষ্ম হয়ে যাবেন। এসব বিকৃত রুচির প্রধান কারণ বর্তমান ধর্মহীন শিক্ষা।”[ধ্বংসের পথে বঙ্গীয় মুসলিম,অগ্রন্থিত প্রবন্ধ,(রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২৪৯)]

“আমাদের জন্য এ দেশে শিক্ষার বন্দোবস্ত সচরাচর এইরূপ-প্রথমে আরবীয় বর্ণমালা, অতঃপর কোরাণ শরীফ পাঠ। কিন্তু শব্দগুলির অর্থ বুঝাইয়া দেওয়া হয় না, কেবল স্মরণশক্তির সাহায্যে টীয়াপাখীর মত আবৃত্তি কর। কোন পিতার হিতৈষণার মাত্রা বৃদ্ধি হইলে, তিনি দুহিতাকে “হাফেজা” করিতে চেষ্টা করেন। সমুদয় কোরাণখানি যাঁহার কণ্ঠস্থ থাকে, তিনিই “হাফেজ”।”[অর্দ্ধাঙ্গী, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ৩০)]

বেগম রোকেয়ার ‘নার্স নেলী’ গল্পের মূল্যায়নে মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন লিখেছেন, “ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে উপনিবেশ স্থাপন করার পূর্বে চক্রান্তকারীরা সে দেশের দুর্বলস্থান সমূহ চিহ্নিত করতো এবং মানবিক দিকগুলিকে ধীরে ধীরে দুর্বল করার চেষ্টা করতো। এখানেও সিস্টাররা প্রথমে নয়ীমার দুর্বল স্থানগুলি চিহ্নিত করেছে এবং এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, নয়ীমা ‘নিজের ধর্ম্ম সম্বন্ধীয় দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস কিছুই জানেনা’। তাই নয়ীমার ‘নির্ম্মল অন্তরে যীশু মহিমার গভীর রেখা অঙ্কিত হইল।’ এখানেও দু’টি বিষয় উল্লেখযোগ্য। এক, মুসলমানরা ইসলাম ধর্মের মধ্যে ‘দর্শন, বিজ্ঞান ও ইতিহাস’ আছে তা জানার চেষ্টা করে না। বরং তোতা পাখির মত মুখস্থ করে অথবা একে তাবিজ বানিয়ে গলায় ঝুলিয়ে রাখে কিন্তু এর যে বিশাল কার্যক্ষমতা আছে তা জানবার চেষ্টা করে না। দুই, অন্যরা যখন আমাদের কোন দুর্দিনে এগিয়ে আসে আমরা তাদের উদ্দেশ্য না জেনে আমাদের সব তাদের বিলিয়ে দিয়ে একসময় সর্বস্বান্ত হয়ে যাই। আর তখনই উপনিবেশিক শক্তি আমাদের যা শিখায় বা তারা যা বলে আমরা তাই বিশ্বাস করি। জার্মান দার্শনিক গ্রামস্কির মতে ‘হেজিমনিক’ জ্ঞানের কারণেই আমাদের এ দুরবস্থা। কিন্তু নয়ীমার এ দুরবস্থা দেখে রোকেয়া মন্তব্য করলেন, ‘তিনি ক্রমে আরোগ্য লাভ করিতে লাগিলেন, কিন্তু তাঁহার অন্তর কলুষিত হইতে আরম্ভ করিল। যে কখনও আলোক দেখে নাই, তাঁহার নিকট জোনাকীর আলোই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ বোধ হয়। নয়ীমার দশাও সেইরূপ।’…ধর্মে দীক্ষিত হবার পর নেলীকে শিখানো হলো ইসলাম ধর্মকে আঘাত করতে। কেননা যেহেতু সে অর্থসহ কোরআন পড়েছে তাকে দিয়ে আঘাত করা সহজ হবে। তাই ‘নয়ীমা তাঁহার কোরান শরীফখানি সঙ্গে আনিয়েছিলেন যে অকাট্য যুক্তি দ্বারা তাহার প্রত্যেকটা আয়েৎ খন্ডন করিয়া জগৎকে দেখাইবেন, মুসলমান ধর্ম্ম কেমন অসার; অন্ধ বিশ্বাসীর ধর্ম্ম।’ কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাসের শিকার তা বুঝতে নয়ীমাকে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। তাই দিনে হাসপাতালে মল-মূত্র পরিস্কার করে রাত জেগে আল্লাহর দরবারে কান্নায় পড়ে থাকতো নেলী। ‘সোবহান্ আল্লাহ! রাত্রি জাগিয়া নামাজ পড়ায়- অশ্রু প্লাবনে সেজদার স্থান ভিজাইয়া দেওয়ায় এতে শান্তি লাভ হয়!’

আর এ প্রেক্ষাপটে বেগম রোকেয়া বলেন, ‘নয়ীমা স্বকৃত পাপের ফল ভোগ করিতেছে- ইহা ত তাহার ন্যায্য প্রাপ্য, তাহাতে আমার দুঃখিত হইবার কারণ কি?’ আমরা সত্যিকারে নয়ীমার জন্য করুণাবোধ করি কিন্তু দুঃখবোধ করি ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য যে মুসলমানরা দীর্ঘ ষড়যন্ত্রের কারণে সব হারানোর পরও নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে অধ্যয়ন করেনা। বরং অন্যের লিখিত মিথ্যা ইতিহাস পড়ে পূর্বপুরুষদের গালমন্দ করে।”

বেগম রোকেয়া শিক্ষার বহু উদ্দেশ্য বিবৃত করেছেন।আমাদের জন্য অত্যন্ত পরিতাপের ব্যাপারে এই যে,শিক্ষার এই উদ্দেশ্যগুলো আমাদের সমাজে অনুপস্থিত থাকায় শিক্ষার সুফল থেকে আমরা সম্পূর্ণ বঞ্ছিত।সামাজিক অপরাধ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে।মানব অসহায় ও অতিষ্ট হয়ে পড়েছে।তাঁর চিন্তাধারায়, পুরুষদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যা, নারীদের লক্ষ্যও তাই।তবে তারা বিশেষ কর্তব্য সাধনের জন্য নারীরূপে জন্মলাভ করেছে।মানুষ শিক্ষাকে কেবল চাকরী লাভের পথ মনে করে।এই ভুল ধারণা থেকে তাদের বেরিয়ে আসতে হবে।তাঁর ভাষায়, “আজি কালি অধিকাংশ লোকে শিক্ষাকে কেবল চাকরী লাভের পথ মনে করে। মহিলাগণের চাকরী গ্রহণ অসম্ভব সুতরাং এই সকল চক্ষে স্ত্রীশিক্ষা সম্পূর্ণ অনাবশ্যক।” [স্ত্রীজাতির অবনতি, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ১৮)]।

বেগম রোকেয়ার মতে,আদর্শ কন্যা, আদর্শ ভগিনী, আদর্শ গৃহিণী এবং আদর্শ মাতা হবার জন্যি শিক্ষা।শিক্ষার দ্বারা মানসিক দাসত্ব দূর হবে।সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী স্রষ্টা ছাড়া সে আর কারো কাছে নত হবে না।বর্তমান বাস্তবতা এর উলটো চিত্র পেশ করে।সুশিক্ষা মানবের নিস্তেজতা, সংকীর্ণমনতা ও ভীরুতা সরিয়ে দেবে।আমাদের সমস্ত অত্যাচার নিবারণ করবে এবং নাগরিক অধিকার লাভে সক্ষম করবে।তাঁর নিচের বক্তব্যগুলো সে দৃষ্টান্তই তুলে ধরে।“আমি চাই সেই শিক্ষা-যাহা তাহাদিগকে নাগরিক অধিকার লাভে সক্ষম করিবে, তাহাদিগকে আদর্শ কন্যা, আদর্শ ভগিনী, আদর্শ গৃহিণী এবং আদর্শ মাতারূপে গঠিত করিবে।শিক্ষা –মানসিক এবং শারীরিক উভয়বিধ হওয়া চাই।তাহাদের জানা উচিত যে, তাহারা ইহজগতে কেবল সুদৃশ্য শাড়ী, ক্লিপ ও বহুমূল্য রত্নালংকার পরিয়া পুতুল সাজাইবার জন্য আইসে নাই; বরং তাহারা বিশেষ কর্তব্য সাধনের নিমিত্ত নারীরূপে জন্মলাভ করিয়াছে।”[সুবেহ সাদেক, অগ্রন্থিত প্রবন্ধ, (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২৪২)]”

“এখন পার্সী মহিলাদের পর্দামোচন হইয়াছে সত্য, কিন্তু মানসিক দাসত্ব মোচন হইয়াছে কি? অবশ্যই হয় নাই। আর ঐ যে পর্দা ছাড়িয়াছেন, তাহা দ্বারা তাঁহাদের স্বকীয় বুদ্ধিবিবেচনার ত কোন পরিচয় পাওয়া যায় না। পার্সী পুরুষগণ কেবল অন্ধভাবে বিলাতী সভ্যতার জীবনীশক্তির ত কিছু পরিচয় পাওয়া যায় না-তাঁহারা যে জড়পদার্থ, সেই জড়পদার্থই আছেন। পুরুষ যখন তাঁহাদিগকে অন্তঃপুরে রাখিতেন, তাঁহারা তখন সেইখানে থাকিতেন। আবার পুরুষ যখন তাঁহাদের “নাকের দড়ী” ধরিয়া টানিয়া তাঁহাদিগকে মাঠে বাহির করিয়াছেন, তখনই তাঁহারা পর্দার বাহির হইয়াছে! ইহাতে রমণীকুলের বাহাদুরী কি? ঐরূপ পর্দা-বিরোধ কখনই প্রশংসনীয় নহে।” ”[অর্দ্ধাঙ্গী, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২৫)]”

“সম্প্রতি আমরা  যে এমন নিস্তেজ সংকীর্ণমনা ও ভীরু হয়ে পড়িয়াছি,  ইহা অবরোধে থাকার জন্য হয় নাই-শিক্ষার অভাবে হইয়াছে । সুশিক্ষার অভাবেই আমাদের হৃদয়বৃত্তি এমন সঙ্কুচিত হইয়াছে ।”[বোরকা, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ৪৪)]

“শিক্ষা বিস্তারই এইসব অত্যাচার নিবারণের একপমাত্র মহৌষধ।”[সুবেহ সাদেক, অগ্রন্থিত প্রবন্ধ, (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২৪২)]

আমাদের উন্নতির জন্য  ধর্মবন্ধন ত্যাগ করা বা ধর্মকে সুবিধে মতো পাশ কাটিয়ে চলা বোকামী।ধর্মীয় সংস্কৃতি সম্পূর্ণ গ্রহণ করাই কল্যাণকর। “আমি ভগিনীদের কল্যাণ কামনা করি, তাহাদের ধর্মবন্ধন বা সমাজবন্ধন ছিন্ন করিয়া তাঁহাদিগকে একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে বাহির করিতে চাহি না । মানসিক উন্নতি করিতে হইলে হিন্দুকে হিন্দুত্ব বা খ্রীষ্টানকে  খ্রীষ্টানী  ছাড়িতে হইবে এমন কোন কথা নাই । আপন আপন সম্প্রদায়ের পার্থক্য রক্ষা করিয়াও মনটাকে স্বাধীনতা দেয়া যায় । আমরা যে কেবল উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে অবনত হইয়াছি, তাই বুঝিতে ও বুঝাইতে চাই ।”[অর্দ্ধাঙ্গী, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ৩২)]

বলতে দ্বিধা নেই,শিক্ষার যে উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আজকাল বড় বড় শিক্ষিত ও পন্ডিত ব্যাক্তিরাও বড্ড উদাসীন তিনি সেগুলোকেও আলোয় বের করেছেন।তিনি বলেছেন,ইহকাল ও পরকালের সফলতার জন্যই শিক্ষা প্রয়োজন।পরকাল নষ্টের ভাবনা ভাবাও জ্ঞানীর কর্তব্য।এজন্য মানবের মন, মস্তিঙ্ক, চক্ষু প্রভৃতির সদ্ব্যবহার আবশ্যক।

“যাহা হউক, আমি উক্ত বধূবেগমের জন্য বড় দুঃখিত হইলাম, ভাবিলাম,অভাগীর ইহলোক পরলোক-উভয়ই নষ্ট।যদি ঈশ্বর হিসাব নিকাশ লয়েন যে,তোমার মন, মস্তিঙ্ক, চক্ষু প্রভৃতির কি সদ্ব্যবহার করিয়াছ?তাহার উত্তরে বেগম কি বলিবেন? আমি তখন সেই বাড়ীর একটি মেয়েকে বলিলাম,তুমি যে হস্তপদদ্বারা কোন পরিশ্রম কর না, এজন্য খোদার নিকট কি জওবাবাদিহি (explanation) দিবে?” [স্ত্রীজাতির অবনতি, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ১৮)]

“আমি “স্ত্রীজাতির অবনতি” শীর্ষক প্রবন্ধে ভগিনীদিগকে জানাইয়াছি যে, আমাদের একটা রোগ আছে-‘দাসত্ব’।” [অর্দ্ধাঙ্গী, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২৫)]

শিক্ষার আরেকটি বড় উদ্দেশ্য হলো,কুসংস্কার,শিরক-বিদায়াত দূর করা। তিনি তাঁর সময়ের সমাজের নানা কুসংস্কার ও ভুল চিন্তাধারার সমালোচনা করেছেন। অন্য ধর্মের অনুপ্রবেশ থেকে নিজ ধর্মকে রক্ষা করতে গিয়ে অশিক্ষিত, অর্ধ-শিক্ষিত ধর্মীয় সামাজিক নেতাদের সমালোচনা করেছেন।ইসলামের প্রকৃত চিন্তা-চেতনা ও উদার শিক্ষাকে তুলে ধরতে চেয়েছেন।তাঁর অগ্রন্থিত প্রবন্ধ “৭০০ স্কুলের দেশের” ২৪৩ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত করেছেন,বড় পীরের মুরিদ হলে, মহররমের দিন বিবীর নামে রোযা রাখলে তার নামাজের দরকার নেই।কোরান শরীফের মানে পরলে বা বুঝতে চাইলে ঈমান যায়, বসন্ত রোগ দেখা দিলে শীতলা দেবীর পূজা করতে হয় ইত্যাদি।শিক্ষার ব্যাপকতর উদ্দেশ্যের মাঝে রয়েছে,পুরুষদের পাশাপাশি চলার গুণ অর্জনতা সে আধ্যাত্মিক জগতে হোক কি সাংসারিক জীবনে।অনেক ধর্মহীন লোকও দ্বীনদার স্ত্রীর পরশে শুধরে গেছেন।আবার যেহেতু মাতাই আমাদের প্রথম, প্রধান ও প্রকৃত শিক্ষয়িত্রী, তাই সন্তানপালনের জন্য বিদ্যা চাই।তবেই তাদের সন্তান-সন্ততি হবে হযরত ওমর ফারুক, হযরত ফাতেমা জোহরার মতো।এ বিষয়টি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পুরোপুরি উপেক্ষিত।এ ব্যাপারে তাঁর রচনা সাক্ষ্য দেয়,

“পুরুষদের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে-একই। তাঁহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা, আমাদের লক্ষ্যও তাহাই। শিশুর জন্য পিতামাতা-উভয়েরই সমান দরকার। কি আধ্যাত্মিক জগতে, কি সাংসারিক জীবনের পথে-সর্ব্বত্র আমরা যাহাতে তাঁহাদের পাশাপাশি চলিতে পারি, আমাদের এরূপ গুণের আবশ্যক। প্রথমতঃ উন্নতির পথে তাঁহারা দ্রুতবেগে অগ্রসর হইলেন-আমরা পশ্চাতে পড়িয়া রহিলাম। এখন তাঁহারা উন্নতিরাজ্যে গিয়া দেখিতেছেন সেখানে তাঁহাদের সঙ্গিনী নাই বলিয়া তাঁহারা একাকী হইয়া আছেন!” [স্ত্রীজাতির অবনতি, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২২)]

“পরস্পরে একতা থাকাও একান্ত আবশ্যক। কিন্তু এই ঐক্য যেন সত্যের উপর স্থাপিত হয়। একতার মূলে একটা মহৎ গুণ থাকা আবশ্যক।”[সৌরজগৎ, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ১০১)]

“উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত ভদ্রলোকের ঘরে এখন “এম এ পাশ” বউ না হলে আলো হয় না। কিন্তু এজন্যে সে বেচারাদের গালাগালি না দিয়ে বরং যাতে তাঁরা আমাদের হাতছাড়া না হন, তারই ব্যবস্থা করতে হবে। আমার আরো জানা আছে যে, অনেক বিকৃত-মস্তিষ্ক কি আধ্যাত্মিক জগতে, কি সাংসারিক জীবনের পথে-সর্ব্বত্র উপযুক্তা বিদুষী ভার্যার হাতে পড়ে শুধরে গিয়ে চমৎকার পাকা মুসুল্লী হয়েছেন।”[ধ্বংসের পথে বঙ্গীয় মুসলিম,অগ্রন্থিত প্রবন্ধ,(রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২৪৯)]

“অনেকে বলেন, স্ত্রীলোকদের উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নাই। মেয়ে চর্ব্ব্য, চোষ্য রাঁধিতে পারে, বিবিধ প্রকার সেলাই করিতে পারে, দুই চারি খানা উপন্যাস পাঠ করিতে পারে, ইহাই যথেষ্ট। আর বেশী আবশ্যই নাই। কিন্তু ডাক্তার বলেন যে আবশ্যক আছে, যেহেতু মাতার দোষ গুণ লইয়া পুত্রগণ ধরাধামে কণ্ঠস্থ বিদ্যার জোরে এফ, এ, বি, এ, পাশ হয় বটে; কিন্তু বালকের মনটা তাহার মাতার সহিত রান্নাঘরেই ঘুরিতে থাকে! তাহাদের বিদ্যাপরীক্ষায় এ কথার সত্যতার উপলব্ধি হইতে পারে।”[অর্দ্ধাঙ্গী, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২৮)]

“সন্তানপালন।-ইহা সর্ব্বাপেক্ষা গুরুতর ব্যাপার। সন্তানপালনের সঙ্গে সঙ্গেই সন্তানের শিক্ষা হইয়া থাকে। একজন ডাক্তার বলিয়াছেন যে, “মাতা হইবার পূর্ব্বেই সন্তানপালন শিক্ষা করা উচিত। মাতৃকর্ত্তব্য অবগত না হইয়া যেন কেহ মাতা না হয়।” যে বেচারীকে ত্রয়োদশবর্ষ বয়ঃক্রমে মাতা, ছাব্বিশ বৎসর বয়সে মাতামহী এবং চল্লিশ বৎসরে প্রমাতামহী হইতে হয়, সে মাতৃজীবনের কর্ত্তব্য কখন শিখিবে?…তার রোগ, দোষ, গুণ, সংস্কার সকল বিষয়েরই উত্তরাধিকারী হয়। ইতিহাসে যত মহৎ লোকের নাম শুনা যায়, তাঁহারা প্রায় সকলেই সুমাতার পুত্র ছিলেন। অবশ্য অনেক স্থলে সুমাতার কুপুত্র অথবা কুমাতারও সুপুত্র হয়, বিশেষ কোন কারণে ওরূপ হয়। স্বভাবতঃ দেখা যায় আতার গাছে আতাই ফলে, জাম ফলে না। শিশু স্বভাবতঃ মাতাকে সর্ব্বাপেক্ষা অধিক ভালবাসে, তাঁহার কথা সহজে বিশ্বাস করে। মাতার প্রতিকার্য্য, প্রতিকণা শিশু অনুকরণ করিয়া থাকে। প্রতি ফোঁটা দুগ্ধের সহিত মাতার মনোগত ভাব শিশুর মনে প্রবেশ করে। …মাতা ইচ্ছা করিলে শিশু-হৃদয়ের বৃত্তিগুলি সযত্নে রা করিয়া তাহাকে তেজস্বী, সাহসী, বীর, ধীর সবই করিতে পারে। অনেক মাতা শিশুকে মিথ্যা বলিতে ও সত্য গোপন করিতে শিক্ষা দেয়, ভবিষ্যতে সেই পুত্রগণ ঠগ, জুয়াচোর হয়। অযোগ্য মাতা অকারণে প্রহার করিয়া শিশুর হৃদয় নিস্তেজ (spirit low) করে, ভবিষ্যতে তাহারা স্বেতাঙ্গের অর্দ্ধচন্দ্র ও সবুট পদাঘাতা নীরবে-অকেশে সহ্য করে। কোন মজুরের পৃষ্ঠে জনৈক গৌরাঙ্গ নূতন পাদুকা ভাঙ্গিয়া ভগ্ন জুতার মূল্য আদায় না করায় সেই কূলি, “নৌতুন জুতা মারলো-দামডী লইল না” বলিয়া সাহেবের প্রশংসা করিয়াছিল! বলা বাহুল্য যে, অনেক “ভদ্রলোকের” অবস্থাও তদ্রূপ হইয়া থাকে।…অতএব সন্তানপালনের নিমিত্ত বিদ্যা বুদ্ধি চাই, যেহেতু মাতাই আমাদের প্রথম, প্রধান ও প্রকৃত শিক্ষয়িত্রী। হৃষ্টপুষ্ট বলিষ্ঠ পুত্র লাভ করিতে হইলে প্রথমে মাতার স্বাস্থ্যের উন্নতি করিতে হইবে।”[সুগৃহিণী, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ৩৮)]

“আমি বলি, সুগৃহিণী হওয়ার নিমিত্তই সুশিক্ষা (Mental culture) আবশ্যক।এই যে গৃহিণীদের ঘরকান্নার দৈনিক কার্য্যগুলি, ইহা সুচারুরূপে সম্পাদন করিবার জন্যও ত বিশেষ জ্ঞান বুদ্ধির প্রয়োজন। চিন্তা করিলে দেখা যায় যে, প্রকৃতপক্ষে তাঁহারাই সমাজের হর্ত্রী কর্ত্রী ও বিধাত্রী, তাঁহারাই সমাজের গৃহলক্ষ্মী, ভগিনী এবং জননী।ঘরকন্নার কাজগুলি প্রধানতঃ এই-

(ক) গৃহ এবং গৃহসামগ্রী পরিস্কার ও সুন্দররূপে সাজাইয়া রাখা।
(খ) পরিমিত ব্যয়ে সুচারুরূপে গৃহস্থালী সম্পন্ন করা।
(গ) রন্ধন ও পরিবেশন।
(ঘ) সূচিকর্ম্ম।
(ঙ) পরিজনদিগকে যত্ন করা।
(চ) সন্তানপালন করা।[সুগৃহিণী, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ৩৩)]

“ডাক্তার ভারতচন্দ্র বলেছেন, “মায়ের কর্তব্য না শিখে কেউ যেন মা না হয়।                               ” [শিশুপালন, মতিচূর, দ্বিতীয় খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী, পৃষ্ঠাঃ ১৬২)]

“সুতরাং রন্ধনপ্রণালীর সঙ্গে সঙ্গেই গৃহিণীর ডাক্তারী ও (Chemistry) রসায়ন বিষয়ক সাধারণ জ্ঞান আবশ্যক। [সুগৃহিণী, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী, পৃষ্ঠাঃ ৩৬)]

“তবেই দেখা যায়, এক রন্ধন শিক্ষা করিতে যাইয়া আমাদিগকে উদি্‌ভদবিজ্ঞান, রসায়ন ও উত্তাপ তত্ত্ব (Horticulture, Chemistry ও Theory of heat) শিখিতে হয়!!” [সুগৃহিণী, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ৩৬)]

নারীদের শিক্ষিত করার জন্য প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে।নারীদের উপযুক্ত পরিমাণে পৃথক স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি প্রয়োজন।আরো প্রয়োজন অধিক সংখ্যক যোগ্য শিক্ষয়িত্রীর। “আমাদের শয়নকক্ষে যেমন সূর্য্যালোক প্রবেশ করে না, তদ্রূপ মনোকক্ষেও জ্ঞানের আলোক প্রবেশ করিতে পায় না। যেহেতু আমাদের উপযুক্ত স্কুল কলেজ একপ্রকার নাই। পুরুষ যত ইচ্ছা অধ্যয়ন করিতে পারেন-কিন্তু আমাদের নিমিত্ত জ্ঞানরূপ সুধাভাণ্ডারের দ্বার কখনও সম্পূর্ণ রূপে উন্মুক্ত হইবে কি? যদি কোন উদারচেতা মহাত্মা দয়া করিয়া আমাদের হাত ধরিয়া তুলিতে অগ্রসর হন, তাহা হইলে সহস্র জনে বাধা বিঘ্ন উপস্থিত করেন।” [স্ত্রীজাতির অবনতি, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী, পৃষ্ঠাঃ ১৮)]

“পুত্রদের বিদ্যালয়ের সংখ্যা করা যায় না, বালিকাদের বিদ্যালয় সংখ্যায় পাওয়াই যায় না! সে স্থলে ভ্রাতা “শমস-উল-ওলামা” সে স্থলে ভগিনী “নজম-উল-ওলামা” হইয়াছেন কি? তাঁহাদের অন্তঃপুর গগণে অসংখ্য “নজমন্নেসা” “শমসন্নেসা” শোভা পাইতেছেন বটে। কিন্তু আমরা সাহিত্য-গগনে “নজম-উল-ওলামা” দেখিতে চাই!”[অর্দ্ধাঙ্গী, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ৩০)]

“তাই বলি অলঙ্কারের টাকা দ্বারা জেনানা স্কুলের আয়োজন করা হউক। কিন্তু ভগ্নীগণ যে স্কুল লাভের জন্য সহজে গহনা ত্যাগ করিবেন, এরুপ ভরসা হয় না।”[বোরকা, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ৪৫)]

“এখন যদি আমি বলি যে, গৃহিণীদের জন্য একটা “জেনানা মেডিকেল কলেজ” চাই, তবে বোধ হয় অসঙ্গত হইবে না। ”[সুগৃহিণী, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ৩৯)]

“ফলকথা উপরোক্ত দুরবস্থার একমাত্র ঔষধ- একটি আদর্শ মুসলিম বালিকা বিদ্যালয়….. আদর্শ মুসলিম বালিকা বিদ্যালয়ে আদর্শ মুসলিম নারী গঠিত হবে – যাদের সন্তান-সন্ততি হবে হযরত ওমর ফারুক, হযরত ফাতেমা জোহরার মতো।”[ধ্বংসের পথে বঙ্গীয় মুসলিম,অগ্রন্থিত প্রবন্ধ,(রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২৪৯)]

“যাহা হউক। পর্দা কিন্তু শিক্ষার পথে কাঁটা হইয়া দাঁড়ায় নাই । এখন আমাদের শিক্ষয়িত্রীর অভাব ।এই অভাবটি পূরণ হইলে এবং স্বতন্ত্র স্কুল কলেজ হইলে যথাবিধি পর্দা রক্ষা করিয়াও উচ্চশিক্ষা লাভ হইতে পারে । প্রয়োজনীয় পর্দা কম করিয়া কোন মুসলমানই বোধ হয় শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রসর হইবেন না ।আশা করি, এখন আমাদের উচ্চশিক্ষা-প্রাপ্তা ভগিনীগণ বুঝিতে পারিয়াছেন যে বোরকা মোটের উপর মন্দ নহে ।”[বোরকা, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ৪৬)]

বেগম রোকেয়া নিজেও নারীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ।তিনি মাত্র ৫ জন ছাত্রী নিয়ে ভাগলপুরে প্রথম সাখাওয়াত হোসেন মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের ভিত্তিপত্তন করেন। কিন্তু সেখানে তিনি বেশিদিন থাকতে পারেননি। ১৯১১ সালের ১৬ কলকাতার একটি ছোট্ট বাড়িতে আটজন ছাত্রী নিয়ে নতুন করে স্কুল আরম্ভ করেন।তিনি নারী শিক্ষার প্রতি বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে সমাজের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।তাঁর  লেখনিতে প্রকাশিত হয়েছে,

অশিক্ষিত স্ত্রীলোকের শত দোষ সমাজ অম্লানবদনে মাফ করিয়া থাকে, কিন্তু সামান্য শিক্ষাপ্রাপ্তা মহিলা দোষ না করিলেও সমাজ কোন কল্পিত দোষ শতগুণ বাড়াইয়া সে বেচারীর ঐ শিক্ষারঘাড়ে চাপাইয়া দেয় এবং শত কণ্ঠে সমস্বরে বলিয়া থাকে স্ত্রীশিক্ষাকে নমস্কার!” [স্ত্রীজাতির অবনতি, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ১৮)]

নারী অধিকারের বিষয়ে বেগম রোকেয়ার বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার। তা হলো, মহানবী (সাঃ) কে নারী জাতির প্রতি দায়িত্ব পালনে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা।তাঁর রচনায় জবাবদিহিতার প্রসঙ্গটিও প্রতিভাত হয়।“পয়গম্বরের ইতিহাসে শুনা যায়, জগতে যখনই মানুষ বেশি অত্যাচার অনাচার করিয়াছে, তখনই এক-একজন পয়গম্বর আসিয়া দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করিয়াছেন । আরবে স্ত্রী জাতির প্রতি অধিক অত্যাচার হইতেছিল; আরববাসিগণ কন্যা হত্যা করিতেছিল। তখন হযরত মুহাম্মদ কন্যাকুলের রক্ষকস্বরূপ দণ্ডায়মান হইয়াছিলেন । তিনি কেবল বিবিধ ব্যবস্থা দিয়েই ক্ষান্ত থাকেন নাই, স্বয়ং কন্যা পালন করিয়া আদর্শ দেখাইয়াছেন । তাহার জীবন ফাতেমাময় করিয়া দেখাইয়াছেন- কন্যা কিরূপ আদরণীয়া । সে আদর, সে স্নেহ জগতে অতুল ।আহা! তিনি নাই বলিয়া আমাদের এ দুর্দশা ।” [অর্দ্ধাঙ্গী, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ৩০)]

“যদি ধর্মগুরু মুহাম্মদ (দঃ) আপনাদের হিসাব নিকাশ লয়েন যে ‘তোমরা কন্যার প্রতি কিরূপ ন্যায় ব্যবহার করিয়াছ ? তবে আপনারা কি বলিবেন? চাই!”[অর্দ্ধাঙ্গী, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ৩০)]

রাণী ভিখারিণী প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, “ইসলামই নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার দান করেছে।কন্যার পৈত্রিক সম্পত্তিতে অধিকার, স্ত্রীর স্বামীর সম্পত্তিতে অধিকার, মোহরানার অধিকার,তালাকের অধিকার এবং নিজের সম্পত্তি স্বচ্ছন্দে ভোগ করবার অধিকার রয়েছে।”[রাণী ভিখারিণী,অগ্রন্থিত প্রবন্ধ,(রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২৩৪)]

তাঁর মতে,“এখন মুসলমান সমাজে প্রবেশ করা যাউক। মুসলমানের মতে আমরা পুরুষের “অর্দ্ধেক”, অর্থাৎ দুইজন নারী একজন নরের সমতুল্য। অথবা দুইটি ভ্রাতা ও একটি ভগিনী একত্র হইলে আমরা “আড়াই জন” হই! আপনারা “মুহম্মদীয় আইনে” দেখিতে পাইবেন যে বিধান আছে, পৈতৃক সম্পত্তিতে কন্যা পুত্রের অর্দ্ধেক ভাগ পাইবে। এ নিয়মটি কিন্তু পুস্তকেই সীমাবদ্ধ। যদি আপনারা একটু পরিশ্রম স্বীকার করিয়া কোন ধনবান মুসলমানের সম্পত্তি বিভাগ করা দেখেন, কিম্বা জমীদারী পরিদর্শন করিতে যান, তবে দেখিবেন কার্য্যতঃ কন্যার ভাগে শূন্য (০) কিংবা যৎসামান্য পড়িতেছে।আমি এখন অপার্থিব সম্পত্তির কথা বলিব। পিতার স্নেহ, যত্ন ইত্যাদি অপার্থিব সম্পত্তি। এখানেও পক্ষপাতিত্ত্বের মাত্রা বেশী। ঐ যত্ন, স্নেহ, হিতৈষিতার অর্দ্ধেকই আমরা পাই কই? যিনি পুত্রের সুশিক্ষার জন্য চারি জন শিক্ষক নিযুক্ত করেন, তিনি কন্যার জন্য দুই জন শিক্ষয়ত্রী নিযুক্ত করেন কি? যেখানে পুত্র তিনটা (বি, এ, পর্য্যন্ত) পাশ করে, সেখানে কন্যা দেড়টা পাশ (এন্ট্রাসি পাশ ও এফ, এ, ফেল) করে কি?চাই!”[অর্দ্ধাঙ্গী, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২৯-৩০)]

তিনি নারীর আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধিকারের কথা তুলে ধরেছেন। যেমন,ইসলামে স্বেচ্ছাকৃত সম্মতি ছাড়া কোন নারীর বিয়ে হতে পারে না।পরোক্ষভাবে এই সম্মতি দানের ব্যবস্থার মাধ্যমে বাল্যবিবাহ রহিত করা হয়েছে।নারীর পুনর্বিবাহের নিয়ম আছে। বিধবার উপর কোন অত্যাচার নাই।তার বসন, ভূষণ, আহার সম্বন্ধে কোন বাঁধাধরা নিয়ম নেই।”[রাণী ভিখারিণী,অগ্রন্থিত প্রবন্ধ,(রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২৩৪)]

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, “নারীর অধিকার” নামক ক্ষুদ্র প্রবন্ধটি তিনি মৃত্যুর আগেরদিন রাতে লেখেন।নারীর রাজনৈতিক অধিকারের ব্যাপারে অধিকতর সচেতন হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

“এখন স্ত্রীলোকেরা ভোট দানের অধিকার প্রাপ্ত হয়েছে, কিন্তু মুসলিম মহিলাগণ এ অধিকার সদ্ব্যবহারে স্বেচ্ছায় বঞ্চিতা রহিয়াছেন।গত ইলেকশনের সময় দেখা গেল কলিকাতায় মাত্র ৪ জন স্ত্রীলোক ভোট দিয়াছে।”[বঙ্গীয় নারী- শিক্ষা সমিতি,,অগ্রন্থিত প্রবন্ধ,(রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২৩০)]

নারীদের যাবতীয় সমস্যার ক্ষেত্রে নারীরাই বেশী ওয়াকিবহাল।নিজেদের সমস্যা সমাধান ও অধিকার রক্ষার জন্য তাই সমিতি গঠনের প্রয়োজনীয়তা তিনি তুলে ধরেন।

“তোমরা নিজেদের দাবী -দাওয়া রক্ষা করিবার জন্য নিজেরাই বিবিধ সমিতি গঠন কর।”[সুবেহ সাদেক, অগ্রন্থিত প্রবন্ধ, (রোকেয়া-রচনাবলী,পৃষ্ঠাঃ ২৪২)]

১৯১৬ সালে বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠা করেন আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম বা মুসলিম মহিলা সমিতি।

নারীর শিক্ষা ও অধিকার বিষয়ে নিয়ত চিন্তাশীল মনীষী বেগম রোকেয়া পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন অনেক আগে।তাঁর দর্শন থেকে সমাজের বর্তমান অবস্থান বহুদূরে।আজকে গৃহে কন্যা, জায়া ও জননীরা আছেন।কিন্তু ঘর ও সমাজকে আলো করা সেই আদর্শ ভগিণী, গৃহিণী ও মাতারা নেই।নেই আদর্শ ভগিণী, গৃহিণী ও মাতা তৈরি করার উপযুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষয়িত্রী।লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভুলে নারীজাতি পরাণুকরণে মত্ত।আলকুরআনভিত্তিক সুশিক্ষাই সবার অধিকার রক্ষার সুরক্ষাকবয, ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির মূল চাবিকাঠি –এটিই মহীয়সী বেগম রোকেয়ার উপলব্ধি।

 লেখকঃ কবি, সাহিত্যিক ও সহকারী অধ্যাপক, রাজশাহী সরকারী কলেজ

আরও পড়ুন