আমার পরিচিত একজন মুক্তিযোদ্ধার কথা

সামিন বিনতে ইয়াসির

বইয়ের পাতায় পড়ে কিংবা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতার যে পরিচয় পেয়েছিলাম তাতে ধারণা হয়েছিল,মুক্তিযোদ্ধারা হয়ত অনেক দূরের কেউ যাদের ধরা-ছোঁয়া যায় না । কিন্তু আমার খুব কাছের একজন মানুষ ,যাকে আমি প্রতিদিন দেখি ,যার সাথে হাসি-ঠাট্টা ,মজা করে সময় কাটাই সেই দাদা ,মিজানুর রহমান বাচ্চু যে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কথা জানতে পেরে আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যাই । আসলে ১৯৭১ এ দেশের পরিস্থিতি ই এমন দাঁড়িয়েছিল যে, পাকিস্তান সেনাদের হাত থেকে নিজের প্রিয় জন্মভূমিকে বাঁচানোর জন্য অনেক সাধারণ মানুষই হয়ে উঠেছিল এক এক জন বীর মুক্তিযাদ্ধা । দাদার মুখ থেকে শোনা সেই গল্পই আজ আমি তোমাদের জানাবো।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চে ঢাকায় গণহত্যা চালানোর ২ দিন পর ২৭ শে মার্চে সকাল ৯টার দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রবেশের চেষ্টা করে। পঞ্চবটি -মাসদাইর কবরস্থান ও চাষাড়া রেললাইন দিয়ে শহরে ঢোকার চেষ্টা করে তারা প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের দ্বারা প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। চাষাড়ার চানমারি এলাকায় যারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল,তাদের মধ্যে আমার দাদাও ছিলেন একজন। 

পাকিস্তানি বাহিনী যেন ট্যাংক নিয়ে শহরে ঢুকতে না পারে সেজন্য উনারা ট্রেনের বগি এনে দাঁড় করিয়ে রাখেন চাষাড়া রেললাইনে। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী ট্যাংকের গোলার সাহায্যে ট্রেনের বগি উড়িয়ে দেয় এবং ২৯শে মার্চে সোমবার নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে ব্যাপক হত্যাকান্ড চালায় । তখন দাদা সহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য কর্মীরা শহরে টিকতে না পেরে শীতলক্ষ্যার অপর পাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেন।

 উন্নতমানের প্রশিক্ষণ ছাড়া পাকিস্তানি বাহিনীর কবল থেকে প্রিয় শহরকে মুক্ত করা সম্ভব নয় এটা অনুধাবন করতে পেরে তিনি সিদ্ধান্ত নেন ভারতে যাওয়ার ।

সাথে কোন সঙ্গী না পাওয়ায় একাই ১৩ই এপ্রিল আগরতলার উদ্দেশ্যে নারায়ণগঞ্জ ত্যাগ করেন তিনি। দুই দিন দুই রাত অবিরাম পথ চলার পর কসবার সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। প্রথমে তিনি মেজর খালেদ মোশাররফের অধীনে পরিচালিত “মেলাঘর ক্যাম্পে “ ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর ৯নং সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলের অধীনে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য উত্তর চব্বিশ পরগণার বশিরহাটে অবস্থিত বাগুন্ডি ক্যাম্পে যোগ দেন। 

সেখানে ১ মাসের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর বিস্ফোরকের উপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য ব্যারাকপুরে যান। সেখানে তিনি “লিম্পেট মাইন” যা রেললাইন ,ব্রিজ, কালভার্ট ,সেতু এবং জাহাজ ধ্বংসের জন্য ব্যবহার করা হতো, সেই মাইন সংযোজনের উপর প্রশিক্ষণ নেন। 

 

পরবর্তীতে তিনি বাগুন্ডী প্রশিক্ষণ শিবিরে আগত নেভাল ফোর্সের নবীন নৌ-সেনাদের এই প্রশিক্ষণ দেন। এছাড়াও তিনি পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাগুন্ডি ক্যাম্পে আসা অনেক বাঙালিকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়েছেন যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন – নাসিম ওসমান, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, শেখ জাকির, শেখ হেলাল , শেখ মীর্জা, শাহ আলম সহ আরও অনেকে।

নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে তিনি ৯০ জন সেনা, ই.পি.আর, পুলিশ, আনসার সদস্য এবং ৪২ জন মুক্তিযোদ্ধাসহ মোট ১৩২ জনের কমান্ডার হিসেবে খুলনায় যান। মংলা পোর্ট সংলগ্ন বাজুয়া বাজারে তারা স্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণ করেন এবং সেখান থেকে যুদ্ধের শেষ দিন ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত আশেপাশের এলাকার বহু যুদ্ধে অংশ নেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, বাগুন্ডী প্রশিক্ষণ ক্যাম্প যে জমিদারের জায়গায় গড়ে উঠেছিল সেই পিয়ারি লাল পরবর্তীতে নিজ খরচে সেই জায়গায় মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করেন। ঐ স্মৃতিফলকের একপাশের দেয়ালে ৩ নম্বরে খোদাই করা আছে আমার দাদা মিজানুর রহমান বাচ্চুর নাম । 

এমন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাতনি হিসেবে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি এবং সেই সাথে কৃতজ্ঞতা জানাই দাদার মত আরও অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাদের যাদের সাহসিকতার জন্যই আজ আমি স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীন ভাবে বসবাস করতে পারছি।

সামিন বিনতে ইয়াসির নয় বছরের শিশু!

আরও পড়ুন