শিশুমননে মুক্তিযুদ্ধ

আরণ্যকে শবনম

স্বাধীনতা,প্রিয় স্বাধীনতা।মুক্তিযুদ্ধ,মুক্তিযোদ্ধার বিপ্লবী সাহসী জীবন।স্বাধীনতা সংগ্রামের পঁচিশ বছর পর আমার জন্ম।যখন একটু আধটু কথা বলতে শিখেছি,গল্প শোনার বায়না করতে শিখেছি,নানুভাইয়ের  কাছে শুনতাম সেসব কালজয়ী দিনগুলোর কথা।তারপর,আদর্শ লিপির বর্ণপরিচয় যখন হলো,খুউব তাড়াতাড়ি বাংলা পড়া রপ্ত করে ফেললাম,কল্পনা’রা রূপকথা হতে শুরু করলো।খুউব মনে আছে,বাংলা এতোটাই সুন্দর করে পড়া শিখেছিলাম,বানান করে আর পড়তে হয়নি বেশিদিন,দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা বই দিয়ে পাঠ অভ্যেস শুরু করেছিলাম।তখন প্রতিটা বাংলা বইয়ে একজন বীরমুক্তিযোক্তার উপর লেখা থাকতো।যেমন-বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান,বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন,নূর মোহাম্মদ শেখ,মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর, হামিদুর রহমান এমন সব সাহসী যোদ্ধাদের আত্মদানের কথা,সাথে বইয়ে গেরিলা যুদ্ধের ছবি।কেমন শিহরণ জাগতো ছোট্ট বুকে,দেশপ্রেমের অনুভূতি আচ্ছন্ন করে রাখতো সারাদিন।অনেক দিন রাতে দুঃস্বপ্ন ও দেখতাম,অবচেতন মনের ভয়,যুদ্ধ হচ্ছে,মেয়েরা আশ্রয় নিচ্ছে,মাথাসমান পানিতে ডুবে লুকিয়ে থাকা।তবুও, মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে ভালোবাসতাম।দেশটাকে গড়ার স্বপ্ন দেখতাম।ছোট্ট মনে ছিলো না অশুচি, আবিলতা, কুটিলতা।মুক্তিযুদ্ধের অমর নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে মনে হতো এক ক্যারিশমেটিক লিডার।কেমন সাহসী,অকুতোভয়। এ শ্রদ্ধা, সম্মানবোধের পিছনে রাজনৈতিক স্বার্থপরতা ছিলো না।আমার নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হতো,এমন বীরের জাতি হয়ে জন্মেছি। যাদের এমন সাহসী অতীত রয়েছে,আত্মত্যাগ রয়েছে,তারা একদিন বিশ্ব জয় করবেই।আম্মুর বদৌলতে স্কুলের লাইব্রেরি  থেকে বই এনে পড়তাম,তৃতীয় -চতুর্থ শ্রেনিতে থাকতেই সপ্তম,অষ্টম শ্রেনির বাংলা বই পড়ে ফেলেছিলাম।আর তখন এতো বই সহজপ্রাপ্যও ছিলো না।আম্মা আমাকে পড়তে দিলেন,”প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার”,মাস্টার দি সূর্যসেন”,”এ কে ফজলুল হক” এর জীবনী।প্রীতিলতার সাহসিকতা আমার চিন্তায় বেশ দাগ কেটেছিলো।আর ফজলুল হকের দৃঢ় চরিত্র,বিজ্ঞতা তাঁকে আমার প্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিলো।সূর্যসেনের চট্রগ্রাম অস্ত্রাগার দখল,ক্ষুদিরামের বলিষ্ঠতা সবকিছুর ফলশ্রুতিতে আজ আমরা স্বাধীন জাতি।এমন সাহসী,দেশপ্রেমী মানুষের দেশ বাংলাদেশ।স্কুলে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ” যেমন খুশি তেমন সাজো” প্রতিযোগিতায় কিশোর-কিশোরীরা গেরিলা সাজতো।আমি আর পিচ্চি ভাই মিলে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতাম।দেশ থেকে বর্গী তাড়ানোই ছিলো আমাদের লক্ষ্য।কেমন আনন্দময় ছিলো সেইসব দিনগুলি,সেই স্মৃতিগুলো।আমিও হয়তো গল্প করবো আমার অনাগত সন্তান,নাতি-নাতনিদের কাছে।তারাও বিমুগ্ধ হয়ে শুনবে,সাহসে বলীয়ান হবে নতুন উদ্দ্যমে দেশ গড়ার কারিগর হবে একদিন।শিশুমননে ছড়িয়ে পড়বে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা,মুক্তবিহঙ্গ হয়ে শিশুরা বিচরণ করবে স্বাধীন দেশে।স্বাধীনতার সুখ আস্বাদ করবে তারা।দেশের সুরক্ষায় অতন্দ্র প্রহরী হয়ে উঠবে।দেশের স্বার্থকে কারো তুচ্ছ স্বার্থে নষ্ট হতে দেবে না।ওরাই সম্ভাবনার আগামী,ক্ষুদে সেনাদের কুজকাওয়াজের পদধ্বনি শুনতে পাই।
আরণ্যকে শবনম কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন