ক্যান্সারজয়ী নিশাত

নুসাইবা ইয়াসমিন

১৮ জানুয়ারি ২০১৭ নিশাতের জীবনে আজকের দিনটা সবচেয়ে আনন্দের। গত ৫ বছর ধরে মনে মনে যাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছে দুই পরিবারের সম্মতিতে আজ তার সাথে নিশাতের বিয়ে। রাহাতের সাথে তার পরিচয়টা অনেক দিনের। দু বছর আগে রাহাত মাস্টারস করতে অস্ট্রেলিয়া যাবার আগে তাদের এনগেজমেন্ট হয়। ২০ দিনের ছুটিতে রাহাত ঢাকায় এসেছে বিয়ে করবে বলে। বিয়ের পর কাগজ পত্র সব গুছাতে পারলেই নিশাতকে সে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যাবে। নিশাতের জীবনে এখন শুধুই স্বপ্ন। কবে সব গুছগাছ করে পারি দিতে পারবে রাহাতের কাছে। শুরু হবে স্বপ্নের মতো রঙিন পথচলা। দেখতে দেখতে রাহাতের যাবার সময় চলে এলো। ‘দেখো, খুব জলদিই আমি তোমার কাছে চলে আসবো’, বিদায়ের সময় দুচোখ ভরা জল নিয়ে নিশাত কথা দিলো রাহাতকে। রাহাত যাবার পর থেকেই খুব ব্যস্ত নিশাত। এত এত ডকুমেন্ট জমা দিতে হবে এম্বাসীতে কিন্তু শরীরটা কিছু দিন থেকে ভালো যাচ্ছে না। ডাক্তার দেখাতেই জরুরি ভিত্তিতে কিছু টেস্ট দিলেন তিনি।

২৬ শে ফেব্রুয়ারি, কাল এম্বাসীতে পেপার্স জমা দেবার কথা। আপাতত কোন কিছু নিয়েই ভাববার সময় নেই। অফিসেও মন বসছে না। শুধুই অস্ট্রেলিয়াতে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন। অপেক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না। সেদিন সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার পর পরই ছোট ভাই টেস্টের রিপোর্ট হাতে নিয়ে বাসায় ঢুকলো। মুহূর্তের মাঝেই সব স্বপ্নই খুব নগন্য মনে হতে লাগলো। ইনভেসিভ ডাকটাল কারছিনোমা, যা কিনা বেস্ট ক্যান্সার নামে পরিচিত। এক শোকের ছায়া নেমে এলো হাসিখুশি সেই পরিবারটিতে। ক্যান্সার শব্দটার মাঝেই কেমন যেন এক মৃত্যু ভয় লুকিয়ে থাকে।তবে রিপোর্ট দেখে ডাক্তার জানালেন স্টেজ 2, চিকিৎসা করাতে পারলে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব। শুরু হলো জীবনের নতুন এক অধ্যায়। একের পর এক সার্জারি, কেমোথেরাপি আর নিত্যনতুন শারিরীক যন্ত্রণা। ওদিকে রাহাতকে দিন দিন অচেনা লাগছে নিশাতের। নিশাতের ক্যান্সারটা সহজভাবে নিতে পারেনি রাহাত। নিশাতও দিন দিন কেমন যেন গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। কেমোথেরাপি তার সব সৌন্দর্য কেরে নিয়েছে। তার ঘন কালো চুল এখন আর নেই। আই ভুরুটাও পরে গিয়েছে। এই কুৎসিত চেহারা স্বামীকে দেখাতে ইচ্ছে হয় না তার। দূরত্ব যেন বেরেই চলেছে তবুও নিশাতের দৃঢ় বিশ্বাস, রাহাত তাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। প্রতি মূহুর্তেই রাহাতকে নিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে নিশাত।

জানুয়ারি ২০১৮, ডক্টর জানালেন নিশাত এখন সম্পূর্ণ সুস্থ, ফিরে যেতে পারবে নিয়মিত জীবনে। এক নতুন জীবন ফিরে পেল নিশাত। সমস্ত দুঃখ ভুলে ফোন দিল রাহাতকে, ‌‌’জানো রাহাত,এখন আর কেউ আটকাতে পারবে না, আর মাত্র কয়েকটা দিন। সব ছেড়ে চলে আসবো তোমার কাছে।’ উত্তরে শুনতে পেল,’সরি নিশাত, আমাদের সম্পর্কটা আমি আর কন্টিনিউ করতে পারছি না। আই মিন সরি।’ আরও একবার সম্পূর্ণ পৃথিবীটা ওলোট পালোট হয়ে গেল নিশাতের। ঠিকই তো বলছে রাহাত,তার মত একজন পেশেন্টের সাথে অনিশ্চিত জীবন কে ই বা চাইবে। তার উপর আগের সেই সৌন্দর্যটাও এখন আর নেই। ভালোবাসাতো আর মুখের কথাতেই হয় না। মেনে নিতে কষ্ট হলেও একবারের জন্যও ফিরে তাকায়নি নিশাত। বেঁচে থাকার তেমন কোনো কারণ খুজে পায়নি সেদিন নিশাত শুধু মায়ের একটা কথা বারবার কানে ভাসতে লাগলো ,’আমার আর কিচ্ছু চাই না। শুধু তুমি বেঁচে থাকো মা’। হ্যাঁ, তাকে এখন তার বাবা মার জন্যই বাঁচতে হবে।ক্যান্সার তাকে একটা জিনিস শিখিয়েছে, জীবন যুদ্ধে এগিয়ে যেতে হবে। কোন কিছুতেই হার মানা যাবে না। নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো নিশাত। নিজের জন্য, নিজের ফ্যামিলির জন্য। নিজের ক্যারিয়ারটা এখন গুছিয়ে নিতে হবে। শুরু হলো নতুন স্বপ্ন খোরাক দেয়ার প্রচেষ্টা।

বেশ কিছু বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশীপের অ্যাপ্লাই করলো নিশাত। পজেটিভ রেজাল্টও আসছিল কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এমনকি এমনটাও শুনতে পেল নিশাত বাংলাদেশ থেকে অ্যাপ্লাই করা স্টুডেন্টদের মধ্যে তার সিজিপিএ ই  সবচেয়ে হাই ।  কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে,তাই স্কলারশীপ পাবার সম্ভাবনাও অনেকটা এগিয়ে। নতুন উদ্দাম আর নতুন করে বাঁচা। পুরোনো স্মৃতিগুলো বার বার নাড়া দিয়ে উঠলেও সেখানে পড়ে থাকা যাবে না। জীবন তাকে এমনটা শেখায়নি।

কিন্তু নিশাতের পথ চলাটা সম্ভবত কিছুটা ভিন্ন ছিল। রেগুলার চেকআপের পর হঠাৎ করেই তার ডক্টর একদিন তাকে ফোন দিয়ে জানালেন, ‘নিশাত ইওর ক্যান্সার ইজ ব্যাক’। ভেঙে গেল নতুন করে দেখা স্বপ্নগুলোও। এখন নিশাত আবারও দুঃসহ সেই যন্ত্রণা সহ্য করে যাচ্ছে। কিন্তু সে জানে এই যাত্রাও তাকে থামিয়ে রাখতে পারবে না। তাকে এগিয়ে যেতে হবে অনেক দূর…।

( সত্য ঘটনা অবলম্বনে )

লেখকঃ সাহিত্যিক

আরও পড়ুন