বেকার স্বামীর ক্যারিয়ার গঠনে স্ত্রীর ভূমিকার গুরুত্ব

মোঃ শাহীনুজ্জামান

অর্ধাঙ্গীনি শব্দটার মর্মার্থ সব মেয়েরাই বুঝে কিনা তা আমার জানা নেই। তবে স্ত্রী শব্দটার নিগূঢ় অর্থ একটি মেয়ে তার জীবনের শুরু থেকেই বুঝতে পারে, এতে কারও দ্বিমত থাকার কথা না। আমার ক্ষুদ্র জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সংসারে স্ত্রীর ভুমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা শুধু স্বামীর যত্ন-আত্তি, সন্তান লালন-পালন এসব ক্ষেত্রেই না, স্ত্রীর কর্তব্যের পরিব্যাপ্তি বিশাল। আমাদের সমাজব্যবস্থায় সংসারের হিসাব নিকাশের কোন গরমিল হলে তার দায়ভারও বর্তায় স্ত্রীদের উপর। এই দিকটায় আমার যথেষ্ট দ্বিমত রয়েছে। কারণ সংঘবদ্ধতায় ভুল-ত্রুটি কখনও ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়।

আমাদের সমাজব্যবস্থায় আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হল- স্বামীর কর্মজীবন ও সাফল্য পরিবারের সুখের নিয়ামক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একজন পুরুষ তখনই স্বামী হিসেবে বিবেচ্য হয় যখন তার কর্মময় জীবনটা ভাল হয়। কোন বেকার ছেলেকে সাধারণত কোন মেয়ে তার স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারে না। কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে হিসাবটা সম্পূর্ণই উল্টো। যদিও বা কখনো ভুল করে বা পরিস্থিতির শিকার হয়ে কোন মেয়ে একটা কর্মহীন ছেলেকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়, এ সমাজ তখন তার রুপ পাল্টে নেয়। এরুপ স্বামীর জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা, যা তার নিজস্ব পরিকল্পনা, মেধা সবকিছুকে নিমিষেই নিঃশেষ করে দিতে পারে। আমি দেখেছি কিভাবে একটি মেধাবী ছাত্রের মেধার পরিচয় বিনষ্ট হয়, শুধুমাত্র কর্মহীন অবস্থায় বা ছাত্রজীবনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কারণে। সেই মেধাবী ছাত্রটিও হয়ত পারত তার বন্ধুদের মত সফল হতে, নিজের একটা সম্মানজনক অবস্থান তৈরী করতে। কিন্তু তথাকথিত সমাজব্যবস্থা তাকে বলেছে, তুমি বিয়ে করেছ, এখন তাড়াতাড়ি কিছু করা উচিৎ নয়ত আমরা মানুষের কাছে তোমার পরিচয় দিতে পারছি না। আমার মনে হয় পাঠককুল বুঝতে পেরেছে যে, একটি ছেলের জীবনকে দ্রুত অন্ধকারে ঠেলে দেয়ার জন্যে এই কয়টি শব্দই যথেষ্ট। এই শব্দগুলোর ভয়াবহতা আরও বেড়ে যায় যদি সেগুলো অর্ধাঙ্গীনির কন্ঠস্বর নিঃসৃত হয়।

আশানুরূপ ক্যরিয়ার গঠনের পর বিয়ে করবো এই শব্দটা যদিও সব ছেলেরাই বলে কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে খুব কম ছেলেরাই তা করতে পারে। কারণ আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মাস্টার্স শেষ করতে গেলে একটা ছেলের সম্ভাব্য বয়স ২৫/২৬ পেরিয়ে যায়। এরপর সরকারী চাকুরী জুটাতে তার হাতে থাকে আর মাত্র ৪/৫ বছর। অনেকক্ষেত্রেই এই সময়টা অত্যন্ত স্বল্প হিসেবে বিবেচ্য হয়, কারণ সব সময়ই আশানুরুপ চাকুরীর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় না। তাই খুব কম ছাত্রের পক্ষেই সম্ভব হয় ছাত্রজীবন শেষে অতি অল্প সময়ে ভালো কর্মময় জীবন বেছে নেয়া। এই যদি হয় সাধারণ হিসাব তাহলে বুঝতে নিশ্চয় কঠিন হবেনা যে, ২৫/২৬ বছর বয়সের সদ্য পড়াশুনা শেষ করা একটি ছেলের পক্ষে তার আশানুরুপ কর্মজীবনে প্রবেশ করা কতটা কঠিন, যখন সে বিবাহিত স্ট্যটাস ধারণ করে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ছকে নিজেকে আটকে ফেলতে বাধ্য হয়।

এই অবস্থায় অর্ধাঙ্গীনির গুরুত্বটা অনেক বেশি। অর্ধাঙ্গীনির দৃষ্টিভঙ্গীটা যদি এমন হয় যে, স্বামীর যথার্থ পরিচয় আমার জন্যে, আমার পরিবারের জন্যে, পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে খুবই অর্থবহ, তাহলেই কেবল এই লিখার মুল পয়েন্টটা বেরিয়ে আসবে। শুধুমাত্র এই বিশ্বাসটাই পারে একজন বেকার স্বামীর সফল ক্যারিয়ার গঠনে স্ত্রীর ভূমিকাগুলোকে সামনে আনতে, যার মাধ্যমে বেকার স্বামীটি সমাজে তার নিজস্ব একটি ভালো অবস্থান তৈরী করতে পারে। স্বামীর এমন সফলতার আনন্দ তখন পরিবারের সবাই সানন্দে উপভোগ করতে পারে, যার মুল সার্থকতা স্বামী নির্ধিদায় স্ত্রীকে উৎসর্গ করতে পারবে।

পরিশেষে, আরও একটি বিষয় সমান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, স্বামীর সাফল্যময় কর্মজীবন গঠনে যেমন স্ত্রীর ভুমিকা অনস্বীকার্য তেমনি কোন স্ত্রীও যদি কর্মজীবনে প্রবেশ করতে চায় সেক্ষেত্রেও প্রতিটি স্বামীর কর্তব্য হলো স্ত্রীকে যথাসাধ্য সাহায্য করা।

লেখকঃ গবেষক ও জাপান প্রবাসী বাংলাদেশী

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.