অমোঘ মৃত্যু

রফিকুল ইসলাম

তুমি অজেয়, অনিবার্য,চির বিষ্ময়, দৃঢ় সত্য, তবু ভুলে থাকি সদা।

প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হবে। আল- কুরআন ৩ঃ১৮৫

অনেক সময় সহজ সরল প্রশ্নের উত্তর সাবলীল ভাবে দেয়া বড়ই কঠিন হয়ে যায়। তদ্রুপ, জীবন ও মৃত্যুর পার্থক্য সাদা- কালো, দিবা-রাত্রি, ধনী- গরীবের মত সরল নয়।

মৃত্যু নিয়ে ঠিক কতটুকু গবেষনা হয়েছে জানিনা। কিন্তু যত টুকু জানতে পেরেছি তাহলো ” মানুষের মৃত্যু দু স্তরে হয়ে থাকে, ক্লিনিক্যাল ডেথ ও বায়োলোজিক্যাল ডেথ।ক্লিনিক্যাল ডেথ নিশ্বাস বন্ধ হবার চার থেকে ছয় মিনিট পরে শুরু হয়। আর বায়োলজিক্যাল ডেথ স্তরে হৃদপিণ্ডের ক্রিয়া, শরীরে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যায়, দেহ কোষ ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে এবং চুড়ান্তভাবে মৃত ঘোষণা করা হয়।

আসলে নিশ্বাঃস বন্ধ হোক আর অন্য কোন কারণ ঘটুক আমাদের মাঝ থেকে কোন কিছু একটা বের হয়ে যায় যার ফলে আমাদের হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করা বন্ধ করে দেয়। যার ফলে আমরা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাই। আজকের বিজ্ঞান সেটা নিয়েও গবেষনা করল কোন জিনিস টা সুস্থ মানুষের দেহ থেকে বের হয়ে গেল যার ফলে লোকটা মারা গেলে। বিজ্ঞানীদের গবেষনায় পাওয়া গেল ” আত্নার ওজন আছে যার ফলে তা বেরিয়ে গেলে মানুষের ওজন কমে যায়”। কিন্তু বিপরীত ঘটনাও মানুষ হরহামেশায় দেখে। যদিও বিজ্ঞান ধারনা করছে আত্না বের হয়ে যায় তবুও আত্মা সম্পর্কে তেমন ধারন দিতে পারেনি।
জীববিজ্ঞানের ভাষায় ” প্রাণ আছে এমন জীবের জীবনের সমাপ্তিই মৃত্যু। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান হৃদস্পন্দন বন্ধ হলেই মৃত ঘোষণা করতে পারেনা। ইসিজি করে স্থায়ী ভাবে মৃত ঘোষণ করে। ওয়েষ্টাইন বলেন ” কাউকে মৃত ঘোষণা করা কঠিন প্রযুক্তির অভাবের কারণে নয় বরং প্রযুক্তির প্রাচুর্যই এর কারণ।

সত্যিকার অর্থে এই মৃত্যু নিয়ে মানুষের কৌতুহল সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অবধি চলছে কিন্তু সঠিক সজ্ঞা নির্ধারণ করতে পারেনি, ব্লাক হোলের মতই রহস্যঘেরা রয়ে গেছে। আর তা সম্ভব নয় বলেই kenedi Institute of ethics এর রবার্ট ভেচবলো বলেন “মৃত্যুর সংজ্ঞা নির্ধারণ করা মুলত ধর্মীয় বা দার্শনিক প্রশ্ন।” অথচ এই ধর্মের কোনকিছুই বিজ্ঞানের মাপকাঠিতে না টিকলে তা আধুনিক বিশ্ব মেনে নিতে পারে না।

যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখি না কেন প্রানীর মৃত্যু ঘটবেই। এত রহস্য ঘেরা, সুনিশ্চিত, ( যা এড়ানো সম্ভব নয়) এ মৃত্যুকে নিয়ে আমাদের ভাবনা গুলো দিন দিন কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। মৃত্যু আমাদের কাছে হয়ে উঠছে হাসির খোরাক। সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্যাটাসে ভেসে যাচ্ছে ” একদিন তো মরেই যাব”, আবার কেউ মারা যাবার সংবাদে RIP। দিন দিন মৃত্যুর ব্যাপারে অনুভূতি গুলো ভোতা হয়ে যাচ্ছে। সন্তান কথা না শুনলে অথবা তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে বলছেন ” তুই মরে যেতে পারিস না , তুই মরলেও তো শান্তি পাই”। হয়ত সত্যিই সে সন্তান পরপারে পাড়ি জমালে ধৈর্য্য ধারণ সম্ভব নয়।
আবার মা বাবা বার্ধক্যে পোঁছলে, অসুস্থ হয়ে গেলে সন্তানের কাছে বোঝা হয়ে যায়। সে দিন গুনতে থাকে কখন আপদ দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে।

কিছু দিন পূর্বেও দেখতাম কোন গ্রামে কেউ মারা গেলে পুরো গ্রাম যেন স্থবির হয়ে যেত, মৃতকে দাফন না করা পর্যন্ত কেউ কোন কাজে যেত পারত না। কিন্তু আজকের দৃশ্য বড়ই করুণ। আমরা জানাযায় উপস্থিত হয়েও নেটজগতে মেতে থাকি, প্রিয় কাউকে পেলেই সেল্ফি উঠানোর ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ক্যাপশন হয় ” অমুক ভাইয়ের জানাজায় প্রিয় নেতার সাথে।” সেখানে গিয়েও যেন স্মরণ হয়না “এরকম চকলেটের মত মুড়িয়ে আমাকেও পাঠানো হবে, হতে পারে তা কিছু সময় পরেই।”
অফিসে যাই, একস্থান থেকে অন্যস্থানে, বাস যোগে বা ট্রেন যোগে, আমরা ধরেই নেই আমাদের গন্তব্যে সঠিক সময়ে পোঁছে যাব। কিন্তু প্রতিনিয়ত রাস্তায় ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা। যখন রাস্তার পাশে উল্টে যাওয়া বা খাদে পড়ে থাকে বাস, ট্রাক, মাইক্রো আর ছোপ ছোপ রক্তের ছিহ্ন দেখি তখনো আমাদের অনুভূতিতে আসে না যে আমিও তাদের একজন হতে পারতাম।

মৃত্যু পথযাত্রী মানুষ গুলোর দিকে আধুনিক সভ্যতা যেন এক অন্য দৃষ্টিতে তাকানোর চেষ্টা করে। গত দশকেও যেন, অসুস্থ বাবা-মার পাশে রাত-দিন কাটিয়ে দেয়া মানুষের সংখ্যা নিতান্ত কম ছিল না। কিন্ত আজ মানবতা তাদের দুহাতে -দুপায়ে ঠেলে কবরের বাড়িতে পাঠাতে পারলেই যেন সিন্ধু জয় করে ফেলছে। গত কয়েক দিন আগে সাত সন্তানের এক সৌভাগ্যবতী দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। ছোট দুই ভাই নিকটবর্তী বাজারে ব্যবসায়ীক কাজে ছিলেন বড় ভাইকে ফোনে জানালেন তাদের আসতে দেরি হবে, তাই কবরের জায়গা গোসলসহ প্রয়োজনীয় কাজ সেরে ফেলতে।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া মুম্বাইয়ের ঘটনা প্রমান করে আজ অসংখ্য রত্নগর্ভা মৃত্যুর সময় প্রিয়জনদের দুনয়ন দেখার সৌভাগ্যও হারিয়েছেন। সবচেয়ে মর্মস্পর্শী বিষয় হল ইঞ্জিনিয়ার সন্তান তার কর্মব্যস্ততার ফাঁকে একবছরেও রত্নগর্ভার সাথে কথা বলার দুদন্ড সময় করে উঠতে পারেন নি। সভ্যতা তুমি আমাদের আর কতদূর নিয়ে যেতে চাও?

অথচ আধুনিক যুগের গর্বিত পিতা -মাতা তাদের জীবন যৌবনের বিনিময়ে তৈরি করেছেন দিগ্বিজয়ী বীর, বিশ্বের মানচিত্র পরিবর্তনকারী বিজ্ঞানীদের।
আজ যাদের প্র‍য়োজন ফুরিয়ে গেছে বলে পরপারে পাঠিয়ে দেবার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছি, তাদের যাত্রা পথে এগিয়ে দিয়ে নিজেরাও যে সে পথেই এগিয়ে চলেছি তা কখনো মানসপটে ফুটে উঠেনা।

প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে গিয়ে, অন্যকে পরাজিত করে, বড়বড় ডিগ্রি, নতুন আবিষ্কার আর অর্জনের মাধ্যমে যে অমোঘ মৃত্যুকে আলিঙ্গনের জন্য জোর কদমে এগিয়ে চলেছি তা নিজের অজান্তেও হৃদয় কোণে উঁকি দেয় না।

পৃথিবীর শ্রেষ্ট নেতা হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর সামনে এক ব্যক্তির খুব প্রশংসা করা হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন মৃত্যুকে স্মরণের ক্ষেত্রে তার কি অবস্থা? তার সাথীরা বললেন, ততোটা নয়। তখন রাসুল সাঃ মন্তব্য করলেন “তাহলে তোমরা যেমনটি বলছ, সে ততোটা (প্রশংসনীয়) নয়।” ( রাসুলের চোখে দুনিয়া, হাদিস নং ৮৮)
আসলে জীবনের স্বাদ বিনষ্টকারী মৃত্যুকে যদি আমরা গভীর অনুভূতি থেকে স্মরণ করতে পারি তবেই পার্থিব জীবনের সব লালসার থাবা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা সহজ হবে।
যে অন্তরে মৃত্যুর স্মরণ থাকে সে অন্তর কখনো কাউকে অনৈতিক কাজ করতে দিতে পারে না। পঙ্কিলতা মুক্ত ও
নৈতিকতা সমৃদ্ধ সমাজ গঠনে মৃত্যুর স্মরণই হতে পারে ফলপ্রসু হাতিয়ার।
তাই আসুন অনিবার্য মৃত্যুর জন্য নিজেকে তৈরি করি সৎকাজের মধ্য দিয়ে। স্মরণীয় হই ভূপৃষ্ঠে , বরণীয় হই পরপারে।

রফিকুল ইসলাম, শিক্ষক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.