খোয়াব

খাদিজা ইয়াসমীন
শাহেদ হাঁপাতে হাঁপাতে বিছানায় উঠে বসলো , শ্বাস নিচ্ছে জোরে জোরে , দম বন্ধ হয়ে আসছে, ঘামে সমস্ত শরীর চুপসে গেছে। এরকম দুঃস্বপ্ন এর আগে বহুবার দেখেছে, আজকে একটু বেশি ভয়ংকর । এই ভোরবেলার দুঃস্বপ্নটা শাহেদকে ভাবিয়ে তুললো। বিছানার একপাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে পায়েল, নিষ্পাপ বাচ্চাদের মত একদম নিঃশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে, জগতের কোন কিছুই যেন ওকে স্পর্শ করছেনা। অথচ শাহেদ কি দুঃস্বপ্নটাই না দেখলো? পায়েল মধ্যরাতের দিকে এরকম ছটফট করছিলো,ঘুম ছিলোনা চোখে, তাই এখন শান্তির ঘুমে বিভোর হয়ে আছে। শাহেদ আড়মোড়া ভেঙে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো , মনের মধ্যে অজানা অস্বস্তি নিয়ে সুবহে সাদিকের রবের নিকট আকুতি জানাতে থাকে হে আল্লাহ সব যেন ঠিক থাকে, কোন খারাপ কিছু যেন আমাদের স্পর্শ না করে।

মসজিদের আজান শুনে শাহেদ ওযু করে মসজিদে গেলো।
মসজিদ থেকে এসে শাহেদের মন খারপ দূর হয়ে গেলো পায়েলের তেলাওয়াত শুনে, এত সুমধূর কন্ঠে মেয়েটা কুরআন তেলাওয়াত করে হৃদয় ভিজে ওঠে, শুধু শুনতেই ইচ্ছে করে। শাহেদ মনে মনে আল্লাহকে ধন্যবাদ জানায় । আসলে মহান রবের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে শেষ করা যাবেনা, অগোনিত নিয়ামতে আমাদের সিক্ত করে রাখছেন অনবরত, যত নাফারমানি করিনা কেনো তার নেয়ামতের ঘাটতি নেই, বা রাগ করে দিতে কৃপণতা করেননা। পায়েল তেলাওয়াত শেষ করে শাহেদকে সালাম জানিয়ে জড়িয়ে ধরে রাখলো কিছুক্ষন তারপর নাস্তা বানাতে রান্না ঘরের দিকে গেলো। শাহেদ ঠিক ই বুঝতে পারলো কোন কারনে পায়েলের মন খারাপ কিন্তু এখন জিজ্ঞেস করলে কিছুতেই বলবেনা। এদিকে জরুরি কিছু কাজ গুছিয়ে আজ একটু আগেই অফিসে যেতে হবে, আরজেন্ট মিটিং আছে। সন্ধ্যায় এসে বরং শোনা যাবে কেন ওর মন খারাপ। পায়েল যদিও হাসিমুখেই শাহেদকে বিদায় জানালো, অফিস থেকে ফিরতে কি কি আনতে হবে তার লিস্টটাও পকেটে গুজে দিলো।

কাজে কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারছেনা শাহেদ, স্বপ্নটা মনের কোনে উঁকি দিয়ে বারবার জ্বালাতন করে যাচ্ছে।কাজ করতে দু একটা ভুলও হয়ে যাচ্ছে। এভাবে কেটে গেলো অর্ধেক বেলা। নামাজ ও লাঞ্চ করে এসে গা-টা চেয়ারে এলিয়ে দিয়ে চোখ দুটো মুদে কিছুদিন আগের অতীতে চলে গেলো।

মাস্টার্স শেষ করে সদ্য একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জয়েন করেছে শাহেদ। এর মধ্যেই বাড়ি থেকে শুরু হয়েছে মেয়ে দেখা। শাহেদের বাবা বড় ছেলের বিয়ে এবার দিবেনই। শাহেদরা দু ভাই। ও বড় , রাকিব ছোট, পড়ছে অনার্স সেকেন্ড ইয়ার।
যেই বলা সেই কাজ, শাহেদের মামা পাত্রীর খোঁজ এনেছে, খোঁজ খবর নিয়ে জেনেছে মেয়ে ভালো,অনার্স ফার্স্ট ইয়ার, বংশও ভালো, মেয়ে দেখতে বেশ সুন্দরী । শাহেদের আহামরি সুন্দরী মেয়ে বাধ্যতামূলক নয় ও শুধু চায় একজন ভালো জীবন সঙ্গী, আর বাবা মায়ের পছন্দ হলেই হবে।
তোমার নাম কি মা? পায়েল। নামাজ, কুরআন পড়তে পারো তো? জ্বী আলহামদুলিল্লাহ । আরও কিছু প্রশ্ন করলো শাহেদের মা-বাবা। লাজুকভাবে সব প্রশ্নের উত্তর দিলো পায়েল। মামা বললো শাহেদ তোর কিছু জানার থাকলে বল, কনফিউশন রাখিস না। শাহেদ কিছু জিজ্ঞেস করলোনা শুধু আড় চোখে বারবার দেখছিলো পায়েলকে। মেয়েটার কাজলটানা চোখ দুটো ভীষণ পছন্দ হলো শাহেদের, হাসিটাও কেমন হৃদয় খুলে কথা বলার মতন। শাহেদের বাবা মায়েরও পছন্দ হলো। বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হলো। এবং বেশ ধুমধাম করে বিয়ে সম্পন্ন হলো।

শুরু হলো শাহেদ আর পায়েলের নতুন জীবন। পায়েল পায়েলের মতই চঞ্চলে, পায়েল যেমন রিনিঝিনি শব্দ করে জানান দেয় কেউ আসছে, পায়েল নামক মেয়েটাও সারাক্ষণ শাহেদকে মাতিয়ে রাখে, চড়ুইয়ের মত এদিক থেকে ওদিক ছোটাছুটি করে সারাক্ষণ। নতুন বাসা , নতুন দুটি মানুষ একে অপরকে জানতে কত আগ্রহ! ওদের দিনকাল বেশ চলছিলো, টুকটাক ঘোরাঘুরি, খাওয়া-দাওয়া । এরমধ্যেই পায়েল হঠাৎ কন্সিভ করে । ওদের এত দ্রুত এরকম কোন প্লান ছিলোনা, জীবনটাকে নিজেদের মত উপভোগ করবে কিছুদিন এরকমটাই চাইতো দুজন। ওরা কিছুতেই মানতে পারছিলোনা ব্যাপারটা , দুজন পরামর্শ করে একদিন হাসপাতালে গিয়ে এব্রোশান করে আসে। পায়েল সুস্থ হয়ে যায় এবং সব আগের মত চলছিলো। কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই শাহেদের দুঃস্বপ্নটা শুরু হয়, মাঝেই মাঝেই কলজে কাঁপানো স্বপ্নটা দেখে। স্বপ্নটা এত ভয়ংকর যে রাতে শাহেদ ঘুমাতে পারেনা এবং মানসিক যন্ত্রনা আরও বেশি হয়। অনেক রাত গেছে যে ও আর পায়েল সারা রাত জেগে পার করেছে। পায়েল শুধু জানতো শাহেদ দুঃস্বপ্ন দেখে কিন্তু কখনো ডিটেইল বলেনি ওকে। একদিন জোর করেই পায়েল স্বপ্নটা জানতে চায়। অবশেষে শাহেদ বললো শোনো তবে, আমি আর তুমি একটা মাঠ ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা সবুজ বন দেখতে পাই, বনটা এতই মনোরম, যে খুব হাসি আনন্দ করতে ইচ্ছে হয়, আমরা হাসি তামাসা করতেও থাকি কিন্তু জায়গাটা হঠাৎ করে এত বেশি ধোয়ায় ছেয়ে যায় যে আমরা কেউ কাউকে দেখতে পাইনা, আবার জায়গাটায় এত বেশি অন্ধকার নেমে আসে আর ভ্যাপসা গরম ওঠে যে দম বন্ধ হয়ে আসে। ইয়া বড় বড় আগুনের শিখা আমাদের ঘ্রাস করতে জ্বিব লেলিয়ে দেয়। অপরদিকে, একটা ছোট বাচ্চার হৃদয় ভাঙা কান্না আমাদের অস্থির করে তোলে আর আমরা ছটফট করতে থাকি। স্বপ্নটা শুনে পায়েলের মন খারাপ হয়ে গেলো।

এরপর থেকে শাহেদ কুরআন পড়া শুরু করে নিয়মিত, যাতে করে এসব দুঃস্বপ্ন আর না দেখে।কুরআন পড়ে জানতে থাকে আল্লাহ ও তার দেয়া বিশাল নেয়ামত রাজি সম্পর্কে। শাহেদ কুরআন হাদিস পড়ে আর অবাক হয়! জীবন সাজানোর সমস্ত পসরা যা কুরআন মাজিদে অত্যাধিক সাবলিলভাবে বলে দেয়া। এগুলো না জেনে জীবনে কত ভুল করে ফেলেছে । একটা আয়াতে একদিন শাহেদের চোখ আটকে যায়,

“দারিদ্রের আশংকায় নিজেদের সন্তান হত্যা করো না। আমি তাদেরকেও রিযিক দেবো এবং তোমাদেরকেও। আসলে তাদের হত্যা করা একটি মহাপাপ”।
(সূরা বনী ইসরাঈলঃ৩১)

অজানা পাপে এবং ভয়ে শাহেদের মন কুকড়ে ওঠে, সাময়িক আনন্দ পেতে কতবড় সীমালংঘন করে ফেলেছে ওরা।
হাদিস পড়েও জানতে থাকে বিভিন্ন বিষয়ে যা এতদিন ঠিকমত জানতোনা, মানতোনা।
শাহেদ তনুমনে ক্ষমা জপতে থাকে । বুঝতে পারে যে বিয়ের মাধ্যমে যেমন মানসিক প্রশান্তি আসে তেমনি বংশবিস্তারও এর অন্যতম একটি উদ্দেশ্য এবং আল্লাহ তার উদ্দেশ্য পূরণের জন্যই আমাদের দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন। আর আমরা কিনা …?

“হে মানবজাতি! তোমাদের রবকে ভয় করো। তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একটি প্রাণ থেকে। আর সেই একই প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন তার জোড়া। তারপর তাদের দুজনার থেকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী।”
(আন- নিসাঃ১)
এরপর থেকে পায়েলও হাদিস কুরআন নিয়ে বেশ সময় কাটায়। মহান প্রভুর কাছে প্রার্থনা জানায় , কান্নায় ভেঙে পড়ে ভুলের মার্জনা চায়। শাহেদ আর পায়েলের বিয়ের -ছ-বছর কেটে যাচ্ছে, ওরা দু বছর যাবত চাচ্ছে ওদের ঘর কিচিরমিচির শব্দে ভরে উঠুক, আধো পায়ের ছাপ পড়ুক ঘরময়, আধো আধো কথা বলুক কেউ। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ওদের বাচ্চা হচ্ছেনা। ডাক্তারও দেখিয়েছে কোন সমস্যা নেই তবু কিছুতেই কিচ্ছু হচ্ছেনা।

শাহেদ অতীত স্মৃতি থেকে ফিরেই অফিসের কাজে মন দিলো। একটি শব্দই অস্পষ্টভাবে আওড়ালো আল্লাহ ভরসা, তিনি মহান এবং দয়ালু, আমাদের অবশ্যই ক্ষমা করবেন। কেউ যদি পাহাড়সম পাপ করে খুব অনুতপ্ত হয় তো মহান রব্ব কখনো ফেরান না, তার ক্ষমা ও রহমত অফুরন্ত শুধু আমাদের সঠিকভাবে চাওয়ার অপেক্ষা মাত্র।

কলিংবেল চাপতেই পায়েল দরজা খুলে দিলো কিন্তু ওর চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে আছে, যেন সদ্য ফোঁটা গোলাপ কেউ ছিড়ে টুকড়ো টুকড়ো করে রেখে দিয়েছে। তড়িঘড়ি ফ্রেস হয়ে পায়েলের কাছে বসলো শাহেদ , জিজ্ঞেস করলো কেন মন খারাপ সকাল থেকেই? পায়েল কান্নায় ভেঙে পড়লো শাহেদকে ধরে , বললো একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছি।বলো কি স্বপ্ন? দেখলাম আমার কোলে একটা ফুটফুটে বাচ্চা , যেন অপার্থিব মায়ায় জড়ানো হুরের মত, মিটমিটে হাসি উফ কি মায়া। এবং অদূরে আরও কিছু বাচ্চা খেলছে। কিন্তু কিছুক্ষ পরে আমি নিজেই কোলের বাচ্চাটাকে রক্তাক্ত করে ফেলেছি, আবার কি মনে হতেই আরেকটি বাচ্চা কোলে নিতে চাচ্ছি কিন্তু কোন অদৃশ্য কারনে ওদের কাছে যেতে পারছিনা।শাহেদ আমার কোলজুড়ে বাচ্চা চাই বলেই কান্নায় ফুঁপিয়ে উঠলো পায়েল। শাহেদ শান্তনা দিয়ে বললো আমরা বড় ভুল করে ফেলেছি এখন আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে পবিত্র হৃদয়ে। আল্লাহ চাইলে সব সম্ভব।তার কাছে তাওবা করে ফিরে আসলে কখনো ফিরান না বান্দাকে, চাই সে যত বড়ই পাপ করে থাকুক না কেন। চলো দুজনই কুরআন পড়ি আর প্রভুকে জপি দেখবে শান্তি লাগছে।
“আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। আমি তার ওপরই ভরসা করেছি এবং তিনি মহা- আরশের অধিপতি।”
(আত-তাওবাঃ১২৯)

খাদিজা ইয়াসমীন কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন