হালাল রিজিক

সামিন বিনতে ইয়াসির

ইতু ও দিশা দুজনে একই ক্লাসে পড়ে। দুজনে ক্লাসে পাশাপাশি বসে , এক সাথে টিফিন খায় , মাঠে গিয়ে এক সাথে খেলে । স্কুলে যতক্ষণ থাকে ওরা সবকিছু একসাথেই করে। তবে স্কুল ছুটির পর দিশা বাড়ি ফেরে দামি গাড়িতে চড়ে । আর ইতু বাড়ি ফেরে মায়ের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে ।

নতুন বছরে ক্লাস শুরুর পর  দিশা স্কুলে এলো নতুন বানানো স্কুল ড্রেস, নতুন জুতা পরে। নতুন স্কুল ব্যাগ , টিফিন বক্স, ওয়াটার বটল ,  পেনসিল বক্স  এর নতুন সেট নিয়ে। এদিকে  ইতুর বাবার  নতুন বছরের ভর্তি  ফি ও নতুন বই, খাতা কেনার খরচ দিতেই হিমসিম অবস্থা । তাই গত বছরের  পুরানো  ব্যাগ,  জুতা,  ড্রেস দিয়ে এ বছরটাও চালাতে হবে ইতুকে । বান্ধবীর নতুন সবকিছু দেখে ছোট্র ইতুর মনটা একটু খারাপই হলো।

বাসায় ফিরে মা’কে বলল, “ আচ্ছা মা, দিশার বাবাও তো নাকি আমার বাবার মতো একই ধরনের সরকারী চাকুরি করে !! তবে দিশাদের আর্থিক অবস্থা আমাদের চেয়ে এতো ভালো কিভাবে হলো?   ও তো রোজ টিফিনে দামী দামী খাবার যেমন বার্গার, স্যান্ডউইচ, পিজা খায়, দামী দামী জিনিস ব্যবহার করে। এমনকি  ওর নিজের ট্যাবও আছে। স্কুল, কোচিং এ যাওয়া-আসা করার জন্য আলাদা গাড়ি, ড্রাইভার আছে দিশার । ওরা এত বড়লোক কিভাবে হলো মা?”
ইতুর মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “ শুনেছি দিশার বাবা নাকি পৈত্রিক সূত্রে অনেক সম্পত্তি পেয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে চাকুরির পাশাপাশি ব্যবসা করেন। তাই হয়তো ওদের আর্থিক অবস্থা এতটা ভালো।”

দিশার সাথে চলতে গিয়ে ওর দামী জিনিস দেখে ইতুর মন খারাপ হয় এটা বুঝতে পেরে ইতুর মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “তোমার বাবা সৎ পথে থেকে যে হালাল রিজিক উপার্জন করেন, আমাদের উচিত সেই অনুযায়ী জীবনযাপন করা, তাতেই সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। তাছাড়া হালাল রিজিক দিয়ে জীবন চালানোর সম্মানই আলাদা।”

মায়ের বলা কথাগুলো ইতু ঠিক বুঝতে পারলো না। দিশা দামী গাড়িতে করে স্কুলে আসে, দামী জিনিস ব্যবহার করে, বন্ধুদের মাঝে মাঝেই দামী গিফট দেয় বলে সবাই  তো দিশাকেই সম্মানের চোখে দেখে। ওর বাবার ইনকাম হালাল না হারাম তার খোঁজ কি কেউ নেয়?? ইতুর মনে এই প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে লাগলো।

কয়েক মাস পরের ঘটনা….

সকালে নাস্তার টেবিলে বাবার হাতে পত্রিকাটা এগিয়ে দিতে গিয়ে হঠাৎ প্রথম পাতার একটি ছবিতে চোখ আটকে গেল ইতুর। হাতে হাতকড়া পরা অবস্থায় এক লোককে ধরে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ, নিচে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘অফিসে ঘুষ নিতে গিয়ে হাতে-নাতে ধরা পড়লেন সরকারী কর্মকর্তা আজগর সাহেব

আরে এটা তো দিশার বাবার ছবি!! “উনাকে পুলিশ কেন ধরে নিয়ে যাচ্ছে ? “—বাবাকে এই প্রশ্নটা করতেই বাবা বললেন, “উনার নামে অনেক দিন ধরেই ঘুষ নেয়ার অভিযোগ ছিল । ঘুষ নিয়ে রাতারাতি অনেক সম্পত্তির মালিক হয়ে গেছেন। এতদিন প্রমাণের অভাবে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এবার দুদক ফাঁদ পেতে উনাকে ধরেছে।” বাবার কথা শুনে দিশার জন্য মনটা খারাপ হয়ে গেল ইতুর।

কয়েকদিন পর দিশা স্কুল এল। ইতু ওর চেহারা দেখেই বুঝতে পারলো দিশার মনের অবস্থা। কিন্তু প্রিয় বান্ধবীকে কিছুই জিজ্ঞেস করে বিব্রত করলো না ইতু। ক্লাসের অন্য ছেলে মেয়েরা অবশ্য চুপ করে থাকলো না। দিশাকে দেখিয়ে ফিসফিস করে বললো, “জানিস ওর বাবা না ঘুষ নিতে গিয়ে পুলিশের কাছে ধরা পড়েছে!!!”

ওদের কথা শুনে ডেস্কে হেডডাউন করে কেঁদে ফেললো দিশা। যারা এতদিন দিশার দেয়া দামী গিফট পেয়ে ওর সাথে গদগদ হয়ে কথা বলতো তারাই আজ দিশাকে অপমানজনক কথা বলছে!!

দিশার অবস্থা দেখে ইতুর হঠাৎ মনে পরে গেল সেদিন ওর মায়ের বলা কথাগুলো…. “হালাল রিজিক দিয়ে জীবন চালানোর সম্মানই আলাদা।” আজ ও মায়ের কথাগুলোর অর্থ বুঝতে পারলো। নিজের পুরনো স্কুল ড্রেস, জামা, জুতার জন্য আজ আর আফসোস হলো না ওর । বরং  নিজের বাবা যে সৎ —এই গর্বে বুকটা ভরে উঠলো ইতুর।

সামিন বিনতে ইয়াসির নয় বছর বয়সী লেখক ও ইউটিউবার।

আরও পড়ুন