আজ লেখক আবুল খায়ের মুসলেমউদ্দীন এর জন্মবার্ষিকী

-আয়েশা সিদ্দিকা

আজ ২০ এপ্রিল, এমন একজন লেখকের জন্মবার্ষিকী, যাকে আমরা অনেকেই কম চিনি।  সত্যি বলতে পাঠশালায় শোনার আগ পর্যন্ত আমিও তাকে চিনতাম না।  তাঁর লেখার সাথেও পরিচিতি ছিল না।  তাই আজকে তাঁর লেখা “কমরেড প্রীতিলতা” বইটা পড়লাম। তিনি হলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের কবি, কথাশিল্পী, ছড়াকার ও ঔপন্যাসিক  আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দীন।

পুলিশ লেখকঃ
পুলিশ সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব আমাদের সমাজে বিদ্যমান। কারণ পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহার ও নানা কেচ্ছা কাহিনী কারো অবিদিত নয়। তবে পুলিশও রক্ত মাংসের মানুষ। তারও ত্রুটি বিচ্যুতি, ভালো-মন্দ দিক থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
আমরা সবাই জানি লেখক, কবি, শিল্পীরা সংবেদনশীল বা কোমল মনের মানুষ হয়।  পুলিশ ও যে লেখক, কবি হতে পারে তা কি আমরা ভাবতে পারি! কেন নয়!
বিখ্যাত খ্যাতিমান পুলিশ অফিসার ধীরাজ ভট্টাচার্যের “যখন পুলিশ ছিলাম” ও “যখন নায়ক ছিলাম” এই দুই আত্নজীবনীমূলক উপন্যাসের কথা কেই বা ভুলতে পারে।
এছাড়াও “সূর্য দীঘল বাড়ি” বিখ্যাত সেই উপন্যাসের লেখক আবু ইসহাক তিনিও একজন পুলিশ অফিসার।
যাইহোক পাঠক নিশ্চয়ই বিরক্ত হয়ে ভাবছেন  আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দীন সম্পর্কে লিখতে বসে এসব কি বকবক করছি। আসলে বিখ্যাত এই কথাসাহিত্যিক ও একজন পুলিশ অফিসার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন কিছুদিন শিক্ষকতা শেষে ১৯৫৭ সালে তিনি তৎকালীন সিএসপি পরীক্ষায় (সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্থান) পাকিস্থানের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এবং তিনি বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার প্রথম সিএসপি অফিসার।  কর্মজীবনে খ্যাতিমান এই সাহিত্যিক পশ্চিম পাকিস্থান পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, তৎকালীন পাকিস্থান সরকার কর্তৃক নিযুক্ত নেপালের সাবেক রাষ্ট্রদূত, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) লেকচারার,  বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর (বিলুপ্ত) মহাপরিচালক, বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত আইজিপি এবং বাংলাদেশ বস্ত্রশিল্প সংস্থার চেয়ারম্যান
হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসর নেন।

পেশায় সফল একজন মানুষ  সাহিত্যেও সফলভাবেই পদাচারণঃ
আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিনের প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা প্রায় শতাধিক। এর মধ্যে কাব্যগ্রন্থ তিনটি। উপন্যাস ২০টি, শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ ২০টি, শিশু-কিশোর গল্প-উপন্যাস প্রায় ৩০টি এবং ঐতিহ্য ও জীবনীভিত্তিক গ্রন্থ ৫টি। তিনি তার সাহিত্যকর্মের জন্য আসাফউদ্দৌলা রেজা স্মৃতিসাহিত্য পুরস্কার, কবি আবুল হাসান স্মৃতিসাহিত্য পুরস্কার, কবি জসীমউদ্দীন স্মৃতিসাহিত্য পুরস্কার, ফরিদপুর পৌরসভা সাহিত্য পুরস্কার ও সুহূদ সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। জনপ্রিয় এই কথাশিল্পী কখনই পুরস্কার পাওয়ার জন্য সাহিত্যচর্চা করেননি বরং তিনি লিখেছেন আমাদের বাংলা সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য।

আশির দশকে তার লেখা গল্প-উপন্যাসের পাঠকপ্রিয়তা তাকে অনেক বেশি জনপ্রিয় করেছিল। তার লেখার মূল উপজীব্য ছিল গ্রাম বাংলার মানুষের সুখ-দুঃখ গাঁথা জীবনের বাস্তব গল্প, শহুরে জীবনের বাস্তবতা ও তার আশপাশের চরিত্র।
ছোটগল্প লেখায় ছিলেন পারদর্শী।  তাঁর ছোটগল্প পড়া শুরু করলে পাঠক ছেড়ে উঠতেই চাইবে না। বিশেষ করে রবীন্দ্র পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে ছোটগল্প রচনায় যেসকল সাহিত্যিক বিশেষ অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। গল্প, উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি ইসলামী শিশু সাহিত্যও রচনা করেছেন। যা ইসলামীক ফাউন্ডেশন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত করে। এছাড়া, তিনি ছিলেন একজন জনপ্রিয় গীতিকার। নজরুল পরবর্তী প্রসিদ্ধ নাত লেখকদের মধ্যে তিনি অন্যতম।
কি গল্প, উপন্যাস কিংবা ছড়া আর কিশোরদের জন্য। সর্বত্র ছিল তার অবাধ বিচরণ। বিশেষ করে শিশুসাহিত্যিক হিসেবে তার খ্যাতি ছিল আকাশচুম্বী।

তার হাস্যরসে ভরা ছিল টইটম্বুর ছড়া। গাছগাছালি ও পাখপাখালি নিয়ে মজার মজার কবিতা আর রোমাঞ্চে ঠাসা রহস্য আর গোয়েন্দা কাহিনী যা পাঠক মহলে আজও সমাদৃত। আরও লিখেছেন হালকা মজাদার অসংখ্য হাসির গল্প। গা ছমছম করা বিভিন্ন অভিযানের কাহিনী। লিখেছেন মিষ্টি মজাদার ছড়া। তার ছড়ার মূল উপজীব্য ছিল গ্রামবাংলার রূপ আর সমসাময়িক সব ছোটখাটো ঘটনার জীবন্ত বর্ণনা।
তাঁর লেখার সূচনা হয় স্কুলজীবনে দেয়াল পত্রিকায় লেখার মাধ্যামে।  তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “নারিন্দা লেন” প্রকাশিত হয় ১৯৮১ সালে।

বিখ্যাত এই গুণীজনের জন্ম ও মৃত্যুঃ
তিনি ১৯৩৪ সালের ২০ এপ্রিল বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার লাকসাম থানার লৎসর গ্রামে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম নাম অধ্যাপক মাও: আবদুল আউয়াল ও মাতার নাম হাফসা খাতুন।পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে মুসলেহউদ্দীন ছিলেন বড়।  পিতা অধ্যাপক মাওলানা আব্দুল আওয়াল ছিলেন বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার প্রথম এম.এ (প্রথম মাস্টার্স পাশ) ।আলীগড় বিশ্ব‌বিদ্যালয় থে‌কে বাংলায় এম এ ১৯৩৬ এবং কলকাতা আলীয়া মদ্রাসা থে‌কে এম এম প্রথম শ্রেনী। তি‌নি আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় ক‌লে‌জের শিক্ষক ও প‌রে তৎকালিন পা‌কিস্তান ক‌লেজ এর প্রথম বাঙ্গলী মুস‌লিম প্রি‌ন্সিপাল। ১৯৫০ সালে যখন মুসলেহউদ্দীন  ষষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ে তখন তিনি ক‌লেরায় আক্রান্ত হ‌য়ে ই‌ন্তেকাল ক‌রেন।
আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন ২০০২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর  মাত্র ৬৮ বছর বয়সে ঢাকার ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে ইন্তেকাল করেন। তাকে তার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা ও এতিমখানা প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়।

আরও পড়ুন