এতিম বাচ্চাদের ভিক্ষুক নয় স্বাবলম্বী করতে পাশে চায় এতিমখানার পরিচালক

আসাদুজ্জামান জুয়েল

এটি একটি এতিমখানার ছবি। একটি ব্যতিক্রমধর্মী এতিমখানা।
“এতিম ছেলেরা তবু বাদাম বিক্রি করতে পারে। বাসে ট্রেনে পত্রিকা বিক্রি করতে পারে। চায়ের দোকানে কাজও করতে পারে। এতিম মেয়েদের কথা একবার ভাবেন। তাদের যাওয়ার জায়গা থাকে না। রাস্তায় বেরুলে পুরুষ নামে কিছু অমানুষরা তাদেরকে নানানভাবে তাদের লালসার শিকারে পরিণত করে। সে আস্তে আস্তে অন্ধকার জগতে বিক্রি হয়ে যায়” কথাগুলো বলতে বলতে চোখ দিয়ে পানি গড়ায় এতিমখানার পরিচালকটির।
তিনি আরো বলেন, “আমারও তিনটি মেয়ে। এতিম মেয়েগুলোর দিকে তাকালে আমি আমার মেয়েদের মুখ দেখতে পাই।”

মুগ্ধ হয়ে এতিমখানার জন্য নিবেদিতপ্রাণ মানুষটির মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তিনি এক নাগাড়ে বলে যাচ্ছেন এতিমখানাটি তৈরির পেছনের কথা।
তার শাশুড়ি চার শতক জমি দান করতে চেয়েছিলেন এতিমখানা তৈরির জন্য। শাশুড়ির সেই দান নিয়ে একটি ছোট টিনের ঘর তোলেন তিনি। চারজন এতিম বাচ্চাকে আশ্রয় দেন সেখানে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে ধরমপুর নামক মহল্লা। আশপাশে ছিন্নমূল মানুষের বাস। রিক্সাচালক, ভ্যানচালক লোকজনের আধিক্য সে মহল্লায়। ১৪/১৫ বছর বয়সেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। অনেকক্ষেত্রেই এই বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েরা প্রেগনেন্ট হলেই তাদের রেখে স্বামীরা পালায়। বিশ বছর বয়সে অনেকে ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে বিপাকে পড়ে। নিজের পেট চালাতে লোকের বাড়ি বাড়ি কাজ করে তারা। একদিন হয়তো আবার নতুন বিয়ে আসে তার। শর্ত একটাই, মেয়েকে নিতে পারবেনা সাথে। অথবা বিয়ের পরে আগের পক্ষের বাচ্চাকে তাড়িয়ে দিতে বাধ্য করে নতুন স্বামী।

অসহায় মা পরিস্থিতির শিকার হয়ে এতিম বাচ্চাটিকে রেখে যায় এতিমখানায়। স্বামীকে ফাঁকি দিয়ে চুপচুপ করে কখনো কখনো এসে বাচ্চাটিকে দেখে যায়। জড়িয়ে ধরে কাঁদে। বাচ্চাটি মায়ের সাথে থাকতে চায়, মায়ের কাছে যেতে চায়। মা যে বড় অসহায়! চোখের পানি ছাড়া তার কোন সহায় নেই। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে, চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে, কপালে-গালে চুমু খেয়ে নিজে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে আসে।

এরকম বাচ্চাদের নিয়ে এতিমখানাটি চলতে থাকে। বাড়তে থাকে এতিম বাচ্চার সংখ্যা। জায়গার সংকুলান হয় না। এই এতিমখানার পাশে সীমিত সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসেন কেউ কেউ। আরো একটু জমি কিনেন। দুটো টিনের ছাপড়া ঘর তোলেন। আরো দশটি বাচ্চার জায়গা হয়। খরচ বাড়ে। আগের বাচ্চাদের খাবারে যোগ হয় আরো নতুন কচি কয়েকটি ক্ষুধার্ত মুখ।
এভাবেই একে একে ৫০ টি এতিম কচি মুখ জমা হয় এই এতিমখানায়। খাবার তবু অল্প স্বল্প জোটে, সমস্যা হয় আবাসন নিয়ে। এক রুমে গাদাগাদি করে মেঝেতে কয়েকজন করে থাকে।
এতিমখানার খাদ্য সংকট আছে, পানির সংকট আছে, আছে পোশাকের সংকটও। তবে একটি জায়গায় যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন কর্তৃপক্ষ। তারা অন্য এতিমখানায় যেভাবে বাচ্চারা রসিদ হাতে করে বাড়ি বাড়ি সহযোগিতা চেয়ে বেড়ায়, সেভাবে এই বাচ্চাদের পাঠাবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেন। পরিচালক ভদ্রলোক বলেন, “এতিম বাচ্চারা ওভাবে চাইতে গেলে তারা হীনমন্যতায় ভুগবে। ভাববে তাদেরকে ভিক্ষা করে বাঁচতে হচ্ছে। সুতরাং তাদেরকে আমরা কোন অবস্থায় সাহায্য নিতে পাঠাবো না। প্রয়োজন হলে আমি সাহায্য চাইবো, আমি ভিক্ষা করবো।”
এই এতিমখানায় বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে, পড়ালেখা শেখানো হয়। পড়ালেখার পাশাপাশি তাদের হাতের কাজ শেখানো হয়। এতিমখানায় একটি টিনের ঘরে ছাব্বিশটি সেলাই মেশিন দেখলাম। সকল বাচ্চার জন্য সেলাইয়ের কাজ শেখা, এমব্রয়ডারি শেখা, ব্লক-বাটিক এর কাজ শেখা বাধ্যতামূলক।
এক রুমে দুটো কম্পিউটারও দেখলাম। বড় বাচ্চাদের শিফট করে কম্পিউটারও শেখানো হচ্ছে।

আমি এতিমখানাটি সম্পর্কে জানতে পেরে কয়েকজনকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম। এই শীতেও মেঝেতে বাচ্চাদের ঘুমানোর ব্যবস্থা দেখে চোখ ফেটে অশ্রু ঝরেছে। রোধ করতে পারিনি। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে সকল বাচ্চাদের জন্য সিঙ্গেল খাটের ব্যবস্থা করা গেছে। পাশের বাড়ি থেকে পানি এনে খেতে হয়, ওয়াশরুমে যেতে হয় দেখে সেমি মারসেবল টিউবয়েল বসিয়ে দিয়েছি আমরা। এতিমখানাটির পাশেই পুকুর থাকায় তাদের জমিগুলো ভেঙে যাচ্ছে। ডুমুর বালির ভরাট ফেলা হলেও সে ভরাটগুলো নেমে যাচ্ছে পানিতে। আমরা উপস্থিত সদসদ্যরা তাৎক্ষণিক চাঁদা তুলে ১৫০০০ টাকা খরচে সে ভরাটগুলোকে পাইপ এবং টিনের বাঁধ দিয়ে ঘিরে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারলাম আলহামদুলিল্লাহ।

বাচ্চাদের মলিন মুখ দেখে এতিমখানার পরিচালককে বললাম, “আমি ওদের একবেলা খাওয়াতে চাই।” তিনি আমতা আমতা করে বললেন, “যদি বাচ্চাদের এক সেট করে কাপড় দেওয়া যেতো! খাবার খেলে তো একবেলাতেই শেষ হয়ে যায়! একদিন না হয় ভালো খাবার না খেলো।”
আমার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি গড়াতে লাগলো। এই বাচ্চাগুলোর মলিন মুখ সহ্য করার মতো নয়। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “পোশাক দিতে কত টাকা লাগবে?”

এতিমখানার পরিচালক বললেন,”তারা নিজেরাই জামা বানাতে পারবে। ৫০ জন বাচ্চার শুধু কাপড় কিনে দিলেই চলবে। তাতে ১৫০০০ টাকার মতো লাগতে পারে।”
এতিমখানাটি থেকে আসার পর রুমে দরজা জানালা বন্ধ করে অন্ধকারে আছি। খুব কষ্টে বারবার চোখ মুছে মুছে যা লিখলাম, তাতে অনুভূতির অনু পরিমাণও প্রকাশ করতে পারিনি। আমরা কি নিজের একটি বাচ্চার মতো করে এতিমখানার একটি বাচ্চার দায়িত্ব নিতে পারি না? আমাদের আশেপাশে কত কত এতিমখানাই তো আছে।

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও অ্যাডমিন, অংশু

আরও পড়ুন