কবি আল মাহমুদ এর কবর জেয়ারত

আরিফ শাওন

১.
গতোবছর শীপে করে ভৈরব গিয়েছিলাম। আমার সাথে ছিলো মুরাদ ভাই। সেইখান থেকে অনেকস্মৃতি বুকে নিয়ে চলে যাবো পরদিন। তন্মধ্যে মনে পড়লো আল মাহমুদ এর কবর তো নিজগ্রামেই। ব্রাম্মণবাড়ীয়া। এই সুযোগে কবির কবর জেয়ারত করে যাই।
ঘটনাক্রমে একজন সাংবাদিকের সাথে দেখা হয়ে গেলো আমাদের সাথে। কথা হলো অনেক। তো, কথার মাঝপথে কবি আল মাহমুদ’র কবর জেয়ারত করার ইচ্ছাটা জানাই। তিনি চিনেন কিনা কবির কবর? জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, উনার কবরস্থ করার শেষ পর্যন্ত ছিলাম ওখানে। খবর সংগ্রহ করার জন্য।

এরপর ঐদিনের বেশকিছু স্মৃতি আমাদের শোনালেন। পথটা চিনিয়ে দিলেন। আমরা যদি তারপরও পথ না চিনি তাহলে ওখানকার একজন সাংবাদিকের সাথে ফোনে কথা বলে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

পরদিন ভোরে রওনা দেই। পৌছে গেলাম যথারীতি। রেল স্টেশনের পাশেই। পাঁচ মিনিটও লাগবে না। মাথা উঁচু করলে কবরস্থান দেখা যায়। বড় কবরস্থান। পাশেই বড়পুকুর। আমরা পুকুর দেখি খুশি হলাম। হাতমুখ ধুয়ে নিলাম অযুর নিয়তে। রাস্তার পাশে কবরগুলোর এপটাপে লেখা কালো অক্ষরগুলো ভালোভাবে দেখছি, কোনো এপিটাফে লেখা আছে কিনা ‘কবি আল মাহমুদ…!
খুঁজে না পেয়ে এদিক ওদিক তাকালাম কেউ আছে কিনা জিগ্যেস করার মতো। দেখি, কয়েকটা বাচ্চা রাস্তার উপর ক্রিকেট খেলছে। তাদেকে ডাকলাম, “কবি আল মাহমুদের কবর কোথায় চিনো?”
একটা ছেলে সোজাসাপ্টা উত্তর দিলো, ”জ্বি, চিনি।”
– তাহলে আমাদের দেখিয়ে দাও।
– চলেন। আমার সাথে।

আমরা কবরস্থানের গেট দিয়ে ঢুকলাম। মোল্লাবাড়ির কবরস্থান। খুবই পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি। পাকা রাস্তা। গেট দিয়ে সোজা একটু গিয়ে হাতের বাঁয়ে মোড় ফিরলাম। তারপর দশ-পনেরো হাত সামনে হাতের ডান পাশে দেখিয়ে দিলো ছেলেটি। তাকে আর বলতে হলো না ‘এটি কবি আল মাহমুদ’র কবর। আমরা এপিটাফ পড়েই চিনে ফেললাম। সবুজ ঘাস জন্মেছে কবির কবরে। এপিটাফে লিখা আছে কবির সেই বিখ্যাত কবিতার কিছু অংশ।

”কোনো এক ভোরবেলা শুভ শুক্রবারে
মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাগিদ
অপ্রস্তুত এলেমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে
ভালোমন্দ যা ঘটুক, মেনে নেবো এ আমার ঈদ।”

কয়েকবার পড়লাম। পড়তে পড়তেই কখন যে গড়িয়ে পড়েছে দুফোঁটা অশ্রুজল টেরই পেলাম না।
দুআ দরুদ পড়লাম। মুনাজাত করতে গিয়ে দেখি দুজনেই ডুকরে ডুকরে কাঁদছি। কোনোরকম মুনাজাত শেষ করলাম। তারপর চোখ মুছে পুরো কবিতাটা পড়লাম দুজনেই। শেষমেষ ট্রেন ধরার তাগিদ আমাদেরকে চলে যেতে বাধ্য করলো। শেষবারের মতো দেখে বিদায় নিলাম আমরা দুজন।

২.
ট্রেনে জানালার পাশের সিটে বসে আছি। পাশে বসেছে এক বৃদ্ধ। জানালার পাশে এক ভদ্র মহিলা দাড়িয়ে আছেন। সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা বারবার জিজ্ঞাসা করছেন ঐ বৃদ্ধের। পরে জানলাম, উনার মেয়ে। দু’টো বাচ্চার মা। বড়টা ৮ বছর চলে। মেয়েকে দেখতে এসেছেন। এখন চলে যাচ্ছেন। তাই মেয়ে নিজেই বাবাকে বিদায় জানাতে এসেছেন। ভদ্র মহিলা। পর্দা করে এসেছেন।

মেয়েটা দোকান থেকে দুটা কলা, একটা পাউরুটি আর পানি কিনে আনলো হুড়মুড় করে। ট্রেন ছাড়ার হুইসেল বেজে উঠলো। মেয়েটা মুখটা অন্ধকার কালো মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। সেই মেঘ ঘন হতে হতে অঝোর ধারায় নামলো বৃষ্টি। মেয়েটা কান্না করতে করতে তাঁর বৃদ্ধ বাবার হাতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ট্রেন ছেড়ে দিলো। মেয়েটা হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে কান্না করতে করতে। মেয়েটা চোখের আড়াল হলেই বৃদ্ধের দিকে চোক ফিরালাম। দেখি, জীর্নশীর্ণ এই বৃদ্ধের মুখ বেয়ে দাড়ি ভিজিয়ে দিচ্ছে চোখের পানি। ভাবি, বৃদ্ধ বয়সেও মেয়ের প্রতি কি মায়া। কি নিখাদ ভালোবাসা। ২০/২২ বছর অনেক কষ্ট করে লালণ পালন করা মেয়েকে রেখে যাচ্ছে নিজের কাছ থেকে দূরে, অন্য কোথাও। এই কষ্ট চোখের বাঁধ ভেঙে গড়িয়ে পড়ছে চোখের পানি হয়ে।
হঠাৎ নিজের কথা মনে হলো, আমিও কি কাউকে রেখে চলে যাচ্ছি দূরে কোথাও? আনমনে দেয়া জবাব অস্ফুটস্বরে বেরিয়ে এলো, হু। প্রিয় মানুষকে, প্রিয় কবিকে রেখে চলে যাচ্ছি অনেক দূরে, বহুদূরে। আমারও কান্না পেল পাশে বসা বৃদ্ধের মতো। আমাকেও ভিজিয়ে দিলো মনে আকাশে জমে থাকা ঘনকালো মেঘ বৃষ্টি হয়ে।

আরও পড়ুন