নক্সী কাঁথার মাঠ- জসীম উদদীনের অমর সৃষ্টি

নাদিয়া কানিজ

নকশী কাঁথা এই শব্দটির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। গ্রামীণ নারীরা নিপুণহস্তে তাদের দৈনন্দিন জীবন, আনন্দ -বেদনা, সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং স্বপ্নের জাল বুনে তৈরি করে নকশী কাঁথা। এটি শুধু কাঁথা নয় যেন একটি জীবন বৃত্তান্ত।

ঠিক তেমনি সাজু নামক এক গ্রাম্য মেয়ের তৈরি এক নকশী কাঁথা পুরো গ্রাম জুড়ে এতটাই আবেদন সৃষ্টি করে যে গ্রামের নাম হয়ে যায় নকশী কাঁথার মাঠ। একই সাথে লোক মুখে উচ্চারিত হতে থাকে সাজুর জীবনের করুন গাঁথা।

বলছি জসীম উদ‌্‌দীন রচিত ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ কাব্যগ্রন্থের কথা। সহজ সরল ভাষার গাঁথুনিতে নির্মিত এক রোমান্টিক কাব্য। যা ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয়। সে সময়ে বাংলা সাহিত্যে ব্যাপক প্রভাবিত হচ্ছিল ইউরোপীয় সাহিত্য দ্বারা। কিন্তু জসীম উদ্দীন সেদিকে না গিয়ে নিজের মত করে লিখতে থাকেন গ্রামীণ মানুষের সংস্কৃতি, সুখ-দুঃখ ও জীবন নিয়ে। আর তার লেখনীর সহজ সরলতাই তাঁকে এনে দেয় ‘পল্লী কবি’র খ্যাতি।

জসিম উদ্দীন এর সমসাময়িক অন্যান্য কবিরা তখন লিখছেন পাশ্চাত্য কবিদের অনুকরণে। যেমন কিছুদিন আগে আমি বিষ্ণু দের কবিতা পড়ছিলাম। তখন মনে হয়েছিল যেন আমি ক্যালকুলাসের ‘যোগজীকরণ’ করছিলাম। এর পর যখন নকশী কাঁথার মাঠ পড়লাম মনে হল আমি যেন ‘মিডল টার্ম ফ্যাক্টর’ করছি।

গ্রামীণ কাহিনী নিয়ে রচিত এই কাব্য পাঠক মহলে কতটুকু সমাদৃত হবে তা নিয়ে বেশ সন্দিহান ছিলেন কবি। একই সাথে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর যিনি কাব্যের ভূমিকা লিখেছেন তিনি নিশ্চিত হতে পারছিলেন না পাঠক এ কাব্যটিকে কিভাবে গ্রহণ করবে। তবে তিনি বলেছেন- “এই লেখার মধ্য দিয়ে পল্লী জীবন আমার কাছে চমৎকার একটি মাধুর্যময় ছবির মতো দেখা দিয়েছে।”

সত্যিই তাই, ১৪ টি পর্বের কাহিনীকাব্যের প্রতি ছত্রে ছত্রে কবি এঁকেছেন মাধুর্যতার ছবি। প্রতি পর্বের শুরুতেই সংযুক্ত করেছেন একটা করে গান। যা সেই পর্বের বিষয় এবং মূল সুরকে অনুধাবন করতে অধিকতর কার্যকরী। সেই গানগুলোও আঞ্চলিক সুরে রচিত। কাব্যে আছে রাখালী গান , মুর্শিদী গান, মেঘরাজার গান, ময়মনসিংহ গীতিকা, গজারি গান। এছাড়াও আছে মহররমের জারী, আছে আসমান সিংহের গান ও মুসলমান মেয়েদের বিবাহের গান । পর্বের সাথে বেশ সঙ্গতি রেখেই যুক্ত করা হয়েছে এই গান গুলো।

‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ কাব্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর সহজ -সরলতা। কাব্যের শুরুতেই দেখা যায় জলির বিলের ধারে অবস্থিত দুই অপূর্ব সুন্দর গ্রামের বর্ণনা।ক্রমে পাঠক পরিচিত হয় কাব্যের নায়ক রুপাই ও নায়িকা সাজুর সাথে। এখানে কবি রুপাই ও সাজুর রূপ এবং গুন বর্ণনায় অতি দক্ষতার পরিচয় দেন গ্রামীণ উপকরণের মাধ্যমে উপমা প্রদানের মধ্য দিয়ে। একই সাথে কবি তুলে ধরেন গ্রামীণ সংস্কৃতি।বৃষ্টির জন্য গাওয়া নৈলা গান এবং সকলের বাড়ি থেকে কিছু চাঁদা তুলে রান্না করে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা। এরই সাথে সাথে রুপাই এর সাথে সাক্ষাত ঘটে সাজুর। পরে দেখা যায় তুমুল বৃষ্টি উড়িয়ে নিয়ে যায় রুপাইয়ের ঘরের চাল আর সেই চালের জন্য বাঁশ কাটতে এসেই রুপাই সাজুর পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়।

পরে গ্রাম্য রীতিতে ঘটকের মধ্যস্থতায় বিয়ে হয় রুপাই এবং সাজুর। বিয়েতে গ্রামীণ মুসলিম বিবাহ রীতির দেখা মিলে। কেরাত, হামদ, কারবালার কাহিনী সহ নানা আয়োজনও দেখা যায়।

ক্রমে রুপাই ও সাজুর জীবনে বইতে থাকে আনন্দের ঝর্ণাধারা। কিন্তু সেই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই ফুল ঝরে পড়ার দিকে ধাবিত হয়। বন-গেঁয়োরা আক্রমণ থেকে ধানী জমি রক্ষার্থে রুপাই বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেই বিদ্রোহে খুনাখুনি হয়ে যায়। আর তাই জেল বা কালাপানির হাত থেকে রক্ষা পেতে রুপাই গ্রাম থেকে পালিয়ে যায়। যদিও যাওয়ার পূর্বে একবার তার দেখা হয় সাজুর সাথে।

এরপর সাজুর দীর্ঘ প্রতীক্ষা। কবে ফিরবে রুপাই? কবে বিরহ ডানা মেলে উড়ে যাবে মুক্ত ঠিকানায়? কবে ঘটবে সমাপ্তি এই অপেক্ষার? কিন্তু অপেক্ষার দিন ফুরায় না। বয়ে চলে অনন্ত কালের দিকে। আর তাই রুপাই এর স্মৃতিটুকুকে সম্বল করে তাদের আনন্দ, বেদনা, বিরহের চিত্রকে সাজু অঙ্কিত করে তার নকশী কাঁথায়। জীবনীশক্তি কমতে কমতে একদিন নিভে যায় সাজু নামের উজ্জ্বল নক্ষত্র। ইতিপূর্বে মাকে বলে যায় তার কবরের উপর যেন নকশী কাঁথাটা বিছিয়ে দেয়া হয়।

বহুদিন পর এক ভিনদেশী পথিকের বাঁশির করুণ সুর শুনতে পাওয়া যায়। পরদিন দেখা যায় সাজুর কবরের পাশেই সাজুর তৈরিকৃত নকশি কাঁথা জড়িয়ে পড়ে আছে ভিনদেশী পথিকের মৃতদেহ।

চরিত্র বিশ্লেষণে বলতে হয় কবি অসাধারণ দক্ষতার সাথে তৈরি করেছেন রুপাই চরিত্রটি। পুঁথি সংগ্রাহক দীনেশচন্দ্র সেনের কথায় ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকসংগীত সংগ্রহ করতে গিয়ে কবির সাক্ষাৎ হয় সেখানকার রুপা নামের এক লোকের সঙ্গে। যিনি ছিলেন বলবান লাঠিয়াল। পরবর্তীতে একটা বিদ্রোহ জড়িয়ে জেলও হয়েছিল তার। রুপা নামের এই বাস্তব চরিত্রের অবলম্বনেই কবি কাব্যে রুপাই চরিত্রটি নির্মাণ করেছেন। আর রূপার প্রিয়তমা ললিতাকে সাজু চরিত্রের মাধ্যমে শাশ্বত বাঙালি নারীর প্রতিরূপ হিসেবে কবি উপস্থাপন করেছেন। তখনকার মুসলিম পরিবারে মেয়েদের নাম ধরে না ডেকে বড় মেয়েকে বড়, মেজ মেয়েকে মাজু, সেজ মেয়েকে সাজু বিষয়টিও লক্ষ্য করা যায় সাজুর নামকরণে।

দীনেশচন্দ্র সেন এ কাব্যের সমালোচনায় ১৩৩৭ বাংলা সনের বৈশাখ সংখ্যার বিচিত্রায় বলেন, “নক্সী কাঁথার মাঠে এমন অনেক কথা আছে, যাহা বাঙ্গলার আর কোন কবি এভাবে লিখিতে পারিতেন কিনা সন্দেহ।”

কাব্যে ঘটক চরিত্রের উপস্থাপন আমার কাছে বেশ মনে হয়েছে। বেশ কৌশলে সাজুর মাকে রাজি করিয়েছেন বিয়েতে একই সাথে দুই পক্ষের কাছে ভিন্ন রকম কথা বলে নিজের ফায়দা হাসিল কাব্যের কাহিনীকে পূর্ণতা দান করে।

উপমা উৎপ্রেক্ষায় এবং চিত্রকল্পের বর্ণিল ব্যবহারে কবির সফলতা অনন্য চূড়ায়। কেননা কবি গ্রামীণ মানুষের জীবনকে উপস্থাপনের জন্য গ্রামীণ উপকরণের উপমা দিয়াছেন। যেমন রুপাইয়ের দেহের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে –
“কাঁচা ধানের পাতার মত কচি মুখের মায়া
তার সাথে কে মাখিয়ে দেছে নবীন তৃণের ছায়া
জালি লাউয়ের ডগার মত বাহু দুখান সরু
গা খানি তার শাওন মাসের যেমন তমাল তরু।”

এছাড়াও কবি রূপাই ও সাজুর প্রেম, ঘটকালি, বিয়ে, বাসর, ঘরসংসার ও তাদের বিচ্ছিন্ন হওয়া প্রতিটি ক্ষেত্রকেই চমৎকার নিপুণতার সঙ্গে বর্ণনা করেছেন। ঠিক তেমনি গ্রামবাংলার প্রকৃত চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন বেশ নিপুণতার সাথে-
“আশ্বিন গেল কার্তিক মাসে পাকিল খেতের ধান
সারা মাঠ ভরি গাহিছে কে যেন হলদি কোটার গান।
ধানে ধানে লাগি বাজিছে বাজনা গন্ধ উড়িছে বায়
কলমিলতায় দোলন লেগেছে হেসে কূল নাহি পায়।”

কাব্যের করুণ সমাপ্তির সুর দাগ কাটে পাঠকের মনে। কবির ভাষায়-

“বহুদিন পরে গাঁয়ের লোকেরা গভীর রাতের কালে,
শুনিল কে যেন বাজাইছে বাঁশি বেদনার তালে তালে।
প্রভাতে সকলে দেখিল আসিয়া সেই কবরের গায়
রোগপাণ্ডুর একটি বিদেশী মরিয়া রয়েছে হায়!…
সারা গায় তার জড়ায়ে রয়েছে সেই সে নক্সী কাঁথা
আজও গাঁর লোকে বাঁশি বাজাইয়া গায় এ করুণ গাঁথা।”

একটি কৃষিকেন্দ্রিক সমাজ জীবনের রুপচিত্র অঙ্কন এবং নিগূঢ় প্রেমের অনুভবটিকে আরও বেশি আবেদনময়ী করে তুলতে নকশী কাঁথাটি যথার্থ উপযোগী।

কাব্য প্রকাশের প্রায় ১০ বছর পর ১৯৩৯ সালে E.M.Milford এই কাব্য ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ‘The Field of Embroidered Quilt’ নামে। একই সাথে চেক ভাষা সহ্য বেশ কিছু ভাষায় অনূদিত হয় এই কাব্য এবং সর্বত্র সাড়া জাগায়।

লেখক- শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন