বালাইনাশকের পাশাপাশি বই

সেতারা কবির সেতু

নাম বিজয় কুমার পাল। একজন ব্যবসায়ী হলেও আপাদমস্তক তিনি বই পড়ুয়া মানুষ। দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার গোলাপগঞ্জ বাজারে তার বিশাল বালাইনাশকের দোকান। দোকানে যেতেই দেখি বিজয় কুমার বসে বই পড়ছেন। আহমেদ ছফার আলতা চক্র বইটি তার হাতে। বিজয় কুমার যেখানে বসে আছেন তার এক পাশে দুটি বুক শেলফ অন্য পাশে বিভিন্ন কীটনাশক। আমি বুক শেলফের কাছে গিয়ে খুব আগ্রহের সাথে বইগুলো দেখতে থাকি। কতো সমৃদ্ধ তার সংগ্রহ।

দোকানে কাস্টমারদের ভিড়। একাধিক কর্মচারী থাকলেও বিজয় কুমারকেও ব্যস্ত থাকতে হয়। এরপরও আমাদের সময় দিচ্ছেন, বই নিয়ে কথা বলছেন। আমি মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনছি। ২০২০ সালে বই মেলার অধিকাংশ নতুন বই রয়েছে তার সংগ্রহে।

তার পড়াশোনার গভীরতা দেখে আমি মুগ্ধ । আমি চমকে যাই যখন দোকানের ভিতরে প্রবেশ করি। ভিতরের দিকের জায়গাটা বড়। যেখানে বালাইনাশকের বস্তাগুলো এক পাশে সারি, সারি করে রাখা হয়েছে আর অন্য পাশে তৈরি করা হয়েছে লাইব্রেরি।

তার লাইব্রেরিতে ঢুকেই আমি বিস্মিত। এতো বইয়ের সংগ্রহ। মনে হচ্ছে আমি এখানে ঢাকার বাতিঘর দেখছি। প্রায় সারে আট হাজার বই রয়েছে এখানে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদদীন, আহমদ ছফা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ শামসুল হক, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মোস্তফা হোসেন সিরাজী, আল মাহমুদ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, জাফর ইকবাল, আনিসুল হক, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, নারায়ণ সান্যাল, প্রফুল্ল রায়, বিমল মিত্র, ভগীরথ মিশ্র, গজেন্দ্র কুমার মিত্র, হেমেন্দ্র কুমার রায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, মহাশ্বেতা দেবীসহ আরোও অনেকের বই রয়েছে। খুশবন্ত সিং এর লেখা অনুবাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর অনুবাদ করা প্রায় সব বই তার সংগ্রহে রয়েছে। এছাড়াও এই সময়কার অনেক লেখকের বই দেখলাম। সাদাত হোসাইনের অর্ধবৃত্ত, আরিফ আজাদের প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ, শাহাদুজ্জামানের একজন কমলালেবু ও লেখালেখি এবং সাব্বির জাদিদের পিতামহ।

এসকল বইয়ের অধিকাংশই তিনি পড়েছেন। আমি যখন বিজয় কুমারের সাথে কথা বলি, তখন আমি যেই বইয়ের কথা বলি সেই বই তার পড়া। কতো সাবলীলভাবে বইয়ের বিভিন্ন বিষয় তিনি বলছেন। এমনকি কোন লেখকের নতুন কি বই আসছে সেই বিষয়ে তিনি খোঁজ রাখেন এবং সংগ্রহ করার চেষ্টা করেন। বিজয় কুমার বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র থেকে অধিকাংশ বই সংগ্রহ করেন। বিজয় কুমার নিজে বই পড়ার পাশাপাশি অন্যদের উৎসাহিত করেন বই পড়তে। আশেপাশের অনেক শিক্ষার্থীরা বিজয় কুমারের লাইব্রেরিতে যান বই পড়তে। আবার অনেকেই বই বাসায় আনেন পড়ার জন্য। পড়া শেষ হলে সেই বই দিয়ে আবার নতুন বই নিয়ে আসে।

বিজয় কুমার পাল নবাবগঞ্জের শালবাগান মহল্লার মৃত বিমল চন্দ্র পালের ছোট ছেলে। বিজয় জানান, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তিন গোয়েন্দা দিয়ে তাঁর বই পড়া শুরু। এরপর মাসুদ রানা সিরিজ। দশম শ্রেণিতে উঠে শুরু হয় হুমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবালের বই পড়া। ২০০১ সালে বাণিজ্য বিভাগে এসএসসি পাস করেন বিজয়। কলেজ শেষ করে ব্যবসায় ঢুকে পড়েন, কিন্তু বই পড়া ছাড়েননি। পড়ে চলছেন মনের আনন্দে। অন্যরাও যাতে বই পড়ে, সে চেষ্টাও করছেন।
স্ত্রী পলি রানী পাল এবং দুই মেয়েকে নিয়ে বিজয়ের ছোট সংসার। তার স্ত্রী বলেন,

‘বইয়ে ভর্তি আমাদের শোবার ঘরও। স্বামীর অভ্যাসের কারণে আমিও আস্তে আস্তে বই পড়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। বই আমাদের সংসারের একটা অংশ।’

বিজয় কুমার চান বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীরা মোবাইলের প্রতি আসক্ত না হয়ে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হোক। এছাড়াও সকল শ্রেণির মানুষ তার সংগৃহীত বইয়ের পাঠক। আমাদের চারপাশে কতো মানুষ রয়েছে যারা নিঃ স্বার্থ ভাবে সমাজ ও দেশ গঠনে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা তাদের খোঁজ রাখিনা। বিজয় কুমার পাল তেমনই একজন। যিনি প্রত্যন্ত অঞ্চলে থেকে বই পড়ার আন্দোলন গড়ে তুলছেন। শুভকামনা রইলো বিজয় কুমার পালের জন্য।

লেখকঃ কলাম লেখক ও শিক্ষক

আরও পড়ুন