সুখ দুঃখের ফেব্রুয়ারী

মোস্তফা মাসুম তৌফিক

ফেব্রুয়ারী মাস আমাদের জীবনে এক অন্য রকম অনুভূতি নিয়ে আসে। গভীর শোকের মাস, এবং শোককে শক্তিতে পরিণত করার দৃপ্ত শপথের মাস। আন্দোলন সংগ্রাম যুদ্ধের সফল পটভূমি বিনির্মানের মাস। বইমেলা, যা আমাদের জনজীবনের সবচেয়ে পরিশীলিত এবং নির্মল আনন্দের নিয়মিত আয়োজন, সেই প্রাণের মেলাও এই ফেব্রুয়ারী মাসেই। বসন্তদিনের সূচনাও, ইংরেজি ফেব্রুয়ারীতেই। কোকিলের কুহূরব, শিমুল পলাশ কৃষ্ণচূড়ার আগুনে সৌন্দর্যের মাস! শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার মাস! সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক জাগরণের মাস।
সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক এতগুলো উপাদানের বাইরে আমার ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক ভাবেও ফেব্রুয়ারী স্মরণীয় মাস। আমার মা, আব্বা এবং আমার বড় দুই ভাইয়ের জন্ম এই ফেব্রুয়ারীতেই। মায়ের জন্ম, আর মায়ের ভাষার মর্যাদা এই ফেব্রুয়ারীতেই। পুরো ফেব্রুয়ারী মাস জুড়েই তাই, মনের মাঝে গভীর ভাবে একটা ভিন্ন মাত্রার অনুভূতি, প্রবলভাবে নাড়া দেয়।

প্রায় তিন যুগ ধরে ফেব্রুয়ারী মাসের এক তারিখে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বইমেলা শুরু হয়। (যদিও তা বিচ্ছিন্ন ভাবে শুরু হয়েছিল ১৯৭২ সালেই, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতে যাওয়া লেখকদের বই দিয়ে। অনেকটাই চিত্তরঞ্জন সাহার ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ফসল থেকেই এই বইমেলার সূচনা)। কিন্তু গত বছর থেকে শুরু ব্যতিক্রম। গত বছর অনিবার্য কারণে বইমেলা শুরু হয়েছিল ফেব্রুয়ারী মাসের ২ তারিখে। আর এবার চলমান করোনা পরিস্থিতির কারণে ফেব্রুয়ারী মাস থেকে পিছিয়ে, বইমেলা মার্চ মাসে শুরুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বইমেলা পিছিয়ে গেলেও আসলে ফেব্রুয়ারী মাসের আবেদন ফুরবার নয়, ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারীর ২১ তারিখে সারা বিশ্বের ইতিহাসের এক বিরলতম গৌরবের ঘটনা ঘটে। পরিপূর্ণ আত্মনিবেদন, মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় শহীদ, ভাষা শহীদ হন বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা। আসলে শুধু ২১ তারিখেই নয়, ২০, ২১, ২২, ২৩ টানা কয়েকদিন চলেছিল এই মহা গৌরবের ব্যপ্তিকাল। ২০ তারিখ রাতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মাতৃভাষা সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে ১১ – ৪ ভোটে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার সময়ই তীব্র বিতর্ক তোলেন আবদুল মতিন (ভাষা মতিন), অলি আহাদ, গোলাম মওলা এবং কমরুদ্দিন। তাদের বলিষ্ঠ যুক্তিশীল আহবানে, সভার ভোটাভুটিতে প্রাপ্ত সিদ্ধান্ত বাতিল করে, বৃহত্তর পর্যায়ে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেয়া হয়। ২১ ফেব্রুয়ারী সকালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের আমতলায় এই ঐতিহাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয় গাজীউল হকের সভাপতিত্বে। সেখানেও আবদুল মতিনের (ভাষা মতিন) বলিষ্ঠ যুক্তিতে সম্মিলিত ছাত্রছাত্রীরা তাৎক্ষণিকভাবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়। তার পরের ইতিহাস আমরা সবাই জানি। চারজন করে দল বেঁধে ছাত্রী ছাত্র সবাই মিলে একে একে ১৪৪ ধারা ভাঙতে থাকে। আর তখনই বর্বর জালিম পাকিস্তান সরকারের পৈশাচিক আদেশে পুলিশের নির্মম গুলিবর্ষণ এবং একে একে শহীদ হন বারকাত, সালাম, রফিক, জব্বার, শফিউল, সালাহউদ্দিন, সহ আরও কয়েকজন। তারা নিজেদেরকে আত্মনিবেদন এবং আত্মত্যাগের দৃষ্টান্তের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুলে নিয়ে শাহাদাত বরণ করেন। কিন্তু, গুলিবর্ষণে একে একে শহীদ হবার পরেও, আন্দোলনরত ছাত্র জনতা পিছু হটেনি। আন্দোলন চলেছে এরপরও লাগাতার কয়েকদিন। রাতারাতি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। জালিম পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে শহীদ মিনার গুড়িয়ে দেয়া হয়। আবারও নির্মাণ করা হয় শহীদ মিনার। এভাবে শহীদ মিনার নিয়ে ভাঙা গড়ার খেলা, আন্দোলন সংগ্রাম চলেছে একেবারে ৭১ পর্যন্ত। সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকা ২১ ফেব্রুয়ারীর পরদিন অর্থাৎ ২২ ফেব্রুয়ারী বিশেষ সংখ্যা একাধিকবার মুদ্রণ করা হয়। সেখানে প্রথম পাতায় বড় বড় লাল ব্যানার হেডলাইনে সম্পাদকীয় লেখা হয়, “বাংলা ভাষার উপর শয়তানের হামলা”। আন্দোলন সংগ্রাম দমন করার জন্য দেশব্যাপী শুরু হয় দমন-পীড়ন, হুলিয়া জারি, গণগ্রেফতার। ছত্রভঙ্গ করে দেয়ার নির্মম অপচেষ্টা চলে বার বার। তবে, এতে করে বাঙালির মনে যে ঘৃণা, অবিশ্বাস জন্ম দিয়েছিল পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী, মুক্তিযুদ্ধের চুড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত সেই ঘৃণা এবং অবিশ্বাস চলমান ছিল, ক্রমশই তা গভীর থেকে গভীরতর হয়েছিল মাত্র। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের পরাজয় আসলে ২১ ফেব্রুয়ারীর শোককে শক্তিতে পরিণত করার প্রথম দৃষ্টান্ত। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্রে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার অন্তর্ভুক্তি মাতৃভাষা আন্দোলনের চুড়ান্ত বিজয় বললে ভুল বলা হবে না।
কিন্তু আমাদের আন্দোলন সংগ্রামের লক্ষ্যমাত্রাও এরই মধ্যে পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত হয়েছে। ভাষার প্রশ্নের মীমাংসার পরে আন্দোলনের গতিধারা একে একে শিক্ষা সংস্কৃতি, স্বাধিকার, স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামে, মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, ছয় দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এ প্রথম সাধারণ নির্বাচন, ৭ মার্চ ঐতিহাসিক মহাকাব্যিক ভাষণ, ২৫ মার্চের কালরাত্রি, অপারেশন সার্চলাইটে শয়তানের নিষ্ঠুরতা, এবং অসীম সাহসিকতার মহান মুক্তিযুদ্ধে চুড়ান্ত বিজয়ে, আমাদের আজকের বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছে। তাই বাংলাদেশের জন্ম এই ২১ ফেব্রুয়ারীতে সূচিত সংগ্রামের নব পর্যায়ের ধারাবাহিকতায়, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ভাষা শহীদ গণ ছিলেন আমাদের আন্দোলন সংগ্রামে বাতিঘরের মতো। গভীর অন্ধকারেও আমাদের পথ প্রদর্শনে আলো ছড়ায়।

১৯৫২ পরবর্তীতে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে শহীদ দিবস আমাদেরকে আন্দোলনে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে, আমাদের মধ্যে দেশমাতৃকার জন্য শপথ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। আর বর্তমানে তো ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে আমাদের শহীদ দিবসকে বৈশ্বিক করে তুলেছে।
আমার মায়ের জন্ম ১২ ফেব্রুয়ারী। ছোট বেলায় আমাদের জন্মদিনে মা আমাদেরকে পায়েস রান্না করে দিত, সাথে আনা হতো রসগোল্লা, মিষ্টি। মাঝে মাঝে নুডুলস, বা অন্য কোন খাবার, বাসায় তৈরি কেক, এজাতীয় আরও কিছুও করা হতো। মা’র জন্মদিনে আমরা কেউ একটু মিষ্টি কিনতাম আর মা নিজেই হয়তো পায়েস রান্না করতো। কখনো আমরা ভাইবোন কেউ রান্না করত। তবে, মায়ের জন্মদিনে আমরা সবাই বই উপহার দিতাম। আমার মা বই পড়তে খুব ভালোবাসত। মারা যাওয়ার এক বছর আগেও নিয়মিত বই পড়েছে মা। শেষের কয়েক মাস কিছু পড়তে পারেনি। একদম শেষ কটা দিন তো চেতনার ঊর্ধ্বে ছিল।

ফেব্রুয়ারী এলো ক্যালেন্ডারের পাতায় চড়ে। কিন্তু বইমেলা নেই। কেমন একটা শূন্যতা, ফেব্রুয়ারী কেমন অচেনা চেহারায় আবির্ভূত। মা নেই। মাকে বই উপহার দেয়া হবে না। মায়ের হাতে বই তুলে দিয়ে মায়ের মুখের মিষ্টি মধুর হাসি দেখারও সুযোগ নেই। চারদিকে প্রবল শূন্যতা। হাহাকার। নেই নেই নেই।

লেখকঃ সাহিত্যিক  ও কলামিস্ট 

আরও পড়ুন